মালয়েশিয়াসহ শ্রমবাজারের সব ধরনের সিন্ডিকেট বন্ধের জোর দাবি জানিয়েছেন জামায়াতে ইসলামীর আমির ও বিরোধীদলীয় নেতা ডা. শফিকুর রহমান। তিনি স্পষ্ট করে বলেছেন, শ্রমবাজারে কোনো সিন্ডিকেট বা সাধারণ শ্রমিকদের ওপর জুলুম-শোষণ সহ্য করা হবে না। এমনকি নিজের কোনো ভাইও যদি সিন্ডিকেটে জড়িত থাকে, তাকেও বের করে দেওয়ার আহ্বান জানান তিনি।

বৃহস্পতিবার (১৭ সেপ্টেম্বর) বিকেলে জাতীয় প্রেসক্লাবে জামায়াতে ইসলামী আয়োজিত ‘সিন্ডিকেট ও মালয়েশিয়ার শ্রমবাজার: বাংলাদেশের অংশীদারিত্ব’ শীর্ষক এক সেমিনারে প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এসব কথা বলেন। সেমিনারে সভাপতিত্ব করেন দলের নায়েবে আমির অধ্যাপক মুজিবুর রহমান এমপি এবং মূল প্রবন্ধ পাঠ করেন ব্যারিস্টার শাহরিয়ার কবির।

ডা. শফিকুর রহমান মালয়েশিয়ার বাজার উন্মুক্ত করার পক্ষে মত দিয়ে বলেন, কোনো অসৎ ব্যবসায়ী বা প্রতিষ্ঠান যেন এখান থেকে অনৈতিক সুবিধা না পায়। তিনি ২৫টি মাস্টার এজেন্সির নির্বাচনের যৌক্তিকতা নিয়ে প্রশ্ন তুলে বলেন, যাদের অনেকের পূর্ব অভিজ্ঞতা নেই, তাদের কোন মানদণ্ডে নির্বাচন করা হলো? সেখানে ১৫ থেকে ২২ কোটি টাকা বিনিয়োগের যে গুঞ্জন শোনা যাচ্ছে, তা সত্য হলে তিনি তীব্র নিন্দা ও ধিক্কার জানান। তিনি বলেন, এই অনিয়মের সঙ্গে সরকারের সংশ্লিষ্টতা আছে কি না, তা সরকারকেই পরিষ্কার করতে হবে।

নেপাল, শ্রীলঙ্কা, ইন্দোনেশিয়া ও পাকিস্তানের মতো বাংলাদেশকেও সিন্ডিকেটমুক্ত শ্রমবাজার গড়ে তোলার তাগিদ দেন জামায়াত আমির। তিনি হুঁশিয়ারি দিয়ে বলেন, প্রবাসীদের ভোটাধিকার যেভাবে আন্দোলনের মাধ্যমে আদায় করা হয়েছে, ঠিক সেভাবে শ্রমবাজারকেও সিন্ডিকেটমুক্ত করা হবে। স্থানীয় সরকার নির্বাচনে প্রবাসীদের ভোট দেওয়ার অধিকার বাদ দেওয়ার যেকোনো চিন্তাভাবনার তীব্র বিরোধিতা করে তিনি বলেন, এটি করা হলে তা হবে তাদের ওপর চরম অন্যায়।

শুধু শ্রমবাজার নয়, দেশের অন্যান্য খাতের বাজার সিন্ডিকেট ভেঙে গুঁড়ো করে দেওয়ার প্রত্যয় ব্যক্ত করেন ডা. শফিকুর রহমান। জামায়াত সুযোগ পেলে সবার আগে আত্মীয়-স্বজনদের সংশ্লিষ্টতা দেখে সেখানে আঘাত করবে এবং সব সিন্ডিকেট নির্মূল করবে। এছাড়া আরব আমিরাতে বৈধ ভিসা থাকা সত্ত্বেও বাংলাদেশি কর্মীদের বিমানবন্দর থেকে ফেরত পাঠানোর ঘটনার দ্রুত সমাধান না হওয়ায় ক্ষোভ প্রকাশ করেন তিনি।

