রাষ্ট্রের কেন্দ্রীয় শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত দপ্তরে বসে তৈরি করা নথিপত্র আর ফসলের মাঠের কর্দমাক্ত বাস্তবতার মধ্যে যে কত যোজন যোজন দূরত্ব থাকতে পারে, তার এক নগ্ন ও নির্মম দৃষ্টান্ত হয়ে উঠেছে বর্তমান সার পরিস্থিতি। আমন ধানের ভরা মৌসুম এবং আসন্ন রবিশস্যের প্রস্তুতিকালে দেশের কৃষিব্যবস্থা এক অভূতপূর্ব ও দমবন্ধ করা অস্থিরতার মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। একদিকে সরকারি খাতাপত্র, পরিসংখ্যান এবং নীতিনির্ধারকদের বক্তব্য অত্যন্ত জোরালো ভাষায় আশ্বস্ত করছে, দেশের গুদামগুলোতে রাসায়নিক সারের বিন্দুমাত্র ঘাটতি নেই। কিন্তু এই গালভরা আশ্বাসের ঠিক উল্টো পিঠেই রচিত হচ্ছে প্রান্তিক কৃষকের হাহাকারের এক করুণ আখ্যান। ঘণ্টার পর ঘণ্টা, এমনকি রাতের অন্ধকার থেকে ডিলারের গুদামের সামনে লাইনে দাঁড়িয়েও যখন একজন কৃষককে খালি হাতে বাড়ি ফিরতে হয়, তখন সেই কাগজের পরিসংখ্যান তার কাছে এক নিষ্ঠ‍ুর উপহাস ছাড়া আর কিছুই মনে হয় না।

কৃষকের এই নীরব দীর্ঘশ্বাস আজ কেবল মাঠেই সীমাবদ্ধ নেই; তা রাজপথের বিক্ষোভে, মহাসড়ক অবরোধে এবং চরম হতাশায় গুদাম ভাঙচুরের মতো নজিরবিহীন ঘটনায় রূপান্তরিত হয়েছে। সারের এই কৃত্রিম সংকট কোনো বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়; বরং এটি দেশের সামগ্রিক কৃষি সরবরাহ শৃঙ্খলে ঘুণে ধরার এক অকাট্য প্রমাণ। গত কয়েক সপ্তাহের ঘটনাপ্রবাহ গভীরভাবে বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, উত্তরের সীমান্তবর্তী জেলাগুলো থেকে শুরু করে দেশের বিভিন্ন প্রান্তের কৃষকরা সারের দাবিতে অন্তত ডজনখানেকের বেশি তীব্র প্রতিবাদ কর্মসূচি পালন করেছেন। কোথাও উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার কার্যালয় ঘেরাও করা হয়েছে, কোথাও মহাসড়কে গাছের গুঁড়ি ফেলে যান চলাচল স্তব্ধ করে দেওয়া হয়েছে, আবার কোথাও চরম নিরুপায় হয়ে কৃষকরা ডিলারের গুদামের টিনের বেড়া ভেঙে নিজেদের বেঁচে থাকার শেষ অবলম্বনটুকু অর্থাৎ সারটুকু কাঁধে তুলে নিয়েছেন। একজন কৃষক, যিনি স্বভাবগতভাবেই অত্যন্ত নিরীহ এবং মাটি কামড়ে পড়ে থাকা মানুষ, তিনি যখন আইন নিজের হাতে তুলে নিতে বাধ্য হন, তখন বুঝতে হবে সংকটের শেকড় কতটা গভীরে পৌঁছেছে। এটি কেবল আইনশৃঙ্খলার অবনতি নয়, এটি মূলত পেটের দায়ে এবং ফসলের মাঠে ভবিষ্যতের স্বপ্ন শুকিয়ে যাওয়ার আশঙ্কায় এক মরিয়া অস্তিত্ব রক্ষার লড়াই।

