সিরাজগঞ্জের তাড়াশ উপজেলার বারুহাস ইউনিয়নের বিনসাড়া গ্রামটি লোকসংস্কৃতির কিংবদন্তি চরিত্র বেহুলা-লক্ষিন্দরের স্মৃতিবিজড়িত স্থান হিসেবে পরিচিত। এই গ্রামের মাটির নিচে চাপা পড়া ‘ডুবন্ত সোনার নৌকা’ আর অলৌকিক ‘জীয়নকূপ’ নিয়ে স্থানীয়দের মাঝে রয়েছে গভীর কৌতূহল ও বিশ্বাস। লোকমুখে প্রচলিত রয়েছে অনেক অলৌকিক কাহিনী। ঐতিহ্যবাহী এই ঐতিহাসিক স্মৃতিচিহ্নগুলো দীর্ঘদিন ধরে অবহেলায় পড়ে থাকলেও, এবার এগুলো সংরক্ষণে নতুন উদ্যোগ নিচ্ছে স্থানীয় প্রশাসন।
লোকগাথা অনুযায়ী, তৎকালীন নিচানী বাজার (যা বর্তমানে বিনসাড়া গ্রাম) এলাকার বাসিন্দা বাছোবানিয়ার একমাত্র রূপসী কন্যা ছিলেন বেহুলা। তাঁর সঙ্গে বিয়ে ঠিক হয়েছিল বগুড়ার চম্পকনগরের চাঁদ সওদাগরের ছেলে লক্ষিন্দরের। লক্ষিন্দরের বাকি ছয় ভাইকে সাপে কেটে মেরে ফেলায় তাঁর সুরক্ষায় তৈরি করা হয়েছিল নিছিদ্র লোহার বাসর ঘর। তবে সব সতর্কতা পেরিয়ে বাসর ঘরে সুতানলী সাপ ঢুকে লক্ষিন্দরকে দংশন করে। স্বামীর প্রাণ ফিরে পাওয়ার অদম্য আশায় সাপে কাটা মৃতদেহ সোনার নৌকায় নিয়ে ভেসে চলেন বেহুলা। কথিত রয়েছে, বিনসাড়া গ্রামের এক ছোট নদী বা নালায় বেহুলার সেই কিংবদন্তি নৌকাটি ডুবে যায়। বর্তমানে সেই স্থানে নৌকা আকৃতির একটি উঁচু মাটির ঢিবি দেখা যায়, যা স্থানীয়দের কাছে ডুবন্ত সোনার নৌকার স্মৃতিচিহ্ন হিসেবে পরিচিত।
এই ডুবন্ত নৌকার পাশেই রয়েছে রহস্যময় ‘জীয়নকূপ’। স্থানীয়দের বিশ্বাস, বছরের পর বছর পার হলেও এই কূপের পানি কখনো সম্পূর্ণ শুকায় না। বেহুলা তাঁর স্বামীকে জীবিত করার জন্য এই কূপ থেকেই পানি সংগ্রহ করেছিলেন বলে ধারণা করা হয়। এই কূপের পানি পান করলে রোগমুক্তি ঘটে এবং এখানে মানত করলে মনের আশা পূরণ হয়—এমন বিশ্বাসে প্রতিদিন দূর-দূরান্ত থেকে দর্শনার্থীরা এখানে ভিড় করেন। এছাড়া, জীয়নকূপ থেকে প্রায় ৫ কিলোমিটার দূরে দাঁড়িয়ে আছে একটি বিশাল ও প্রাচীন বটগাছ। প্রায় ৫৬০টি ঝুরি নিয়ে বিস্তৃত এই বটগাছের নিচে বেহুলা ও লক্ষিন্দরের প্রথম পরিচয় ও কথোপকথন হয়েছিল বলে লোকমুখে প্রচলিত আছে। এই গাছের মাঝে একটি শিব মন্দিরও রয়েছে।
ঐতিহাসিক এই স্থানটি নিয়ে স্থানীয় বাসিন্দাদের মনে রয়েছে গভীর শ্রদ্ধা ও ভয়। বিনসাড়া গ্রামের একটি বিদ্যালয়ের সহকারী শিক্ষক ৫৫ বছর বয়সী আব্দুস সবুর জানান, তাঁরা পূর্বপুরুষদের কাছ থেকে শুনে আসছেন যে একসময় এই ডুবন্ত নৌকার স্থান থেকে কেউ মাটি কাটতে গেলে অমঙ্গল হতো। গ্রামের ৭০ বছর বয়সী প্রবীণ বাসিন্দা অমল কুমার বলেন, জীয়নকূপ ও ডুবন্ত নৌকা ঘিরে বহু অলৌকিক গল্প প্রজন্ম থেকে প্রজন্মে ছড়িয়ে পড়েছে। কূপের পাশে বসবাসকারী ৭৫ বছর বয়সী বৃদ্ধা জতি রানী বলেন, লোকভয়ের কারণে আশপাশের জমিতে চাষাবাদ হলেও নৌকার জায়গাটিতে কেউ কোদাল চালায় না। রোগমুক্তি ও কৌতূহল নিয়ে প্রতিদিন মানুষ এখানে আসেন বলে তিনি উল্লেখ করেন।
সংরক্ষণ ও রক্ষণাবেক্ষণের অভাবে হারিয়ে যেতে বসা এই ঐতিহাসিক নিদর্শনগুলো নিয়ে স্থানীয়দের মাঝে ক্ষোভ রয়েছে। দর্শনার্থী বাড়লেও এখানে পর্যাপ্ত অবকাঠামো, পর্যটন সুবিধা ও গবেষণামূলক কাজের অভাব রয়েছে। স্থানীয়রা সরকারি উদ্যোগে এখানে প্রত্নতাত্ত্বিক জরিপ ও গবেষণার দাবি জানিয়েছেন। এ বিষয়ে তাড়াশ উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) নুসরাত জাহান জানান, বেহুলার জীয়নকূপ সংস্কারের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। এছাড়া বেহুলার ইতিহাসের সঙ্গে সম্পর্কিত অন্যান্য স্থাপনা সংরক্ষণের জন্য একটি প্রকল্প গ্রহণের পরিকল্পনা রয়েছে। যে খালপথ দিয়ে বেহুলার নৌযাত্রার স্মৃতি জড়িয়ে আছে, সেই খালটি পুনরায় খনন করার চিন্তাভাবনা চলছে। পাশাপাশি প্রত্নসম্পদগুলো তালিকাভুক্ত করে পর্যটকদের জন্য প্রয়োজনীয় অবকাঠামো গড়ে তোলার পরিকল্পনাও রয়েছে প্রশাসনের।