রাজধানীর কারওয়ান বাজারের কিচেন মার্কেটের নিচতলার মাছের বাজারে ক্রেতাদের উপচে পড়া ভিড় নেই, বিক্রেতারা ইলিশ নিয়ে অলস সময় পার করছেন। বেসরকারি চাকরিজীবী আলতাফ হোসেন সেখানে এক কেজি ওজনের একটি ইলিশ কিনতে এসে দরদাম করছিলেন। বিক্রেতা দাম চাইলেন ২ হাজার ৪০০ টাকা। ক্ষোভ প্রকাশ করে আলতাফ হোসেন বলেন, এ বছর দ্বিতীয়বারের মতো ইলিশ কিনতে এসেছেন তিনি। গতবার যে ইলিশ ১ হাজার ৮০০ টাকায় কিনেছিলেন, এবার সেটির দাম ২৪০০ টাকা চাওয়া হচ্ছে। শেষ পর্যন্ত বাজেটে না মেলায় এক কেজির মাছ না কিনে বিক্রেতা শুক্কুর আলীর দোকান থেকে ৭৫০ গ্রাম ওজনের দুটি ছোট মাছ নিয়ে বাড়ি ফেরেন তিনি।
কারওয়ান বাজারে ২০ বছর ধরে মাছের ব্যবসা করা শুক্কুর আলী জানান, এবার সব ধরনের ইলিশের দাম গতবারের চেয়ে ৪০০ থেকে ৫০০ টাকা বেশি। তিনি এবার ১ কেজির ইলিশ ২ হাজার ২০০ টাকার নিচে বিক্রি করেননি এবং আগের দিন তা ২ হাজার ৪০০ টাকা দরে বিক্রি করেছেন। বাজারে এখন ২৫০ গ্রাম ওজনের ছোট ইলিশের চাহিদাই বেশি। চড়া দামের কারণে ক্রেতারা কম ওজনের মাছ কিনে কোনোমতে চাহিদা মেটাচ্ছেন বলে জানান আরেক বিক্রেতা সরাফত আলী। তাঁর দোকানে ১ কেজি, ১ কেজির বেশি, ৬০০ গ্রাম ও ২৫০ গ্রামের ইলিশের তিনটি ঝাঁকা থাকলেও ক্রেতারা দাম শুনেই চলে যাচ্ছেন।
ভরা মৌসুমেও ইলিশের এমন চড়া দাম ও বাজারে ঘাটতির পেছনে মূল কারণ হিসেবে উঠে এসেছে গত দুই বছর ধরে ইলিশের উৎপাদন বা আহরণ কমে যাওয়া। খ্যাতনামা ইলিশ-গবেষক মো. আনিছুর রহমান এই পরিস্থিতিকে বিপজ্জনক বলে অভিহিত করেছেন। তাঁর মতে, মানুষ ও প্রকৃতি—উভয়ই এই সংকটের জন্য দায়ী। সাগরে অতিসূক্ষ্ম ক্ষুদ্র ফাঁসের নিষিদ্ধ জালের বিস্তার, অতিরিক্ত মাছ আহরণ, দূষণ ও ডুবোচর সৃষ্টির কারণে ইলিশের উৎপাদন ব্যাহত হচ্ছে। তিনি বলেন, এত দ্রুত যে ইলিশ উৎপাদনের হার কমতে শুরু করবে তা ভাবা যায়নি। এ বিষয়ে এখন জরুরি গবেষণা প্রয়োজন।
ইলিশের রাজধানী হিসেবে পরিচিত চাঁদপুরের আড়তগুলোর চিত্রও এখন মলিন। চাঁদপুর মৎস্য বণিক সমবায় সমিতি লিমিটেডের সভাপতি আবদুল বারী জমাদার জানান, তিন বছর আগেও জুলাই মাসের পর থেকে প্রতিদিন গড়ে দুই হাজার মণ ইলিশ আসত আড়তে। গত বছর তা কমে ৪০০ মণে দাঁড়ায় এবং এবার দৈনিক গড়ে ২৫০ মণের বেশি ইলিশ পাওয়া যাচ্ছে না। দীর্ঘ ৩০ বছর এই ব্যবসায় যুক্ত থাকা এই ব্যবসায়ী নদী ও সাগরে দূষণ, ডুবোচর এবং নিষিদ্ধ বেহুন্দি জালের ব্যবহারকেই মাছ কমে যাওয়ার জন্য দায়ী করেন।
একই চিত্র দেশের অন্যতম বড় মাছের আড়ত পটুয়াখালীর কলাপাড়ার মহিপুর মৎস্য অবতরণ কেন্দ্রে। দুই যুগের বেশি সময় ধরে মাছের ব্যবসা করা ও চারটি ট্রলারের মালিক ফজলু গাজী জানান, এবার সাগর থেকে খুব কম ট্রলারই ২০ থেকে ৩০ মণের বেশি মাছ নিয়ে ফিরতে পেরেছে, যেখানে গত বছর বেশির ভাগ ট্রলারই ২০ থেকে ৪০ মণ মাছ নিয়ে আসত। এর ওপর সাগরে একের পর এক আবহাওয়ার সতর্কসংকেতের কারণে জেলেরা ঠিকমতো জাল ফেলতে পারেননি। তাঁর সহজ কথা, নদীতে মাছই নেই, থাকলে তো পাওয়া যেত।
