ইয়েমেনের হুতি বিদ্রোহীরা লোহিত সাগর উপকূলের কৌশলগতভাবে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বন্দরনগরী মোখা ও পেরিম দ্বীপের ওপর পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করেছে। এর ফলে বৈশ্বিক তেলবাণিজ্যের অন্যতম প্রধান নৌপথ বাব আল-মানদেব প্রণালিতে হুতিদের একচ্ছত্র আধিপত্য প্রতিষ্ঠিত হলো। ইরান-সমর্থিত এই শক্তিশালী গোষ্ঠীর বিরুদ্ধে এক বিলিয়ন বা ১০০ কোটি ডলারের ‘অপারেশন রাফ রাইডার’ চালিয়েও শেষ পর্যন্ত ব্যর্থ হয়েছে পরাশক্তি যুক্তরাষ্ট্র। মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প শেষমেশ প্রধান মিত্র ইসরায়েলকে পাশ কাটিয়েই হুতিদের সঙ্গে যুদ্ধবিরতি চুক্তি করতে বাধ্য হয়েছেন, যাকে সামরিক ও কূটনৈতিক বিশ্লেষকেরা ওয়াশিংটনের এক বড় পরাজয় হিসেবে দেখছেন।
ইয়েমেনের পশ্চিম উপকূলজুড়ে হুতিদের এই আকস্মিক অগ্রাভিযান আন্তর্জাতিক মহলকে বিস্মিত করেছে। গত বৃহস্পতিবার হুতি বাহিনী আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত ইয়েমেন সরকারের অনুগত বাহিনীর হাত থেকে লোহিত সাগরের গুরুত্বপূর্ণ মোখা বন্দরটি ছিনিয়ে নেয়। পরদিন শুক্রবার মার্কিন সংবাদ সংস্থা অ্যাসোসিয়েটেড প্রেসকে (এপি) ইয়েমেনের সরকারি কর্মকর্তারা নিশ্চিত করেন যে, হুতিরা বাব আল-মানদেব প্রণালির ভেতরে অবস্থিত ময়উন বা পেরিম দ্বীপটিও দখল করে নিয়েছে। এই ঘটনার প্রতিক্রিয়ায় সৌদি আরব মোখা বিমানবন্দরে বিমান হামলা চালিয়েছে।
পেরিম দ্বীপের পতনের ফলে মধ্যপ্রাচ্যের ভূরাজনৈতিক ও কৌশলগত সমীকরণ দ্রুত বদলে গেছে। লোহিত সাগর ও এডেন উপসাগরের সংযোগস্থলে অবস্থিত এই সরু বাব আল-মানদেব প্রণালি বিশ্বের অন্যতম ব্যস্ত নৌপথ। আরব উপদ্বীপের অপর প্রান্তে হরমুজ প্রণালিতে ইরানের সঙ্গে চলমান উত্তেজনার কারণে এমনিতেই জাহাজ চলাচল ব্যাহত হচ্ছিল। ফলে সৌদি আরব তার তেল রপ্তানির জন্য লোহিত সাগরের এই পথের ওপর অনেক বেশি নির্ভরশীল হয়ে পড়েছিল। এখন বাব আল-মানদেব হুতিদের নিয়ন্ত্রণে চলে যাওয়ায় বিশ্ব তেলের বাজার চরম ঝুঁকিতে পড়েছে।
নব্বইয়ের দশকে আত্মপ্রকাশ করা হুতি বিদ্রোহীরা মূলত ২০১৪ সালে ইয়েমেনের রাজধানী সানা দখল করে বিশ্বজুড়ে আলোচনায় আসে। সে সময় তারা তৎকালীন প্রেসিডেন্ট আবদরাব্বু মনসুর হাদিকে দেশ ছেড়ে পালাতে বাধ্য করেছিল। এরপর ২০১৫ সালের মার্চে সৌদি আরবের নেতৃত্বে একটি শক্তিশালী সামরিক জোট ইয়েমেনে হস্তক্ষেপ করে হুতিদের বিরুদ্ধে ব্যাপক বিমান ও স্থল অভিযান শুরু করে। পশ্চিমা সমর্থন থাকা সত্ত্বেও সেই জোট ইরান-সমর্থিত হুতিদের পরাজিত করতে পারেনি। পরবর্তীতে ২০২২ সালের এপ্রিলে জাতিসংঘের মধ্যস্থতায় একটি সাময়িক যুদ্ধবিরতি কার্যকর হওয়ার পর সৌদি ও হুতিদের মধ্যে শান্তি আলোচনা চলছিল।
