বিশ্ব এক অভূতপূর্ব ও জটিল সন্ধিক্ষণের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে, যা অতীতে খুব কমই দেখা গেছে। একই সঙ্গে বিশ্বজুড়ে অর্থনৈতিক বৈষম্য এখন অগ্রহণযোগ্য ও চরম মাত্রায় পৌঁছেছে। এমন পরিস্থিতিতে উন্নয়ন বলতে আমরা আসলে কী বুঝি এবং আমাদের সামনে নীতিগত কী কী বিকল্প রয়েছে, তা নিয়ে নতুন করে ভাবার সময় এসেছে। যুক্তরাষ্ট্রের কর্নেল বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতি বিভাগের সম্মানিত অধ্যাপক ও বিশ্বব্যাংকের সাবেক প্রধান অর্থনীতিবিদ কৌশিক বসু এসব কথা বলেছেন।

রাজধানীর একটি হোটেলে আয়োজিত ‘সৈয়দ হুমায়ুন কবীর স্মৃতি গবেষণা সম্মেলন ২০২৬’–এ মূল বক্তা হিসেবে ভার্চ্যুয়ালি যুক্ত হয়ে তিনি এ বক্তব্য দেন। ‘ন্যায্যতা, সক্ষমতা ও জীবনকুশলতা’ শিরোনামের এই পর্বটির যৌথ আয়োজন করে বাঙলার পাঠশালা ফাউন্ডেশন ও সাজেদা ফাউন্ডেশন। অনুষ্ঠানে সভাপতিত্ব করেন বিশিষ্ট অর্থনীতিবিদ অধ্যাপক রেহমান সোবহান। স্বাগত বক্তব্য দেন বাঙলার পাঠশালা ফাউন্ডেশনের প্রতিষ্ঠাতা আহমেদ জাভেদ চৌধুরী। এ ছাড়া সূচনা বক্তব্য দেন সাজেদা ফাউন্ডেশনের চেয়ারপারসন ফারুক সোবহান ও জ্যেষ্ঠ গবেষণা উপদেষ্টা সাজেদা আমিন।

অধ্যাপক কৌশিক বসু তাঁর বক্তব্যে বিশ্বজুড়ে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআইয়ের দ্রুত প্রসারের বিষয়টি তুলে ধরেন। তিনি বলেন, এর ফলে প্রচলিত শ্রমের চাহিদা ক্রমান্বয়ে হ্রাস পাচ্ছে। বাংলাদেশ বা ভারতের মতো উন্নয়নশীল ও উদীয়মান অর্থনীতির দেশগুলোতে জনসংখ্যার একটি বিশাল অংশ মূলত শারীরিক বা প্রচলিত শ্রমের ওপর নির্ভর করে জীবিকা নির্বাহ করে। ফলে এই প্রযুক্তির প্রভাবে সমাজে এক ধরনের উদ্বেগজনক চাপ ও সংকটের লক্ষণ স্পষ্ট হয়ে উঠছে। বর্তমানে জিডিপির একটি বড় অংশ চলে যাচ্ছে মুনাফা, উচ্চ আয় ও মেধাস্বত্বের পকেটে, যার বিপরীতে সাধারণ শ্রমিকদের প্রাপ্য অংশ সংকুচিত হচ্ছে।

বৈষম্যের নতুন রূপ ব্যাখ্যা করতে গিয়ে কৌশিক বসু বলেন, বর্তমানে সমাজের মাত্র ০.১ শতাংশ অতি ক্ষুদ্র অংশের হাতে বিপুল পরিমাণ সম্পদ ও আয় পুঞ্জীভূত হচ্ছে। এই অর্থনৈতিক ক্ষমতা এখন কেবল ভোগ বা সম্পদ ক্রয়ের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নেই, বরং তা সাধারণ মানুষের কণ্ঠস্বরকেও প্রভাবিত করছে। আগে অতি ধনীরা বাড়ি, গাড়ি, বিমান বা জাহাজ কিনতেন; কিন্তু এখন তাঁরা সংবাদপত্র, টেলিভিশন কিংবা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের মতো জনমত গঠনের প্রধান মাধ্যমগুলোর মালিকানা নিয়ন্ত্রণ করছেন। এর ফলে অর্থনৈতিক বৈষম্য শেষ পর্যন্ত ‘কণ্ঠস্বরের বৈষম্যে’ রূপ নিচ্ছে, যা গণতান্ত্রিক ব্যবস্থার জন্য বড় ধরনের চ্যালেঞ্জ। ভারতের গ্রামপর্যায়ের গবেষণার উদাহরণ দিয়ে তিনি দেখান, কীভাবে প্রভাবশালী বা অতি ধনীদের উপস্থিতিতে সাধারণ মানুষের নিজস্ব সমস্যার কথা বলার সুযোগ সংকুচিত বা স্তিমিত হয়ে পড়ে।

এই বৈশ্বিক সংকট থেকে উত্তরণের পথ খুঁজতে নতুন জ্ঞান ও চিন্তাশক্তিকে কাজে লাগানোর আহ্বান জানান বিশ্বব্যাংকের সাবেক এই প্রধান অর্থনীতিবিদ। তিনি ১৭৫০ থেকে ১৮৫০ সালের শিল্পবিপ্লবের সময়কালের কথা স্মরণ করিয়ে দিয়ে বলেন, সে সময় একদিকে যেমন শক্তিশালী নতুন জ্ঞান তৈরি হয়েছিল, অন্যদিকে ছিল সামাজিক আন্দোলন ও নৈতিক অবস্থান। এই দুই শক্তির মেলবন্ধনেই শিশুশ্রম বন্ধ করা ও কর্মঘণ্টা কমানোর মতো ঐতিহাসিক দাবিগুলো আদায় করা সম্ভব হয়েছিল। বর্তমানের চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় একাডেমিক গবেষণার বড় ভূমিকা রয়েছে উল্লেখ করে কৌশিক বসু বলেন, জ্ঞান, নৈতিক চিন্তা, সামাজিক উদ্যোগ, গবেষণা ও সক্রিয়তাকে একই আলোচনার টেবিলে নিয়ে আসতে হবে, যাতে সবার জন্য একটি বৈষম্যহীন ও উন্নততর বিশ্ব গড়ে তোলা সম্ভব হয়।