মাঠপর্যায়ের চিত্র বলছে, সার যে একেবারেই নেই তা নয়, তবে তা চলে গেছে এক অদৃশ্য ও নিষ্ঠ‍ুর সিন্ডিকেটের হাতের মুঠোয়। নির্ধারিত ডিলারদের কাছে গেলে চিরচেনা উত্তর মিলছে- 'গুদামে সার নেই'। অথচ সেই একই সার রাতের অন্ধকারে কিংবা পেছনের দরজা দিয়ে পাড়া-মহল্লার খুচরা দোকানে চলে যাচ্ছে। সেখানে সরকারি নির্ধারিত মূল্যের চেয়ে বস্তাপ্রতি কয়েকশ টাকা পর্যন্ত বেশি দাম হাঁকানো হচ্ছে। যখন সকালে জমিতে সার ছিটানোর সবচেয়ে মোক্ষম সময়, তখন কৃষককে হন্যে হয়ে ঘুরতে হচ্ছে দ্বারে দ্বারে। পরিবহন খরচ বৃদ্ধি, সরবরাহ ঘাটতি কিংবা বাকিতে বিক্রির মতো খোঁড়া অজুহাত দাঁড় করিয়ে এই অসাধু চক্র সাধারণ কৃষকের পকেট কাটছে। কৃষকের এই অসহায়ত্বের সুযোগ নিয়ে যারা মুনাফার পাহাড় গড়ছেন, তারা আসলে কেবল কৃষকের সঙ্গেই প্রতারণা করছেন না, বরং পুরো রাষ্ট্রের খাদ্য নিরাপত্তার বুনিয়াদকে নড়বড়ে করে দিচ্ছেন।

অথচ এই হাহাকারের বিপরীতে সরকারি দপ্তরের পরিসংখ্যান এক সম্পূর্ণ ভিন্ন ও স্বস্তিদায়ক গল্প শোনায়। কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর ও সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়গুলোর তথ্য অনুযায়ী, বর্তমানে দেশের বিভিন্ন গুদামে অন্তত ১২ থেকে ১৪ লাখ মেট্রিক টন রাসায়নিক সারের মজুত রয়েছে। এর মধ্যে ইউরিয়া, টিএসপি, ডিএপি এবং এমওপি সারের একটি বিশাল ভাণ্ডার সুরক্ষিত আছে। সরকারের দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনার হিসাব আরো বিস্ময়কর। আসন্ন অক্টোবর থেকে আগামী বছরের ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত দেশে সব ধরনের সারের সম্মিলিত যে চাহিদা প্রাক্কলন করা হয়েছে, তার পরিমাণ প্রায় ৪০ লাখ টনের কিছু বেশি। অথচ এই সময়ের মধ্যে পাইপলাইনে থাকা আমদানি এবং স্থানীয় উৎপাদন মিলিয়ে দেশে সম্ভাব্য সারের জোগান দাঁড়াবে প্রায় ৫৪ লাখ টনের কাছাকাছি। অর্থাৎ, সম্ভাব্য সর্বোচ্চ চাহিদার চেয়েও অন্তত ১৩ থেকে ১৪ লাখ টন সার উদ্ব‍ৃত্ত থাকার কথা। তাহলে প্রশ্ন ওঠা অত্যন্ত স্বাভাবিক- যেখানে চাহিদার চেয়ে জোগানের অঙ্ক এত বিশাল, সেখানে মাঠের বাস্তবতা এতটা রূঢ় কেন? অর্থনীতি ও কৃষি বিশ্লেষকদের মতে, রাষ্ট্রের গুদামে সারের পাহাড় থাকা আর একজন প্রান্তিক কৃষকের হাতে সঠিক সময়ে, সঠিক মূল্যে তা পৌঁছানো কখনোই সমার্থক নয়। মূলত এই সংকটের নেপথ্যে রয়েছে পুরনো বিতরণ কাঠামোর রাজনৈতিক আধিপত্য এবং নতুন নীতিমালার বাস্তবায়নে