মধ্যপ্রাচ্যজুড়ে চলমান সংঘাতের প্রভাবে বিশ্ববাজারে জ্বালানি তেলের দাম অস্বাভাবিক হারে বৃদ্ধি পেয়েছে। এর ফলে উন্নত ও উন্নয়নশীল দেশগুলোর সাধারণ মানুষ তীব্র সংকটে পড়েছেন এবং বিভিন্ন দেশে জনরোষ দানা বেঁধেছে। ২৮ ফেব্রুয়ারি ইরান যুদ্ধ শুরুর পর থেকে জ্বালানি পরিবহনের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ পথ হরমুজ প্রণালি কার্যত অচল হয়ে পড়ে। যুদ্ধের শুরুর দিকে তেলের দাম রেকর্ড উচ্চতায় পৌঁছালেও, বাব আল–মানদেব প্রণালির উত্তেজনার কারণে তা আবারও ব্যারেলপ্রতি ১০০ ডলার ছাড়িয়ে গেছে।
ইন্দোনেশিয়ায় জ্বালানিসংকট ভয়াবহ রূপ নিয়েছে। জাকার্তায় অনেকে তেল না পেয়ে মোটরসাইকেল ঠেলে নিয়ে যেতে বাধ্য হচ্ছেন এবং পেট্রলপাম্পগুলোতে যানবাহনের দীর্ঘ সারি দেখা যাচ্ছে। সরকার গাড়ির নম্বরের ভিত্তিতে তেল বরাদ্দের নিয়ম চালু করায় ট্যাক্সিচালকেরা সোমবার বিক্ষোভ করেছেন। এছাড়া জাভার জোগাকার্তাতেও জ্বালানি মূল্যবৃদ্ধির প্রতিবাদে শিক্ষার্থীরা রাজপথে নেমেছেন।
সিরিয়া সরকার সাময়িকভাবে জ্বালানি তেলের দাম ৪০ শতাংশ পর্যন্ত বাড়ানোর ঘোষণা দিলে দেশটিতে ব্যাপক বিক্ষোভ শুরু হয়। রবিবার ও সোমবার বিভিন্ন শহরে যান চলাচল বন্ধ করে টায়ারে আগুন জ্বালিয়ে মানুষ প্রতিবাদ জানায়। অনেকে জ্বালানির দাম কমানোর দাবিতে নিজের শরীরে আগুন ধরিয়ে দেওয়ার হুমকিও দিয়েছেন। সরকার জানিয়েছে, যুদ্ধের কারণে এই মূল্যবৃদ্ধি তাদের জন্য অনিবার্য ছিল।
ফিলিপাইনের মৎস্যজীবীরাও জ্বালানির বাড়তি দামের চাপে দিশেহারা। মৎস্যজীবী সংগঠনের চেয়ারম্যান ফার্নান্দো হিকাপ জানান, ডিজেলের দাম বেড়ে যাওয়ায় সাগরে মাছ ধরতে যাওয়ার সক্ষমতা হারিয়েছেন জেলেরা, যা তাদের জন্য ‘দম বন্ধ হয়ে যাওয়ার’ মতো পরিস্থিতি তৈরি করেছে। শ্রীলঙ্কাতেও জ্বালানি সরবরাহ সীমিত করে ফেলায় পেট্রলপাম্পের মালিকেরা লোকসানে ব্যবসা করছেন বলে জানিয়েছেন দেশটির পেট্রলপাম্প মালিক সংগঠনের চেয়ারম্যান কুমারা রাজাপক্ষ।
লাতিন আমেরিকার গুয়াতেমালা সিটিতে ট্রাক্টর চালানোর জন্য ডিজেলনির্ভর কৃষকেরা এবং পরিবহনশ্রমিকেরা বিক্ষোভ করেছেন। ভিয়া নুয়েভা এলাকায় রাস্তায় গাড়ি পোড়ানোর ঘটনাও ঘটেছে। পর্তুগালের রাজধানী লিসবনের ‘২৫ দে এপ্রিল’ সেতুসহ গুরুত্বপূর্ণ সড়কে গাড়িচালকেরা ধীরে গাড়ি চালিয়ে ও হর্ন বাজিয়ে জ্বালানির দামের প্রতিবাদ জানিয়েছেন।
সোয়াস ইউনিভার্সিটি অব লন্ডনের অধ্যাপক নাওমি হোসাইন মনে করেন, বিভিন্ন দেশের মধ্যপন্থী সরকারগুলো এই সংকট মোকাবিলায় কার্যকর কোনো পদক্ষেপ নিতে পারছে না এবং বাস্তবসম্মত বিকল্পের অভাব রয়েছে। তিনি সতর্ক করে বলেন, এর একটি বড় পরিণতি হিসেবে জনতুষ্টিবাদ আরও শক্তিশালী হয়ে উঠছে।