বাংলাদেশের গ্রামীণ জনগোষ্ঠীকে টার্গেট করে নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগের পক্ষে ভুয়া বাংলা সংবাদ তৈরি ও প্রচারের একটি স্বয়ংক্রিয় নেটওয়ার্ক শনাক্ত করেছে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) বিষয়ক প্রতিষ্ঠান অ্যানথ্রপিক। প্রতিষ্ঠানটি তদন্ত শেষে ওই নেটওয়ার্কটি বন্ধ করে দিয়েছে। অ্যানথ্রপিকের তথ্যমতে, ক্লাউড প্রযুক্তি ব্যবহার করে এই নেটওয়ার্কটি পরিচালিত হতো, যার মূল উদ্দেশ্য ছিল আওয়ামী লীগের পক্ষে প্রচারণা চালানো এবং রাজনৈতিক প্রতিপক্ষের বিরুদ্ধে মিথ্যা ও মানহানিকর তথ্য ছড়িয়ে দেয়া। অ্যানথ্রপিকের প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়, ২০২৪ সালের জুলাইয়ের গণঅভ্যুত্থানের পর আওয়ামী লীগ ক্ষমতার বাইরে থাকায় এই প্রচারণাটি কোনো ক্ষমতাসীন দলের পক্ষে ছিল না, বরং বিরোধী অবস্থানে থাকা দলটির স্বার্থে পরিচালিত হচ্ছিল।

১০ই সেপ্টেম্বর প্রকাশিত ১৫৪ পৃষ্ঠার ‘থ্রেট ইন্টেলিজেন্ট রিপোর্ট’-এ বলা হয়েছে, এই কার্যক্রমের পেছনে গাইবান্ধা জেলার একজন ব্যক্তি এককভাবে কাজ করছিলেন। প্রায় ১৬ মাস ধরে তিনি ২৯টি ক্লাউড অ্যাকাউন্ট ঘুরিয়ে-ফিরিয়ে ব্যবহার করেছেন যাতে শনাক্তকরণ এড়ানো যায়। ভুয়া খবর তৈরির জন্য তিনি ‘ফেক নিউজ ৩ ডট পিওয়াই’ নামক নিজস্ব একটি সফটওয়্যার তৈরি করেছিলেন। এটি ক্লাউডের সঙ্গে সংযুক্ত হয়ে স্বয়ংক্রিয়ভাবে প্রতি ব্যাচে ১৫টি শিরোনাম, তিনটি বিস্তারিত ভুয়া সংবাদ এবং ছবি তৈরির জন্য ১৫টি প্রম্পট তৈরি করতে সক্ষম ছিল।

তদন্তে উঠে এসেছে, এই নেটওয়ার্ক অন্তত ১ হাজার ৫০০টি শিরোনাম, ৩০০টি মিথ্যা বর্ণনা এবং ১ হাজার ৫০০টি ছবি তৈরির প্রম্পট তৈরি করেছে। ক্লাউডে নিজস্ব ছবি তৈরির সুবিধা না থাকায় এসব প্রম্পট অন্য এআই মডেল দিয়ে ছবি তৈরিতে ব্যবহৃত হয়ে থাকতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে। এসব কনটেন্ট ফেসবুক লাইভ, ইউটিউব ও টিকটকে প্রচারের পরিকল্পনা ছিল। বিশেষ করে গ্রামীণ এলাকার আওয়ামী লীগ সমর্থক এবং তুলনামূলক কম সাক্ষর জনগোষ্ঠীকে লক্ষ্য করে এসব কনটেন্ট ‘উত্তেজনাপূর্ণ ও আক্রমণাত্মক’ ভাষায় তৈরি করা হতো। নেটওয়ার্কটির অভ্যন্তরীণ যোগাযোগে এগুলোকে সরাসরি ‘ফেক নিউজ’ হিসেবেই উল্লেখ করা হয়েছে।

প্রচারণার মূল লক্ষ্য ছিল বিএনপি, জামায়াতে ইসলামী, জাতীয় নাগরিক কমিটি, অন্তর্বর্তীকালীন সরকার এবং ছাত্র আন্দোলনের নেতারা। তাদের বিদেশি এজেন্ট হিসেবে চিত্রিত করা এবং ‘তালেবান-ধাঁচের’ শাসন ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠার মিথ্যা অভিযোগ ছড়ানোই ছিল এই নেটওয়ার্কের অন্যতম বয়ান। এছাড়া হত্যা ষড়যন্ত্র, দুর্নীতি ও গোপন রাজনৈতিক জোটের কাল্পনিক গল্প তৈরির মাধ্যমে রাজনৈতিক প্রতিপক্ষকে ধর্মীয় উগ্রবাদী হিসেবে উপস্থাপনের চেষ্টা করা হয়েছে।

পুরো প্রক্রিয়াটি প্রায় স্বয়ংক্রিয়ভাবে চলত। ভিডিওগুলো স্বয়ংক্রিয়ভাবে ইউটিউবে আপলোডের জন্য একটি আলাদা স্ক্রিপ্ট তৈরি করা হয়েছিল এবং তৃতীয় পক্ষের ধারাবাহিক ইন্টিগ্রেশন সেবার মাধ্যমে ভিডিও প্রকাশের সময়সূচি নিয়ন্ত্রণ করা হতো। অ্যানথ্রপিক স্পষ্ট করেছে যে, কনটেন্ট আওয়ামী লীগপন্থি হলেও দলটি সরাসরি এই নেটওয়ার্ক পরিচালনা বা অর্থায়ন করেছে এমন কোনো প্রমাণ পাওয়া যায়নি। এছাড়া ভারতের স্বার্থের সঙ্গে কিছু বয়ান মিলে গেলেও কোনো রাষ্ট্রীয় অর্থায়নের তথ্যও তদন্তে আসেনি।

অ্যানথ্রপিকের ‘ব্রেকআউট স্কেল’ অনুযায়ী, এই কার্যক্রমকে ক্যাটাগরি থ্রি হিসেবে মূল্যায়ন করা হয়েছে, যার অর্থ এর কনটেন্ট একাধিক প্ল্যাটফর্মে ছড়িয়েছে। প্রতিষ্ঠানটি সংশ্লিষ্ট অ্যাকাউন্টগুলো নিষিদ্ধ করেছে এবং ভবিষ্যতে একই কার্যক্রম প্রতিরোধে আচরণগত বৈশিষ্ট্য শনাক্ত করার ব্যবস্থা তৈরি করেছে। এছাড়া নেটওয়ার্কটির শনাক্তকারী তথ্য বিতরণ প্ল্যাটফর্ম ও অংশীদারদের সঙ্গে ভাগ করে নেয়া হয়েছে।