তবে ২০২৩ সালের ৭ অক্টোবর গাজা উপত্যকায় ইসরায়েলি হামলার প্রতিবাদে এবং হামাসের প্রতি সমর্থন জানিয়ে একই বছরের নভেম্বরে লোহিত সাগরে ইসরায়েল-সংশ্লিষ্ট বাণিজ্যিক জাহাজে ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্র হামলা শুরু করে হুতিরা। ২০২৪ সালের ১৯ জানুয়ারি গাজায় প্রথম দফার যুদ্ধবিরতি কার্যকর হলে হুতিরাও সাময়িকভাবে তাদের হামলা বন্ধ রেখেছিল। কিন্তু গত ২৮ ফেব্রুয়ারি ইরান ভূখণ্ডে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল আকস্মিক হামলা চালালে পরিস্থিতি আবার উত্তপ্ত হয়ে ওঠে। ইরান এর জবাবে মধ্যপ্রাচ্যের মার্কিন ঘাঁটিগুলোতে পাল্টা আঘাত হানে এবং তেহরানের অনুরোধে হুতিরা দক্ষিণ ইসরায়েল ও লোহিত সাগরে মার্কিন যুদ্ধজাহাজ লক্ষ্য করে হামলা শুরু করে।
হুতিদের মূল লক্ষ্য ছিল লোহিত সাগর ও বাব আল-মানদেব প্রণালি দিয়ে মার্কিন বিমানবাহী রণতরিগুলোর চলাচল বিঘ্নিত করা। জাহাজবিধ্বংসী ক্ষেপণাস্ত্র, অত্যাধুনিক ড্রোন, বিস্ফোরকবাহী স্পিডবোট এবং সাগরে মাইন পুঁতে রাখার সক্ষমতা দিয়ে হুতিরা মার্কিন নৌবাহিনীর জন্য বড় ধরনের হুমকি তৈরি করে। এমনকি সৌদি উপকূল থেকে এক হাজার কিলোমিটার দূরের হরমুজ প্রণালিতে মার্কিন সৈন্যসমাবেশের গতিও তারা মন্থর করে দিতে সক্ষম হয়।
এই পরিস্থিতি মোকাবিলায় ২০২৫ সালের বসন্তে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প হুতিদের ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন সক্ষমতা ধ্বংস করতে ‘অপারেশন রাফ রাইডার’ নামে একটি বিশাল সামরিক অভিযান শুরু করেন। এই অভিযানে ইয়েমেনের আট শতাধিক স্থানে হামলা চালানো হয় এবং এতে যুক্তরাষ্ট্রের প্রায় ১ বিলিয়ন ডলার ব্যয় হয়। কিন্তু বিপুল অর্থ ব্যয় ও অত্যাধুনিক প্রযুক্তি ব্যবহারের পরও হুতিদের সামরিক শক্তিকে দুর্বল করা যায়নি। তারা তাদের ভূগর্ভস্থ ঘাঁটি ও ইরানের সামরিক সহায়তার ওপর ভর করে টিকে থাকে এবং মার্কিন রণতরিগুলোতে হামলার তীব্রতা আরও বাড়িয়ে দেয়, যা দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর মার্কিন সামুদ্রিক আধিপত্যের জন্য সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ তৈরি করে। এর আগে জো বাইডেনের আমলে পরিচালিত ‘অপারেশন প্রসপারিটি গার্ডিয়ান’ অভিযানটিও একইভাবে ব্যর্থ হয়েছিল।