সরকারি ও ভোক্তা অধিকার সংগঠনের তথ্য বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, ২০২২ সালের পর থেকে ইলিশের দাম অস্বাভাবিক হারে বেড়েছে। কনজ্যুমারস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (ক্যাব) তথ্য অনুযায়ী, ২০১৪ সালে ৫০০ গ্রাম থেকে ১ কেজি ওজনের ইলিশের গড় দাম ছিল ৫০৫ টাকা। ২০১৬ সালে ১ কেজি ওজনের ইলিশ ৯৫০ থেকে ১ হাজার টাকায় বিক্রি হলেও ২০২৩ সালে তা দাঁড়ায় ১ হাজার ২০০ টাকায়। কৃষি বিপণন অধিদপ্তরের হিসাবে, ২০১৮ সালে সব আকারের ইলিশের বার্ষিক গড় খুচরা মূল্য ছিল ৭০৫ টাকা ৫০ পয়সা, যা ২০২২ সালে ১ হাজার ৫০ টাকা, ২০২৩ সালে ১ হাজার ৯৫ টাকা ৯০ পয়সা এবং ২০২৪ সালে ১ হাজার ১৬৮ টাকা ৫৬ পয়সায় পৌঁছায়। অর্থাৎ, চার বছরে ইলিশের বার্ষিক গড় দাম প্রায় ৬৭ শতাংশ বেড়েছে।
বাংলাদেশ ট্রেড অ্যান্ড ট্যারিফ কমিশনের সমীক্ষায় দেখা যায়, ২০২৪ সালে এক থেকে দেড় কেজি ওজনের ইলিশের দাম ছিল ১ হাজার ৬০০ থেকে ১ হাজার ৮০০ টাকা। আর ২০ concert বছরের ব্যবধানে ২০২৫ সালের আগস্টে এসে একই ওজনের ইলিশের দাম দাঁড়িয়েছে ২ হাজার ৫০০ থেকে ২ হাজার ৬০০ টাকায়। একইভাবে ৭৫০ গ্রাম থেকে এক কেজি ওজনের ইলিশের দাম ১ হাজার ১৫০ টাকা থেকে বেড়ে হয়েছে ১ হাজার ৫০০ টাকা এবং ৫০০ থেকে ৭৫০ গ্রামের ইলিশের দাম ১ হাজার ৪০০ টাকা পর্যন্ত ঠেকেছে।
মৎস্য অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, ২০০৭-০৮ অর্থবছরে দেশে ইলিশের উৎপাদন ছিল ২ লাখ ৯৫ টন। এরপর উৎপাদন ধারাবাহিকভাবে বেড়ে ২০২২-২৩ অর্থবছরে রেকর্ড ৫ লাখ ৭১ হাজার ৩৪২ টনে পৌঁছায়। তবে এরপর থেকেই উৎপাদন কমতে শুরু করে। ২০২৩-২৪ অর্থবছরে উৎপাদন ৭ শতাংশ কমে দাঁড়ায় ৫ লাখ ২৯ হাজার ৪৮৭ টনে এবং ২০২৪-২৫ অর্থবছরে তা ১২ শতাংশ কমে ৫ লাখ টনে নেমে আসে। ব্যবসায়ীদের আশঙ্কা, চলতি বছর ইলিশের উৎপাদন গত বছরের চেয়ে আরও ৩০ থেকে ৪০ শতাংশ কম হতে পারে।
ইলিশের এই সংকটজনক পরিস্থিতি খতিয়ে দেখতে চাঁদপুরের মৎস্য গবেষণা ইনস্টিটিউটের একাধিক দল দেশের বিভিন্ন বিচরণক্ষেত্রে কাজ শুরু করেছে। সম্প্রতি হাতিয়ার মোহনায় গিয়ে গবেষকেরা বিশাল এলাকাজুড়ে নিষিদ্ধ বেহুন্দি জালের বিস্তার দেখতে পান। ইনস্টিটিউটের প্রধান বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা তায়েফা আহমেদ বলেন, নদীর মুখে যেভাবে বড় জালের বিস্তার রাখা হয়েছে, তাতে ইলিশের স্বাভাবিক বিচরণ ব্যাহত হচ্ছে। তাদের গবেষণা অনুযায়ী, চলতি বছর ধরা পড়া ইলিশের মধ্যে মাত্র ২০ থেকে ৩০ শতাংশের পেটে ডিম পাওয়া গেছে, যা দুই-তিন বছর আগেও প্রায় ৫০ শতাংশ ছিল। এর অর্থ হলো বড় আকারের মা ইলিশের সংখ্যা আশঙ্কাজনকভাবে কমছে। গবেষক আনিছুর রহমানের মতে, আমাদের সমুদ্র হলো ইলিশের গোলাঘর, আর সেই গোলাঘর এখন নষ্ট হয়ে যাচ্ছে।