নয়াদিল্লিতে শুরু হওয়া ১৮তম ব্রিকস সম্মেলনে যোগ দিতে ভারত সফরে রয়েছেন রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন। শনিবার থেকে শুরু হওয়া দুই দিনব্যাপী এই সম্মেলনকে কেন্দ্র করে রুশ প্রেসিডেন্টের সুরক্ষায় গড়ে তোলা হয়েছে নজিরবিহীন ও অত্যাধুনিক এক নিরাপত্তা বলয়। বিশ্বের অন্যতম ক্ষমতাধর এই নেতার গতিবিধি, শারীরিক অবস্থা কিংবা ব্যক্তিগত তথ্য যাতে কোনোভাবেই বিদেশি শক্তির হাতে না পড়ে, সেজন্য দিনরাত সতর্ক রয়েছেন তার বিশেষ রক্ষীরা।
প্রেসিডেন্ট পুতিনের নিরাপত্তার মূল দায়িত্বে রয়েছে ‘রাশিয়ান প্রেসিডেন্সিয়াল সিকিউরিটি সার্ভিস’ বা এসবিপি, যা রাশিয়ার ফেডারেল প্রটেক্টিভ সার্ভিস (এফএসও)-এর একটি বিশেষ শাখা। ডসিয়ার সেন্টারের তথ্য অনুযায়ী, এই বাহিনীতে প্রায় ৫০ হাজার কর্মী নিয়োজিত আছেন, যা মার্কিন প্রেসিডেন্টের সিক্রেট সার্ভিসের চেয়ে প্রায় ছয় গুণ বেশি। পুতিনকে সবসময় ৩০ জন সশস্ত্র রক্ষী সরাসরি ঘিরে রাখেন। এছাড়া সাধারণ মানুষের ছদ্মবেশে শত শত এফএসও এজেন্ট পুরো এলাকায় ছড়িয়ে থাকেন। ইউরোপীয় গোয়েন্দা তথ্য অনুযায়ী, বিদেশ সফরে পুতিনের নিরাপত্তা ব্যবস্থা মূলত চারটি স্তরে বিন্যস্ত থাকে। প্রথম স্তরে থাকেন কালো পোশাক ও ইয়ারফোন পরিহিত ব্যক্তিগত দেহরক্ষীরা। দ্বিতীয় স্তরে ছদ্মবেশী গুপ্তচরেরা সাধারণ মানুষের সাথে মিশে থাকেন। তৃতীয় স্তরের রক্ষীরা পুরো এলাকা নিয়ন্ত্রণ করে অপরিচিতদের দূরে রাখেন এবং চতুর্থ তথা সবচেয়ে বাইরের স্তরে আশপাশের উঁচু ভবনের ছাদে স্নাইপাররা অবস্থান নেন।
পুতিনের এই ভারত সফর উপলক্ষে দিল্লির নিরাপত্তা জোরদার করতে ভারত ও রাশিয়ার নিরাপত্তা সংস্থাগুলো যৌথভাবে কাজ করছে। সবচেয়ে ভেতরের স্তরে রাশিয়ার এসবিপি সদস্যরা নিয়োজিত থাকলেও এর পরের স্তরে রয়েছেন ভারতের বিশেষায়িত কমান্ডো বাহিনী ‘ন্যাশনাল সিকিউরিটি গার্ড’ বা এনএসজি। আর সবচেয়ে বাইরের স্তরের দায়িত্বে রয়েছে দিল্লি পুলিশ। রুশ প্রেসিডেন্টের যাতায়াতের পথ ও আশপাশের এলাকায় বিশেষ ড্রোন, জ্যামার, এআই-ভিত্তিক নজরদারি এবং ফেসিয়াল রিকগনিশন বা মুখমণ্ডল শনাক্তকরণ প্রযুক্তি ব্যবহার করা হচ্ছে। এছাড়া তার যাত্রাপথের উঁচু ভবনগুলোতেও স্নাইপার মোতায়েন করা হয়েছে。
স্থলপথে পুতিনের যাতায়াতের জন্য ব্যবহৃত হচ্ছে তার বিশেষ লিমুজিন ‘অরাস সেনাট’, যা মূলত একটি ‘চলন্ত বাঙ্কার’। বোমা ও বুলেটপ্রতিরোধী এই গাড়িটিতে রয়েছে জরুরি অক্সিজেন সরবরাহ ব্যবস্থা, রান-ফ্ল্যাট টায়ার, সুরক্ষিত যোগাযোগ ব্যবস্থা এবং রাসায়নিক বা জৈবিক হামলা মোকাবিলার জন্য বায়ু পরিশোধন প্রযুক্তি। টায়ার বা জানলা ক্ষতিগ্রস্ত হলেও এই গাড়ির ইঞ্জিন সচল থাকে। অন্যদিকে, আকাশপথে ভ্রমণের জন্য পুতিন ব্যবহার করেন ‘ইলিউশিন আইএল-৯৬-৩০০পিইউ’ বিমান, যাকে বলা হয় ‘উড়ন্ত ক্রেমলিন’। ক্ষেপণাস্ত্র-প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা ও এনক্রিপ্টেড কনফারেন্স রুম সমৃদ্ধ এই বিমান থেকে প্রয়োজনে পারমাণবিক হামলার নির্দেশও দেওয়া সম্ভব। তবে পুতিনের অবস্থান গোপন রাখতে একই রুটে সবসময় আরও এক বা দুটি সহায়ক বিমান চলাচল করে।
পুতিনের এই নিশ্ছিদ্র নিরাপত্তার আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো তার খাদ্যাভ্যাস ও স্বাস্থ্যগত গোপনীয়তা। সফরে থাকাকালীন তার খাবার কখনোই স্থানীয় হোটেলের রান্নাঘরে তৈরি হয় না। তার সাথে থাকা নিজস্ব রুশ রাঁধুনিরা বিশেষ দস্তানা পরে এবং দিনে কয়েকবার পোশাক পরিবর্তন করে অত্যন্ত সতর্কতার সাথে খাবার প্রস্তুত করেন। পরিবেশনের আগে প্রতিটি উপাদান পরীক্ষা করা হয় এবং দেহরক্ষীরা তা চেখে দেখার পর পুতিনের কাছে পাঠানো হয়। এমনকি পুতিনের শারীরিক অবস্থার কোনো তথ্য যাতে বাইরে না যায়, সেজন্য তার মলমূত্র সংগ্রহের জন্য দেহরক্ষীরা একটি বিশেষ স্যুটকেস সাথে রাখেন, যা পরে মস্কোতে ফেরত নিয়ে যাওয়া হয়। এছাড়া পুতিনের সাথে সবসময় থাকে রাশিয়ার পারমাণবিক কমান্ড ব্রিফকেস ‘চেগেট’, যার মাধ্যমে যেকোনো জরুরি মুহূর্তে পারমাণবিক অস্ত্র ব্যবহারের নির্দেশ দেওয়া সম্ভব।
প্রকাশ : ১২ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ১১: ১৯আপডেট : ১২ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ১১: ২৪