সামরিক উপায়ে হুতিদের দমাতে ব্যর্থ হয়ে অভিযান শুরুর মাত্র দুই মাসের মাথায়, অর্থাৎ ৬ মে প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প আকস্মিকভাবে হুতিদের সঙ্গে একটি যুদ্ধবিরতি চুক্তির ঘোষণা দেন। ওমানের মধ্যস্থতায় হওয়া এই চুক্তির শর্ত ছিল—হুতিরা মার্কিন জাহাজে হামলা বন্ধ করলে যুক্তরাষ্ট্রও ইয়েমেনে বোমাবর্ষণ বন্ধ করবে। তবে এই চুক্তিকে যুক্তরাষ্ট্রের একটি বড় কৌশলগত পরাজয় হিসেবে দেখছেন বিশ্লেষকেরা। কারণ হুতিরা মার্কিন জাহাজে হামলা বন্ধ করলেও ইসরায়েলের ওপর হামলা অব্যাহত রাখে। সবচেয়ে আশ্চর্যের বিষয় হলো, এই চুক্তি সম্পর্কে ট্রাম্প প্রশাসন তাদের প্রধান মিত্র ইসরায়েল বা দেশটির প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুকে কিছুই জানায়নি। হুতিদের ক্ষেপণাস্ত্রে তেল আবিবের বেন গুরিয়ন বিমানবন্দর ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার পর ইসরায়েল পাল্টা আঘাত হিসেবে ইয়েমেনের হোদেইদা বন্দর ও সানা বিমানবন্দরে হামলা চালিয়েছিল।
হুতিদের এই রাজনৈতিক ও সামরিক বিজয়ের পেছনে ইরানের সরাসরি ভূমিকা রয়েছে। সম্প্রতি ইরান তাদের ইসলামি বিপ্লবী গার্ড বাহিনীর (আইআরজিসি) কমান্ডার, সামরিক উপদেষ্টা এবং মাঝারি পাল্লার ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন সরঞ্জাম ইয়েমেনে পাঠিয়েছে। গত ১৩ জুলাই তেহরান থেকে মাহান এয়ারের একটি বিশেষ ফ্লাইটে আইআরজিসির সদস্য ও সামরিক সরঞ্জাম ইয়েমেনে পৌঁছানোর খবর নিশ্চিত করেছেন ইয়েমেনের তথ্যমন্ত্রী ও আঞ্চলিক নিরাপত্তা বিশ্লেষকসহ একাধিক ইরানি কর্মকর্তা।
এদিকে, চলমান সংকটের মধ্যে সৌদি আরবের পূর্ব থেকে পশ্চিমে বয়ে যাওয়া বিশাল ‘ইস্ট-ওয়েস্ট পাইপলাইন’ দিয়ে তেল পরিবহন সাময়িকভাবে বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে। ইরাকের ইরানপন্থী সশস্ত্র গোষ্ঠীর ড্রোন হামলার পর দৈনিক ২০ লাখ ব্যারেল তেল পরিবহনের এই পাইপলাইনটি বন্ধ করতে বাধ্য হয় রিয়াদ। উদ্ভূত পরিস্থিতিতে হুতিদের বিরুদ্ধে লড়াইয়ে মার্কিন সামরিক সহায়তা চেয়ে সৌদি আরবের যুবরাজ মোহাম্মদ বিন সালমান গত বৃহস্পতিবার অন্তত দুবার প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পকে ফোন করেছেন। তবে ওয়াশিংটন রিয়াদকে সাফ জানিয়ে দিয়েছে যে, তারা হুতিদের বিরুদ্ধে সরাসরি কোনো নতুন সামরিক অভিযানে জড়াবে না; তবে গোয়েন্দা তথ্য আদান-প্রদান ও হামলার লক্ষ্যবস্তু নির্ধারণে সৌদি আরবকে সহায়তা করতে প্রস্তুত রয়েছে।