নাগরিক জীবনের গতি বাড়াতে এবং ঢাকার পরিবহন সংকট নিরসনে সরকার তিনটি নতুন মেট্রোরেল প্রকল্পের অনুমোদন দিয়েছে। বুধবার একনেক বৈঠকে এমআরটি-১, এমআরটি-৫ (উত্তর) এবং এমআরটি-৫ (দক্ষিণ) প্রকল্পগুলোর অনুমোদন দেওয়া হয়। এই তিন প্রকল্পে মোট ব্যয় ধরা হয়েছে ২ লাখ ৪৯ হাজার ৭৪৭ কোটি ২ লাখ টাকা। এমআরটি লাইন-১ এবং লাইন-৫ উত্তর রুটের সম্মিলিত সংশোধিত ব্যয় ২ লাখ ৪ হাজার ২৪৩ কোটি ২৫ লাখ টাকা, যা মূল অনুমোদনের তুলনায় ১ লাখ ১০ হাজার ৪৪৩ কোটি ২৭ লাখ টাকা বেশি। এছাড়া এমআরটি-৫ দক্ষিণ রুটের জন্য ৪৫ হাজার ৫০৩ কোটি ৭৭ লাখ টাকা বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে। পরিকল্পনা প্রতিমন্ত্রী মো. জোনায়েদ আবদুর রহিম সাকি জানান, ক্রমবর্ধমান নগরায়ণের চাহিদা মেটাতে শুধু এই তিনটি নয়, ঢাকা ও এর আশপাশের এলাকায় আরও মেট্রোরেল নির্মাণের পরিকল্পনা রয়েছে সরকারের।

এমআরটি লাইন-১ প্রকল্পের আওতায় বিমানবন্দর থেকে কমলাপুর পর্যন্ত পাতাল ও উড়ালপথের সমন্বয়ে কাজ হবে। ২০১৯ সালের ১৫ অক্টোবর একনেক সভায় অনুমোদিত এই প্রকল্পের প্রাক্কলিত ব্যয় ছিল ৫২ হাজার ৫৬১ কোটি ৪৩ লাখ টাকা। নানা জটিলতায় নির্ধারিত সময়ে কাজ শেষ না হওয়ায় এখন এটি ২০৩৩ সালের মধ্যে শেষ করার লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে। প্রকল্পের ব্যয় মূল প্রাক্কলনের তুলনায় ১১৭ দশমিক ৬৪ শতাংশ বেড়ে দাঁড়িয়েছে ১ লাখ ১৪ হাজার ৩৯৪ কোটি টাকা। এর মধ্যে জাইকার ঋণ ৮৩ হাজার ৮৪২ কোটি ৬৩ লাখ টাকা এবং বাকি টাকা সরকার দেবে। ২০১৯ সালে বাংলাদেশ ০.৬ শতাংশ থেকে ০.৯ শতাংশ সুদে ঋণ চুক্তি করে। ২১টি স্টেশনের এই প্রকল্পে ১২টি পাতাল ও ৭টি উড়াল স্টেশন থাকবে। প্রতিদিন প্রায় ৮ লাখ যাত্রী যাতায়াত করবে বলে প্রাথমিক প্রাক্কলন করা হয়েছে। নির্মাণকাজের সময় যানজট নিয়ন্ত্রণে প্রায় ২০ কিলোমিটার বিকল্প সড়ক নির্মাণের পরিকল্পনাও প্রকল্পে যুক্ত করা হয়েছে।

