জাতীয়তাবাদী ছাত্রদলের বর্তমান সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদক বিদায়ের প্রস্তুতি নিয়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে বার্তাও দিয়েছিলেন। সম্ভাব্য নতুন নেতৃত্বের তালিকা পৌঁছেছিল বিএনপির চেয়ারম্যান ও প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের হাতে। তাঁর সঙ্গে বর্তমান শীর্ষ দুই নেতার সাক্ষাতের পরপরই নতুন কমিটি ঘোষণার কথা থাকলেও কেটে গেছে প্রায় এক মাস। শেষ মুহূর্তে এসে ছাত্রদলের নতুন কমিটি আটকে যাওয়ার নেপথ্যে কাজ করছে নেতৃত্ব নির্বাচন নিয়ে নতুন করে শুরু হওয়া চুলচেরা বিশ্লেষণ। নতুন প্রজন্মের শিক্ষার্থীদের কাছে সংগঠনের গ্রহণযোগ্যতা বৃদ্ধি এবং তরুণ ও অভিজ্ঞদের সমন্বয়ে একটি কার্যকর কমিটি গঠনের চেষ্টা চলছে বলে জানা গেছে।
সংশ্লিষ্ট একাধিক সূত্র মতে, গত মাসে বর্তমান সভাপতি রাকিবুল ইসলাম ও সাধারণ সম্পাদক নাছির উদ্দীন তারেক রহমানের সঙ্গে দেখা করার পরই পাঁচ সদস্যের একটি নতুন কমিটি ঘোষণার প্রস্তুতি নেওয়া হয়েছিল। তবে সরকারের গুরুত্বপূর্ণ একজন সদস্য তারেক রহমানকে পরামর্শ দেন বর্তমান 'জেন-জি' বা নতুন প্রজন্মের শিক্ষার্থীদের মানসিকতা, প্রত্যাশা ও রাজনৈতিক চাহিদা মাথায় রেখে নেতৃত্ব সাজাতে। এরপরই সম্ভাব্য কমিটি নিয়ে নতুন করে আলোচনা শুরু হয়। এক পক্ষ থেকে দাবি ওঠে অপেক্ষাকৃত তরুণদের সামনে আনার, অন্যদিকে দীর্ঘ দেড় দশক ধরে মামলা-হামলা ও আন্দোলনে সক্রিয় থাকা অভিজ্ঞ নেতাদের গুরুত্ব দেওয়ার পক্ষেও জোরালো মত আসে।
প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয় সংশ্লিষ্ট একটি সূত্র জানিয়েছে, কেন্দ্রীয় ছাত্রদলের সভাপতি কে হবেন, তা তারেক রহমান মোটামুটি নির্ধারণ করে রেখেছেন। তবে সাধারণ সম্পাদকসহ অন্যান্য শীর্ষ পদগুলোতে কাকে রাখা হবে, তা নিয়ে আলোচনা চলছে। মূলত অভিজ্ঞতা, আন্দোলনে ভূমিকা এবং নতুন প্রজন্মের সঙ্গে যোগাযোগের মেলবন্ধন ঘটিয়ে নেতৃত্ব সাজানোর চেষ্টা চলছে। বিএনপির নীতিনির্ধারণী পর্যায়ের একটি অংশ মনে করে, ছাত্রদলকে আরও বেশি তারুণ্যনির্ভর করা প্রয়োজন, কারণ পুরোনো শিক্ষাবর্ষের নেতাদের প্রাধান্য নিয়ে দীর্ঘদিন ধরে সমালোচনা রয়েছে। বর্তমান সাধারণ শিক্ষার্থীদের সঙ্গে নেতৃত্বের বয়স ও শিক্ষাজীবনের ব্যবধান কমানো এবং নতুন প্রজন্মের ভাষা বোঝার জন্য অপেক্ষাকৃত জুনিয়রদের সামনে আনা জরুরি।
