আগামী ১২ নভেম্বর ইউনিয়ন পরিষদ (ইউপি) নির্বাচনের মাধ্যমে স্থানীয় সরকার ভোট শুরুর প্রাথমিক পরিকল্পনা করেছিল নির্বাচন কমিশন (ইসি)। তবে চলতি বছরে এই নির্বাচন অনুষ্ঠানের সম্ভাবনা খুবই কম। বিদ্যালয়ের বার্ষিক পরীক্ষা, রমজান এবং এসএসসি পরীক্ষার সময়সূচি বিবেচনা করে আগামী মে মাসের আগে ভোট আয়োজনের সম্ভাবনা দেখছেন না সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা। এই পরিস্থিতিতে নির্বাচনের প্রস্তুতি ও সময়সূচি নিয়ে আলোচনার জন্য আজ বৃহস্পতিবার নির্বাচন কমিশনে একটি আন্তমন্ত্রণালয় সভা আহ্বান করা হয়েছে।

স্থানীয় সরকার নির্বাচনের সম্ভাব্য সময় নিয়ে সরকারের অবস্থান জানতে চাওয়া হলে স্থানীয় সরকার প্রতিমন্ত্রী মীর শাহে আলম জানান, নির্বাচন কমিশনের ডাকা আন্তমন্ত্রণালয় সভায় সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয় ও বিভাগের প্রতিনিধিরা তাঁদের প্রস্তুতি ও মতামত তুলে দেবেন। সবার মতামত পাওয়ার পরই কখন নির্বাচন করা সম্ভব, সে বিষয়ে একটি স্পষ্ট ধারণা পাওয়া যাবে। এর আগে সুনির্দিষ্ট কোনো সময়ের কথা বলা ঠিক হবে না উল্লেখ করে তিনি বলেন, আলোচনার পর কমিশন পরবর্তী সিদ্ধান্ত নেবে। রাজধানীর আগারগাঁওয়ে নির্বাচন ভবনে আয়োজিত এই প্রস্তুতিমূলক সভায় মন্ত্রিপরিষদ বিভাগ, জনপ্রশাসন, স্বরাষ্ট্র, নৌপরিবহন, পররাষ্ট্র, অর্থ, তথ্য ও সম্প্রচার, স্থানীয় সরকার, প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয়সহ সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন দপ্তর ও সংস্থার কর্মকর্তাদের আমন্ত্রণ জানানো হয়েছে।

সরকারসংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো জানায়, নির্বাচনের সময় নির্ধারণের ক্ষেত্রে শিক্ষার্থীদের পরীক্ষা ও প্রস্তুতির বিষয়টিকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। নির্বাচনী ডামাডোলের কারণে শিক্ষার্থীদের পড়াশোনায় যেন কোনো ব্যাঘাত না ঘটে, তা নিশ্চিত করতে চায় সরকার। ২০২৬ শিক্ষাবর্ষের শিক্ষাপঞ্জি অনুযায়ী, মাধ্যমিক ও নিম্নমাধ্যমিক বিদ্যালয়ের বার্ষিক পরীক্ষা নভেম্বরের তৃতীয় সপ্তাহে শুরু হয়ে ডিসেম্বরের প্রথমার্ধে শেষ হওয়ার কথা রয়েছে। এরপর আগামী বছরের ৮ ফেব্রুয়ারি থেকে রমজান শুরু এবং ১০ মার্চ ঈদুল ফিতর হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। রমজান ও ঈদের ছুটির সময়েও সরকার নির্বাচন করতে আগ্রহী নয়। ঈদের পরপরই আগামী বছরের ১৪ মার্চ থেকে ১৫ এপ্রিল পর্যন্ত এসএসসি ও সমমানের পরীক্ষা অনুষ্ঠিত হবে। পূর্বে এই পরীক্ষা জানুয়ারিতে নেওয়ার পরিকল্পনা থাকলেও পরে তা পরিবর্তন করা হয়। পরীক্ষার এই দীর্ঘ সময়েও ভোট আয়োজনের বিপক্ষে অবস্থান নিয়েছে সরকার-সংশ্লিষ্ট অংশীজনেরা।