সৃষ্ট স্বার্থের সংঘাত। দীর্ঘকাল ধরে দেশের সার বিতরণ ব্যবস্থায় একটি ইউনিয়নে একজনমাত্র প্রধান ডিলারের একচেটিয়া নিয়ন্ত্রণ ছিল। ফলে, স্থানীয় প্রভাবশালী ব্যক্তিরা বছরের পর বছর ধরে কৃষকের ওপর নিজেদের মনগড়া শর্ত চাপিয়ে আসছিলেন। বর্তমান প্রশাসন এই একচেটিয়া আধিপত্য ভেঙে একটি ইউনিয়নে একাধিক ডিলার এবং খুচরা বিক্রেতা নিয়োগের যে যুগান্তকারী ও জনবান্ধব নীতিমালা গ্রহণ করেছে, তাতেই আঁতে ঘা লেগেছে পুরনো সিন্ডিকেটের। নিজেদের একচেটিয়া মুনাফা হারানোর ভয়ে তারা নানাভাবে নতুন ব্যবস্থাকে বাধাগ্রস্ত করছেন, সময়মতো সার উত্তোলন করছেন না এবং কৃত্রিম সংকট তৈরি করে সরকারকে জনবিচ্ছিন্ন করার অপচেষ্টায় লিপ্ত হয়েছেন। এর পাশাপাশি রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের সুযোগ নিয়ে সার বিপণন ব্যবস্থায় হঠাৎ গজিয়ে ওঠা নতুন কিছু মধ্যস্বত্বভোগী চক্রও পরিস্থিতিকে ঘোলাটে করছে।

দেশজুড়ে সাঁড়াশি অভিযান ও ভ্রাম্যমাণ আদালত পরিচালনার মাধ্যমে এই সিন্ডিকেট ভাঙার চেষ্টা চলছে। মাত্র কয়েক দিনের ব্যবধানে শত শত অভিযানে লাখ লাখ টাকা জরিমানা, লাইসেন্স বাতিল এবং কারাদণ্ডের মতো কঠোর শাস্তিমূলক ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়েছে। দেশের প্রতিটি জেলায় বিতরণ ব্যবস্থায় স্বচ্ছতা আনতে বিশেষ মনিটরিং সেল ও ট্যাগ অফিসার নিয়োগ দেওয়া হয়েছে। কিন্তু এতসব উপর থেকে চাপানো প্রশাসনিক পদক্ষেপের পরও মাঠের বাস্তবতায় কাঙ্ক্ষিত পরিবর্তন আসছে না। এর মূল কারণ হলো, দুর্নীতি ও অব্যবস্থাপনার শেকড় কেবল ডিলারের গুদামে নয়, বরং পুরো সিস্টেমের রন্ধ্রে রন্ধ্রে ছড়িয়ে আছে। প্রশাসনের লোকবল সংকট এবং স্থানীয় পর্যায়ে নজরদারির অভাবের সুযোগ নিয়ে অসাধু চক্র ঠিকই তাদের ফায়দা লুটে নিচ্ছে।

তবে এই বিতরণ ব্যবস্থার ত্রুটি ও সিন্ডিকেটের কারসাজি হলো সংকটের একটি দিক মাত্র। বাংলাদেশের সার সংকটের আরো একটি বড় এবং কাঠামোগত দুর্বলতা হলো চরম আমদানিনির্ভরতা। প্রতি বছর দেশে প্রায় ৭০ লাখ মেট্রিক টন রাসায়নিক সারের বিপুল চাহিদা রয়েছে, যার মধ্যে কেবল ইউরিয়াই লাগে ২৬ লাখ টনের বেশি। কিন্তু জ্বালানি গ্যাস সংকট, কাঁচামালের অভাব এবং কারখানার যান্ত্রিক ত্রুটির কারণে দেশের রাষ্ট্রায়ত্ত সার কারখানাগুলো তাদের উৎপাদন সক্ষমতার ন্যূনতম অংশও ব্যবহার করতে পারছে না। ফলে, প্রতি বছর মোট চাহিদার প্রায় ৮০ থেকে ৮৫ শতাংশ সারই আন্তর্জাতিক বাজার থেকে বিপুল পরিমাণ বৈদেশিক মুদ্রা ব্যয় করে আমদানি করতে হয়। এই বিপুল আমদানিনির্ভরতার কারণে আন্তর্জাতিক বাজারে সারের দাম বাড়লে কিংবা বিশ্বব্যাপী সরবরাহ শৃঙ্খলে সামান্য বিঘ্ন ঘটলেই বাংলাদেশের মতো কৃষিনির্ভর দেশগুলোকে চরম ঝুঁকির মুখে পড়তে হয়।