তবে এই মতের সঙ্গে সবাই একমত নন। অন্য একটি সূত্র জানায়, বিগত ১৫ বছরের প্রতিকূল রাজনৈতিক পরিস্থিতিতে যারা মাঠে থেকে মামলা ও কারাবরণের শিকার হয়েছেন, ছাত্রলীগের মুখোমুখি হয়েছেন এবং ছাত্রশিবিরের সাংগঠনিক কৌশল সম্পর্কে যাদের অভিজ্ঞতা রয়েছে, তাদের পুরোপুরি বাদ দেওয়া ঠিক হবে না বলে তারেক রহমানকে পরামর্শ দেওয়া হয়েছে। এই দুই অবস্থানের মধ্যে সমন্বয় করতে শীর্ষ দুই পদের একটিতে সিনিয়র এবং অন্যটিতে জুনিয়র নেতা রাখার কথা ভাবা হচ্ছে। এক্ষেত্রে ২০০৮-০৯, ২০০৯-১০ ও ২০১০-১১ শিক্ষাবর্ষের সাবেক শিক্ষার্থীদের পাশাপাশি ২০১৪-১৫ ও ২০১৫-১৬ শিক্ষাবর্ষের নেতাদের নামও আলোচনায় রয়েছে।
নেতৃত্ব নির্বাচনের এই আলোচনায় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়সহ বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ের সাম্প্রতিক ছাত্রসংসদ নির্বাচনের ফলাফলও গুরুত্ব পাচ্ছে। বড় বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর ছাত্রসংসদ নির্বাচনে ছাত্রশিবির-সমর্থিত প্রার্থীরা ভালো ফল করলেও ছাত্রদলের ফলাফল ছিল তুলনামূলক দুর্বল। ফলে আগামী ছাত্রসংসদ নির্বাচনগুলোতে ঘুরে দাঁড়াতে সাধারণ শিক্ষার্থীদের কাছে গ্রহণযোগ্য নেতৃত্ব খোঁজা হচ্ছে। একই সঙ্গে সংগঠনের ভেতরের শৃঙ্খলা ও নির্দেশনা বাস্তবায়নের সক্ষমতাও বিবেচনায় নেওয়া হচ্ছে। ছাত্রদলের নতুন নেতৃত্বকে শুধু কেন্দ্রীয় কমিটি নয়, বরং বিশ্ববিদ্যালয়, জেলা, মহানগর ও কলেজ পর্যায়ের ইউনিটগুলোকেও সুশৃঙ্খলভাবে পরিচালনার যোগ্যতা প্রমাণ করতে হবে। অন্য সংগঠন থেকে এসে ছাত্রদলে অনুপ্রবেশ ঠেকানোর জন্য জুনিয়রদের অতীত রাজনৈতিক পরিচয় যাচাইয়ের ওপরও জোর দেওয়া হচ্ছে।
২০২৪ সালের ১ মার্চ রাকিবুল ইসলাম ও নাছির উদ্দীনের নেতৃত্বে বর্তমান কমিটি গঠিত হয়েছিল। দুই বছরের মেয়াদ পূর্ণ হওয়ার পর নতুন কমিটি গঠনের প্রক্রিয়া শুরু হয়। চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত তারেক রহমান নিজেই নেবেন। প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়কেন্দ্রিক সূত্রগুলো জানিয়েছে, ছাত্রদলের নতুন কমিটি যেকোনো সময় ঘোষণা হতে পারে। তবে জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদের ৮১তম অধিবেশনে যোগ দিতে প্রধানমন্ত্রীর আসন্ন নিউইয়র্ক সফরের বিষয়টিও এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে। প্রধানমন্ত্রীর যুক্তরাষ্ট্র যাত্রার আগে ঘোষণা না হলে, তিনি দেশে ফেরার পর কমিটি প্রকাশ করা হতে পারে। এ বিষয়ে ছাত্রদলের সাধারণ সম্পাদক নাছির উদ্দীন বলেন, 'আশা করছি, দ্রুততম সময়ের মধ্যে নতুন কমিটি হয়ে যাবে। নতুন কমিটি হওয়ার আগে আমরা স্বাভাবিক গতিতে সাংগঠনিক কার্যক্রম চালিয়ে যাচ্ছি।'
শীর্ষ পদে আগ্রহীদের মধ্যে ২০০৮–০৯, ২০০৯–১০ ও ২০১০–১১ শিক্ষাবর্ষের প্রাক্তন শিক্ষার্থীরা যেমন রয়েছেন, তেমনি ২০১৪–১৫ ও ২০১৫–১৬ শিক্ষাবর্ষেরও অনেকে আছেন।.ছাত্রদলের নেতৃত্ব নির্বাচনকে শুধু কমিটি পরিবর্তন হিসেবে দেখছেন না বিএনপির সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা।