বগুড়ার সারিয়াকান্দিতে যমুনা নদীর চরের কৃষকেরা নদীভাঙন, প্রতিকূল আবহাওয়া আর উৎপাদন ব্যয়ের নানা চাপ উপেক্ষা করে পাট চাষে অভাবনীয় সাফল্য দেখিয়েছেন। চলতি মৌসুমে লক্ষ্যমাত্রার চেয়ে অনেক বেশি জমিতে পাটের আবাদ হয়েছে। তবে উৎপাদনে এমন সাফল্য এলেও চরাঞ্চলের সিংহভাগ কৃষকই সরকারি কৃষি প্রণোদনা থেকে বঞ্চিত রয়েছেন বলে অভিযোগ উঠেছে।
উপজেলা কৃষি অফিসের তথ্য অনুযায়ী, সারিয়াকান্দির চরাঞ্চলে প্রায় ১৫ হাজার কৃষক রয়েছেন। অথচ চলতি মৌসুমে সরকারি প্রণোদনা পেয়েছেন মাত্র ২৭০ জন কৃষক। এদের প্রত্যেককে এক কেজি পাটবীজ, পাঁচ কেজি ডিএপি এবং পাঁচ কেজি এমওপি সার দেওয়া হয়েছে। সরকারি এই সহায়তার অপ্রতুলতা নিয়ে ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন স্থানীয় কৃষকেরা।
সোমবার (৭ সেপ্টেম্বর) যমুনা নদীর চরবাটিয়া ও শালুকা চরে সরেজমিনে দেখা যায় সবুজ পাটের সমারোহ। চরবাটিয়ার ৩৫ বছর বয়সী কৃষক মরিয়ম বেগম আক্ষেপ করে বলেন, "আমরা কোনো দিন এক মুঠো সরিষার দানাও সরকারি সহায়তা পাইনি। অনেকে সার ও বীজ পেলেও আমরা কিছুই পাই না। বাজার থেকে সার-বীজ কিনে আবাদ করতে গিয়ে আমাদের সংসার চালানো কঠিন হয়ে পড়ে।" চরের অন্তত ৫০ জন কৃষকের সঙ্গে কথা বললে তারা জানান, রাজনৈতিক সুপারিশ বা কৃষি অফিসে দেনদরবার ছাড়া প্রণোদনা পাওয়া যায় না।
শালুকা চরের ৬৭ বছর বয়সী সাহেদজামান জানান, তিন বছর আগে একবার শুধু সরিষার বীজ পেয়েছিলেন, কিন্তু সার পাননি কখনো। গত তিন বছরে কৃষি অফিসের কেউ তাদের খোঁজ নিতে আসেননি। একই চরের ৩০ বছর বয়সী লেমন ইসলাম এবার আট বিঘা জমিতে পাট বুনেছেন। তিনিও বছরখানেক আগে সামান্য সরিষার বীজ ছাড়া আর কোনো সহায়তা পাননি। চরবাটি গ্রামের ৫০ বছর বয়সী নিলি বেগম এবং ২০ বছর ধরে কৃষিকাজ করা শালিকার চরের ৪০ বছর বয়সী মন্তেজার মণ্ডলও একই ধরনের বঞ্চনার কথা জানান। মন্তেজার মণ্ডলের অভিযোগ, সরকারি দলের লোকেরাই মূলত এসব সুবিধা পান, সাধারণ কৃষকদের জন্য প্রণোদনা নয়। ৭৫ বছর বয়সী আজিজার প্রামাণিক জানান, তিন বছর আগে বিভিন্ন বীজ ও সার পেলেও এরপর আর কোনো সরকারি সুবিধা পাননি।
চরের কৃষকদের জন্য উৎপাদন খরচও একটি বড় বোঝা। কৃষকদের হিসাব অনুযায়ী, এক বিঘা জমির পাট কাটা, জাগ দেওয়া ও ধোয়ার জন্য অন্তত ১২ জন শ্রমিকের প্রয়োজন হয়, যাদের দৈনিক মজুরি ৮০০ টাকা করে। এছাড়া প্রতি বিঘা জমিতে প্রায় দেড় বস্তা সার লাগে, যার প্রতি বস্তার বর্তমান বাজারমূল্য ১ হাজার 6০০ টাকা। কৃষি অফিসের মতে, এক বিঘা জমিতে পাট চাষে ১৬ থেকে ১৭ হাজার টাকা খরচ হয়। প্রায় ছয় মাস পরিশ্রমের পর সব খরচ বাদে এক বিঘা জমির পাট বিক্রি করে কৃষকদের আয় থাকে মাত্র আট হাজার টাকার মতো। চরের অধিকাংশ কৃষকই নদীভাঙনে সর্বস্ব হারিয়ে অন্যের জমি শনপত্তন নিয়ে চাষাবাদ করছেন।
প্রতিকূলতার মধ্যেও উপজেলায় পাটের ফলন হয়েছে চমৎকার। উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা মোহাম্মদ আলী জিন্নাহ্ জানান, চলতি মৌসুমে উপজেলায় ৩ হাজার ১০৫ হেক্টর লক্ষ্যমাত্রার বিপরীতে ৫ হাজার ৫৫ হেক্টর জমিতে পাটের আবাদ হয়েছে, যা লক্ষ্যমাত্রার চেয়ে প্রায় দুই হাজার হেক্টর বেশি। এর মধ্যে যমুনার চরাঞ্চলেই চাষ হয়েছে ৩ হাজার হেক্টর জমিতে। হেক্টরপ্রতি গড় ফলন হয়েছে ২.৮ মেট্রিক টন। চরের ১৯টি ব্লকে উৎপাদিত ৮ হাজার ৪০০ মেট্রিক টন পাটের বাজারমূল্য প্রায় ৭৯ কোটি ৮০ লাখ টাকা (প্রতি মণ পাটের বর্তমান দাম ৩ হাজার ৮০০ টাকা ধরে)। কৃষকদের এই বঞ্চনা প্রসঙ্গে সারিয়াকান্দি উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) এস এম মিকাইল ইসলাম বলেন, "হাজার হাজার কৃষকের মধ্যে মাত্র ২৭০ জনকে প্রণোদনা দেওয়া সত্যিই অপ্রতুল। আমরা দ্রুতই আরও বেশি সংখ্যক কৃষককে এই সহায়তার আওতায় আনার প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেব।"