হেমায়েতপুর থেকে ভাটারা পর্যন্ত ২০ কিলোমিটার এমআরটি-৫ উত্তর রুটের মূল ব্যয় ছিল ৪১ হাজার ২৩৮ কোটি ৫৫ লাখ টাকা। সংশোধিত ব্যয় দাঁড়িয়েছে ৮৯ হাজার ৮৪৮ কোটি ৩৬ লাখ টাকা, যা ১১৭ দশমিক ৮৭ শতাংশ বেশি। এর মধ্যে জাপানের ঋণ ৬৭ হাজার ৫১৮ কোটি ২৫ লাখ টাকা এবং সরকারের অর্থ ২২ হাজার ৩৩০ কোটি ১১ লাখ টাকা। এই রুটে ১৩ দশমিক ৫ কিলোমিটার পাতাল ও ৬ দশমিক ৫ কিলোমিটার উড়ালপথ থাকবে। মোট ১৪টি স্টেশনের মধ্যে ৯টি পাতাল ও ৫টি উড়াল। প্রকল্পটি ২০২৮ সালে শেষ করার লক্ষ্য থাকলেও সংশোধিত পরিকল্পনায় তা পিছিয়ে ২০৩২ সালের ডিসেম্বর করা হয়েছে। এই প্রকল্পে এমআরটি-১ এর মতো ০.৬ শতাংশ থেকে ০.৯ শতাংশ সুদে নমনীয় ঋণ নেওয়া হয়েছে, তবে নতুন চুক্তিতে এই হার বাড়তে পারে। প্রতিদিন গড়ে ১২ লাখ ৩০ হাজার যাত্রী যাতায়াত করবে বলে ধারণা করা হচ্ছে।

গাবতলী থেকে দাশেরকান্দি পর্যন্ত ১৭ দশমিক ২০ কিলোমিটার এমআরটি-৫ দক্ষিণ রুটের ব্যয় নির্ধারণ করা হয়েছে ৪৫ হাজার ৫০৩ কোটি ৭৭ লাখ টাকা। এই নতুন প্রকল্পের মোট ব্যয়ের মধ্যে সরকারের অর্থ ১৫ হাজার ১৯৭ কোটি ৬৬ লাখ এবং এডিবি ও দক্ষিণ কোরিয়ার অর্থায়ন ৩০ হাজার ৩০৬ কোটি ১০ লাখ টাকা। এই রুটের ১৩ দশমিক ১০ কিলোমিটার পাতাল ও ৪ দশমিক ১৫ কিলোমিটার উড়ালপথ থাকবে। মোট ১৫টি স্টেশনের মধ্যে ১১টি পাতাল ও ৪টি উড়াল। প্রকল্পটি ২০২৬ সালের সেপ্টেম্বর থেকে ২০৩৩ সালের আগস্ট পর্যন্ত বাস্তবায়নের সময় ধরা হয়েছে। প্রতিদিন গড়ে ৯ লাখ ২৪ হাজার যাত্রী যাতায়াত করবে বলে ধারণা করা হচ্ছে।

মেট্রোরেল প্রকল্পের ব্যয় বৃদ্ধি ও ঠিকাদার নির্বাচন প্রক্রিয়া নিয়ে বুয়েটের সিভিল ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগের অধ্যাপক মো. হাদিউজ্জামান উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন। তিনি বলেন, ডিজাইন ও নির্মাণ পদ্ধতি জাপানি পেটেন্ট বা বিশেষায়িত প্রযুক্তিনির্ভর হওয়ায় দরপত্র প্রক্রিয়া সীমিত হয়ে পড়ছে, যা আর্থিক বোঝা বাড়াতে পারে। তিনি আরও বলেন, পাতাল রেলের পরিচালন ব্যয় অত্যন্ত বেশি, কারণ এতে সার্বক্ষণিক কৃত্রিম আলো ও বায়ু চলাচল ব্যবস্থা চালু রাখতে হয়। তবে সরকারের একজন অতিরিক্ত সচিব নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, আধুনিক নগর পরিবহণব্যবস্থায় মেট্রোর বিকল্প নেই। তিনি বলেন, রক্ষণাবেক্ষণ খরচ থাকলেও এর অর্থনৈতিক গুরুত্ব বিবেচনা করতে হবে এবং প্রতিবেশী ভারতের মতো আমাদেরও সব রুটে মেট্রোরেল চালু হলে নাগরিকরা এর সুফল ভোগ করতে পারবেন।