সরকারের সমালোচনা করে জামায়াত আমির বলেন, "যেই যায় লঙ্কায়, সেই হয়ে যায় রাবণ।" নির্বাচনের আগে দেওয়া প্রতিশ্রুতিগুলো সরকার এখন অস্বীকার করছে এবং উল্টোপথে হাঁটছে। তিনি গণভোট, জুলাই সনদ বাস্তবায়ন, স্বাধীন বিচার বিভাগ এবং নির্বাচন কমিশনসহ বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে দলীয় লোক নিয়োগের সমালোচনা করেন। তিনি জানান, জামায়াত তাদের চলমান আন্দোলনের ৭ দফা দাবির সঙ্গে শ্রমবাজার সিন্ডিকেটমুক্ত করার দাবি যুক্ত করে একে ৮ দফায় রূপান্তর করবে। ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনের উদ্যোগের বিরোধিতা করে তিনি বলেন, মানুষের কণ্ঠরোধ করার মতো কোনো আইন করা হলে তা মানা হবে না। বায়রার সদস্যদেরও এই আন্দোলনে শামিল হওয়ার আহ্বান জানান তিনি।

সেমিনারে মূল প্রবন্ধে ব্যারিস্টার শাহরিয়ার কবির বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে গড়ে ওঠা শক্তিশালী সিন্ডিকেটের বিবরণ দেন। তিনি জানান, বাংলাদেশি বংশোদ্ভূত মালয়েশীয় নাগরিক দাতুশ্রী আমিন নূর, বায়রার সাবেক মহাসচিব রুহুল আমিন স্বপন, سلمان এফ রহমান, সাবেক মন্ত্রী গোলাম দস্তগীর গাজী, সাবেক এমপি লেফটেন্যান্ট জেনারেল মাসুদ, সাবেক এমপি বেনজীর আহমেদ, নিজাম হাজারী ও সাবেক বিএনপি নেতা কাজী মফিজুর রহমানকে নিয়ে এই সিন্ডিকেট গঠিত হয়েছিল। এই চক্রটি ১০০টি সাব-এজেন্টের কাছ থেকে প্রায় ৫০০ কোটি টাকা আত্মসাৎ করে এবং প্রতি শ্রমিকের কাছ থেকে অতিরিক্ত ফি নিয়ে নিয়োগ ব্যয় ৪-৫ লাখ টাকায় উন্নীত করে। প্রায় ২৪ হাজার কোটি টাকার এই দুর্নীতির তদন্ত হলেও মূল হোতারা পার পেয়ে যায়।

তিনি আরও অভিযোগ করেন, বর্তমান সরকারও ২৫টি এজেন্সির মাধ্যমে নতুন সিন্ডিকেট গঠনের চেষ্টা করছে, যার ফলে অভিবাসন ব্যয় ৭ থেকে ৮ লাখ টাকা ছাড়িয়ে যেতে পারে। নেপাল, পাকিস্তান, শ্রীলঙ্কা ও মিয়ানমার সিন্ডিকেট প্রত্যাখ্যান করলেও বাংলাদেশ নীরব দর্শকের ভূমিকা পালন করছে। তিনি এই ২৫ এজেন্সির লাইসেন্স বাতিলের দাবি জানান।

সেমিনারে জামায়াতের সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল মাওলানা রফিকুল ইসলাম খান এমপি বলেন, সরকারের সংশ্লিষ্টতার কারণেই এই সিন্ডিকেট ভাঙা সম্ভব হচ্ছে না। তবে তারা ঐক্যবদ্ধভাবে এটি ভাঙবেন। সাবেক কূটনীতিক সাকিব আলী বলেন, দুর্নীতি ও দখলদারিত্বের বিরুদ্ধে আন্দোলন শুরু হলে বিএনপির পতন ঘটবে, কারণ তাদের আর কিছু নেই।

ঢাকা মহানগর দক্ষিণ জামায়াতের সেক্রেটারি ড. শফিকুল ইসলাম মাসুদের সঞ্চালনায় সেমিনারে আরও বক্তব্য রাখেন জামায়াতের সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল হামিদুর রহমান আযাদ, কেন্দ্রীয় নির্বাহী পরিষদ সদস্য সাইফুল আলম খান মিলন, ঢাকা মহানগর দক্ষিণের আমির নূরুল ইসলাম বুলবুল এমপি, লেবার পার্টির চেয়ারম্যান মুস্তাফিজুর রহমান ইরান এবং জাগপা মুখপাত্র রাশেদ প্রধান।