সম্প্রতি নির্বাচন কমিশনার আবুল ফজল মো. সানাউল্লাহ ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচনের একটি সম্ভাব্য সময়সূচি প্রকাশ করেছিলেন। তাঁর তথ্য অনুযায়ী, প্রথম ধাপে ১২ নভেম্বর ৮০টি উপজেলার ইউপিতে ভোট নেওয়ার পরিকল্পনা ছিল। এরপর দ্বিতীয় ধাপে ১৩ ডিসেম্বর, তৃতীয় ধাপে ৩০ ডিসেম্বর এবং পরবর্তী চার ধাপে যথাক্রমে আগামী বছরের ১৭ জানুয়ারি, ৪ ফেব্রুয়ারি, ২২ এপ্রিল ও ২৭ মে ভোটগ্রহণের প্রাথমিক তারিখ নির্ধারণ করা হয়েছিল। তবে এই সময়সূচি প্রকাশের পর সরকারের সঙ্গে কোনো আলোচনা না হওয়ার বিষয়টি সামনে আনেন স্থানীয় সরকার প্রতিমন্ত্রী মীর শাহে আলম। তিনি জানান, ঘোষিত তারিখগুলোর বিষয়ে মন্ত্রণালয় কিছুই জানত না এবং প্রচলিত নিয়ম অনুযায়ী আইনশৃঙ্খলা ও বাজেটের বিষয়গুলো বিবেচনা করে সরকারের সঙ্গে আলোচনার পরই তারিখ ঘোষণা করা উচিত ছিল। পরবর্তীতে ইসি সচিবালয়ের জ্যেষ্ঠ সচিব আখতার আহমেদ ব্যাখ্যা দেন যে, এই তারিখগুলো একেবারেই প্রাথমিক এবং সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়গুলোর মতামতের ভিত্তিতেই চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে।

এদিকে, নানাবিধ প্রশাসনিক অজুহাতে স্থানীয় সরকার নির্বাচন বিলম্বিত করার একটি পরিকল্পিত প্রবণতা তৈরি হচ্ছে বলে আশঙ্কা প্রকাশ করেছে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী। দলের কেন্দ্রীয় কার্যালয়ে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে জামায়াতের সেক্রেটারি জেনারেল মিয়া গোলাম পরওয়ার বলেন, অনির্বাচিত প্রশাসকদের মাধ্যমে স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠানগুলো দীর্ঘ সময় ধরে পরিচালনা করা হলে জনগণের ভোটাধিকার ও নির্বাচিত প্রতিনিধিত্ব প্রতিষ্ঠা আরও পিছিয়ে যাবে। তিনি অবিলম্বে একটি সুস্পষ্ট ও সময়বদ্ধ নির্বাচনী রূপরেখা ঘোষণা করার এবং নির্বাচন কমিশনের স্বাধীন সিদ্ধান্তে সরকারি হস্তক্ষেপ না করার দাবি জানান।

বর্তমানে দেশে মোট ৪ হাজার ৫৮০টি ইউনিয়ন পরিষদ রয়েছে। সর্বশেষ ২০২১-২২ সালে কয়েক ধাপে এসব ইউনিয়নে বড় পরিসরে নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়েছিল। যার প্রথম ধাপের ভোট হয়েছিল ২০২১ সালের ২১ জুন ২০৪টি ইউনিয়নে, যার বড় অংশই ছিল বরিশাল বিভাগে। শুধু বরিশাল জেলার ৯টি উপজেলার ৫০টি ইউনিয়নে সেদিন ভোটগ্রহণ করা হয়। নিয়ম অনুযায়ী গত জুনে এসব পরিষদের পাঁচ বছরের মেয়াদ শেষ হয়েছে। বর্তমানে বরিশালের ১৯টি ইউনিয়ন পরিষদসহ দেশের অনেক স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠান নির্বাচিত প্রতিনিধির বদলে সরকারি কর্মকর্তা বা প্রশাসকদের মাধ্যমে পরিচালিত হচ্ছে। নির্বাচন আগামী মে মাস পর্যন্ত পিছিয়ে গেলে নির্বাচিত প্রতিনিধি পাওয়ার জন্য স্থানীয় বাসিন্দাদের অপেক্ষা আরও দীর্ঘায়িত হবে। উল্লেখ্য, আইন সংশোধনের কারণে এবার স্থানীয় সরকার নির্বাচনে কোনো দলীয় প্রতীক থাকবে না। এছাড়া অন্যান্য স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠানের মধ্যে ২০২৪ সালে উপজেলা পরিষদ এবং ২০২২ সালের অক্টোবরে জেলা পরিষদের নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়েছিল। পাশাপাশি ২০২৪ সালের আগস্টে দেশের ১২টি সিটি করপোরেশনের মেয়রদের অপসারণ করে প্রশাসক নিয়োগ দেওয়া হয়।