এই কাঠামোগত সংকট থেকে উত্তরণ এবং সারের ক্ষেত্রে স্বয়ংসম্পূর্ণতা অর্জনের জন্য বিজ্ঞানীরা এখন তাকিয়েছেন প্রযুক্তির দিকে। বিশ্ব কৃষিতে ‘চতুর্থ বিপ্লব’ হিসেবে আবির্ভূত হওয়া ‘ন্যানো ফার্টিলাইজার’ বা অণু সার হতে পারে বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ কৃষির সবচেয়ে বড় রক্ষাকবচ। প্রচলিত রাসায়নিক সারের ব্যবহার গত দুই দশকে কয়েকগুণ বেড়েছে, যা একদিকে যেমন আমদানি ব্যয় বাড়াচ্ছে, অন্যদিকে মাটির স্বাভাবিক উর্বরতা নষ্ট করছে এবং নদী-নালার পানি দূষিত করছে। ন্যানো প্রযুক্তি ব্যবহার করে তৈরি এই অত্যাধুনিক সারের কণা এতই ক্ষুদ্র যে, এক লিটার পানিতে প্রায় ৫০ কোটির মতো কণা মেশানো সম্ভব। প্রচলিত দানাদার ইউরিয়া জমিতে ছিটানোর পর এর মাত্র ৩০ থেকে ৪০ শতাংশ গাছ গ্রহণ করতে পারে; বাকি বিশাল অংশ বাতাসে উবে যায় বা পানিতে ধুয়ে যায়। অথচ ন্যানো সারের ক্ষেত্রে ফসলের পুষ্টি গ্রহণক্ষমতা ৭০ থেকে ৮০ শতাংশ পর্যন্ত হতে পারে। কৃষি বিজ্ঞানীদের গভীর গবেষণায় উঠে এসেছে, মাত্র ৫০০ মিলিলিটার তরল ন্যানো ইউরিয়া একটি ৪৫ কেজি ওজনের প্রচলিত দানাদার ইউরিয়া বস্তার সমপরিমাণ পুষ্টি জোগাতে সক্ষম। এই সার পাতায় স্প্রে করলে তা সরাসরি পাতার ক্ষুদ্র ছিদ্র দিয়ে গাছের ভেতরে প্রবেশ করে এবং জাদুর মতো কাজ করে। এটি উৎপাদন ও পরিবহনে কার্বন ফুটপ্রিন্ট প্রায় ৮০ শতাংশ পর্যন্ত কমাতে সক্ষম, যা জলবায়ু পরিবর্তনের ঝুঁকি মোকাবিলায় এক যুগান্তকারী পদক্ষেপ। বর্তমানে বিশ্বের উন্নত দেশগুলোর পাশাপাশি বাংলাদেশেও ন্যানো প্রযুক্তি নিয়ে গবেষণা চলছে। বিশেষ করে ‘বায়োচার-কোটেড ন্যানো ইউরিয়া’ নিয়ে বিজ্ঞানীরা আশাবাদী, যা মাটিতে দীর্ঘ সময় ধরে ধীরে ধীরে পুষ্টি উপাদান ছাড়তে সক্ষম। এই আধুনিক প্রযুক্তি ব্যাপকভাবে কাজে লাগানো গেলে ২০৩০ সালের মধ্যে বাংলাদেশের সার আমদানি অন্তত ৩০ শতাংশ পর্যন্ত কমিয়ে আনা সম্ভব হবে, যা রাষ্ট্রের হাজার হাজার কোটি টাকার বৈদেশিক মুদ্রা সাশ্রয় করবে।

