১৮ সেপ্টেম্বর ২০২৬ (2026) তারিখে প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী, ঢাকার মেট্রোরেল নেটওয়ার্ক সম্প্রসারণে সরকারের নেওয়া নতুন প্রকল্পগুলোর মধ্যে দুটিতে অর্থায়ন ও প্রযুক্তির ক্ষেত্রে একটিমাত্র দেশের ওপর একক নির্ভরতা তৈরি হচ্ছে। বিশেষজ্ঞরা সতর্ক করে বলেছেন, দীর্ঘমেয়াদে এই জাপাননির্ভরতা প্রতিযোগিতামূলক দরপত্র প্রক্রিয়াকে সংকুচিত করে ফেলতে পারে।

সম্প্রতি জাতীয় অর্থনৈতিক পরিষদের নির্বাহী কমিটির (একনেক) বৈঠকে অনুমোদিত তিনটি মেট্রোরেল প্রকল্পের মধ্যে এমআরটি লাইন-১ এবং এমআরটি লাইন-৫ (উত্তর)—এই দুটি প্রকল্পের প্রধান অর্থায়নকারী জাপান আন্তর্জাতিক সহযোগিতা সংস্থা (জাইকা)। এই দুই প্রকল্পে জাপানি ঋণের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে দেড় লাখ কোটি টাকারও বেশি। এর মধ্যে এমআরটি-১ প্রকল্পে ৮৩ হাজার ৮৪২ কোটি ৬৩ লাখ টাকা এবং এমআরটি-৫ (উত্তর) প্রকল্পে জাইকা দিচ্ছে ৬৭,৫১৮ কোটি ২৫ লাখ টাকা।

এই প্রকল্পের নকশা ও প্রযুক্তির সীমাবদ্ধতা নিয়ে কথা বলেছেন বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বুয়েট) সিভিল ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগের অধ্যাপক মো. হাদিউজ্জামান। তিনি উল্লেখ করেন, মেট্রোরেলের দরপত্র প্রক্রিয়াটি ধীরে ধীরে সীমিত টেন্ডারিংয়ের দিকে চলে যাচ্ছে। এর কারণ হিসেবে তিনি বলেন, প্রকল্পগুলোর নকশা এমনভাবে তৈরি করা হচ্ছে এবং ঠিকাদারদের জন্য এমন নির্দিষ্ট নির্মাণ পদ্ধতি নির্ধারণ করা হচ্ছে, যা মূলত জাপানি পেটেন্ট বা বিশেষায়িত প্রযুক্তির ওপর নির্ভরশীল। এর ফলে এই কাজগুলো করার সক্ষমতা কেবল জাপানি ঠিকাদারদের মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকছে। অধ্যাপক হাদিউজ্জামান বিভিন্ন অর্থায়ন চুক্তির অধীনে বাস্তবায়নাধীন মেট্রো প্রকল্পগুলোর ব্যয় ও ঠিকাদার নির্বাচন প্রক্রিয়া নিয়ে একটি তুলনামূলক পর্যালোচনার তাগিদ দেন।

বিপরীতে, একই সময়ে অনুমোদিত তৃতীয় প্রকল্প এমআরটি লাইন-৫ (দক্ষিণ)-এ ভিন্ন চিত্র দেখা গেছে। এই প্রকল্পে এশীয় উন্নয়ন ব্যাংক (এডিবি) ও দক্ষিণ কোরিয়া অর্থায়ন করছে। প্রকল্পটির মোট ৪৫ হাজার ৫০৩ কোটি ৭৭ লাখ টাকা ব্যয়ের মধ্যে সরকারের নিজস্ব তহবিল থেকে ১৫ হাজার ১৯৭ কোটি ৬৬ লাখ টাকা দেওয়া হবে এবং বাকি ৩০ হাজার ৩০৬ কোটি ১০ লাখ টাকা আসবে এডিবি ও দক্ষিণ কোরিয়ার কাছ থেকে। অর্থাৎ, এই প্রকল্পে অর্থায়নকারী একাধিক হলেও অন্য দুটিতে একক দেশনির্ভর কাঠামো গড়ে উঠেছে।

এই একক নির্ভরতার পাশাপাশি প্রকল্পগুলোর ব্যয় বৃদ্ধির বিষয়টিও সামনে এসেছে। জাপানি অর্থায়নে বাস্তবায়নাধীন এমআরটি-১ এবং এমআরটি-৫ (উত্তর) প্রকল্প দুটিতেই মূল প্রাক্কলনের চেয়ে প্রায় সমান হারে ব্যয় বেড়েছে। এমআরটি-১-এ ১১৭.৬৪ শতাংশ এবং এমআরটি-৫ (উত্তর)-এ ১১৭.৮৭ শতাংশ ব্যয় বৃদ্ধি পেয়েছে। দুই প্রকল্প মিলিয়ে অতিরিক্ত ব্যয়ের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ১ লাখ ১০ হাজার ৪৪৩ কোটি ২৭ লাখ টাকা।

বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, নির্দিষ্ট একটি দেশের প্রযুক্তি ও ঋণের ওপর অতিরিক্ত নির্ভরশীলতা দীর্ঘমেয়াদে দর-কষাকষির সক্ষমতা কমিয়ে দেয়। এছাড়া ভবিষ্যতে খুচরা যন্ত্রাংশ সরবরাহ, নিয়মিত রক্ষণাবেক্ষণ এবং প্রযুক্তিগত হালনাগাদের ক্ষেত্রেও একই দেশের ওপর নির্ভরশীল থাকার ঝুঁকি তৈরি হতে পারে।