তবে এই প্রযুক্তিগত উল্লম্ফনের পথেও বেশ কিছু দুর্লঙ্ঘ্য বাধা রয়েছে। জাতীয় পর্যায়ে ন্যানো সার উৎপাদন ও ব্যবহারের জন্য সুনির্দিষ্ট কোনো নীতিমালা এখনো প্রণীত হয়নি। বিচ্ছিন্নভাবে ল্যাবরেটরিতে কিছু সফল গবেষণা হলেও, তা বাণিজ্যিকভাবে উৎপাদনের জন্য প্রয়োজনীয় বৃহৎ শিল্প অবকাঠামো দেশে অনুপস্থিত। সবচেয়ে বড় আশঙ্কার জায়গা হলো মান নিয়ন্ত্রণ। তরল ন্যানো সার যখন জনপ্রিয় হতে শুরু করবে, তখন অসাধু চক্র বাজারে রঙিন পানি ভরে নকল সার বিক্রি করে কৃষকের সঙ্গে প্রতারণা করতে পারে। একবার কোনো কৃষকের ফসল নষ্ট হলে এই পুরো প্রযুক্তির ওপর থেকেই সাধারণ মানুষের আস্থা চিরতরে বিলীন হয়ে যাবে। তাই, এই প্রযুক্তি মাঠে নামানোর আগে একটি অত্যন্ত শক্তিশালী, বিকেন্দ্রীকৃত এবং আধুনিক মান নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা ও পরীক্ষাগার স্থাপন করা রাষ্ট্রের জন্য অপরিহার্য। পাশাপাশি ন্যানো কণা দীর্ঘমেয়াদে মাটির অণুজীব ও পরিবেশের ওপর কী ধরনের প্রভাব ফেলে, তা নিয়ে আরো নিবিড় গবেষণার প্রয়োজন রয়েছে।

পরিশেষে এটি অত্যন্ত স্পষ্টভাবে বলা যায়, ভবিষ্যতের বিজ্ঞানভিত্তিক সমাধানের পথে অগ্রসর হওয়ার পাশাপাশি বর্তমানের এই দুর্নীতিগ্রস্ত ও সিন্ডিকেটনির্ভর বিতরণ ব্যবস্থাকে এখনই কঠোর হাতে সমূলে উৎপাটন করা প্রয়োজন। রাষ্ট্রের গুদামে পাহাড়সমান সার মজুত রেখে যদি ঠিক সময়ে তা কৃষকের জমিতে না পৌঁছায়, তবে সেই উপচে পড়া মজুতের বিন্দুমাত্র কোনো সার্থকতা নেই। কৃষকের ঘাম, মাটি আর কালচে হয়ে আসা হাতের রেখাতেই লুকিয়ে আছে দেশের আঠারো কোটি মানুষের খাদ্যের জোগান ও জাতীয় নিরাপত্তা। আমন ধানের এই ভরা মৌসুমে সঠিক সময়ে সার না পেলে ফলন মারাত্মকভাবে ব্যাহত হবে, যার অনিবার্য ও প্রত্যক্ষ পরিণতি হিসেবে চালের দাম বাড়বে এবং মূল্যস্ফীতির কশাঘাতে পিষ্ট হবে দেশের সাধারণ খেটে খাওয়া মানুষ। প্রশাসন এবং সিন্ডিকেটের এই অন্তহীন ইঁদুর-বেড়াল খেলায় কৃষকের কষ্টার্জিত ফসল যদি নষ্ট হয়, তবে তা কেবল কৃষকের ব্যক্তিগত পারিবারিক ক্ষতি নয়, বরং পুরো জাতির জন্য এক ভয়াবহ অর্থনৈতিক অশনিসংকেত। সময় থাকতে কাগজের আরামদায়ক হিসাব আর পরিসংখ্যানের মায়াজাল থেকে বেরিয়ে এসে, মাঠের কর্দমাক্ত বাস্তবতায় কঠোর নজরদারি ও স্বচ্ছতা প্রতিষ্ঠা করাটাই এখন রাষ্ট্রের সবচেয়ে জরুরি কর্তব্য। কৃষকের মুখের হাসি নিভিয়ে দিয়ে, তাদের চোখের জলে ফসলের মাঠ ভিজিয়ে কোনো দেশ কখনোই খাদ্যে স্বয়ংসম্পূর্ণ হতে পারে না। কৃষকের অধিকার রক্ষা এবং সারের সুষম বণ্টন নিশ্চিত করার মাধ্যমেই কেবল আমরা একটি নিরাপদ, স্বনির্ভর এবং ক্ষুধামুক্ত আগামীর স্বপ্ন দেখতে পারি।