মুহাম্মদ আলী জিন্নাহর বাবা মাছ বিক্রি করতেন এবং তিনি মূলত হিন্দু ছিলেন বলে মন্তব্য করেছেন কিশোরগঞ্জ-৪ আসনের সাবেক সংসদ সদস্য ও বিএনপি নেতা অ্যাডভোকেট মো. ফজলুর রহমান। সম্প্রতি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদের (ডাকসু) সংগ্রহশালায় জিন্নাহর ছবি ভাঙার ঘটনার সূত্র ধরে তিনি এই মন্তব্য করেন।
গত বৃহস্পতিবার (১৭ সেপ্টেম্বর) সন্ধ্যায় জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলাম বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রশাসনিক ভবনের কনফারেন্স কক্ষে আয়োজিত এক অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এসব কথা বলেন। অনুষ্ঠানটি আয়োজন করেছিল কিশোরগঞ্জ জেলা ছাত্র ফোরাম।
জিন্নাহর পারিবারিক ও রাজনৈতিক ইতিহাস তুলে ধরে ফজলুর রহমান বলেন, ‘মুহাম্মদ আলী জিন্নাহর বাড়ি ছিল গুজরাটে এবং গুজরাটের একটি মাছ বিক্রেতা পরিবারেই তাঁর জন্ম। তাঁর বাবা মাছ বিক্রি করতেন। সেখানে মাছ বিক্রেতাদের ‘পুঞ্জা’ বলা হতো এবং তাঁর প্রকৃত নাম ছিল জিন্নাহ পুঞ্জা। তিনি হিন্দু ছিলেন। তবে মাছ বিক্রি করার কারণে উচ্চবর্ণের হিন্দু সমাজ তাঁদের ঘৃণা করায় পরবর্তী সময়ে তাঁরা ইসলাম ধর্ম গ্রহণ করেন এবং নাম পরিবর্তন করে মোহাম্মদ আলী জিন্নাহ রাখেন।’
জিন্নাহর রাজনৈতিক জীবনের বিবর্তনের কথা উল্লেখ করে এই বিএনপি নেতা বলেন, জিন্নাহ প্রথমে কংগ্রেসের সঙ্গে যুক্ত থাকলেও ১৯১৩ সালে মুসলিম লীগে যোগ দেন। ১৯১৬ সালের লখনৌ চুক্তিতে কংগ্রেস ও মুসলিম লীগের সমঝোতায় তিনি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন। এরপর ১৯২৯ সালে তাঁর ঘোষিত ১৪ দফায় মুসলমানদের রাজনৈতিক প্রতিনিধিত্ব, পৃথক নির্বাচকমণ্ডলী ও প্রাদেশিক স্বায়ত্তশাসনসহ বিভিন্ন সাংবিধানিক দাবি তুলে ধরা হয়। ফজলুর রহমান বলেন, ‘১৪ দফা দিল, হিন্দু-মুসলমান দুই জাতি করল, জিন্নাহ একটা পাকিস্তান বানাইলো।’
পাকিস্তান সৃষ্টিতে বাঙালিদের ভূমিকার কথা স্মরণ করে তিনি বলেন, ‘পাকিস্তান আমরা সবাই মিলেই বানিয়েছিলাম, তা অস্বীকার করার সুযোগ নেই। কিন্তু রাষ্ট্র হিসেবে পাকিস্তান ভালো না হওয়ায় ১৯৫২ সালেই আমরা লড়াই শুরু করি।’ তিনি আরও বলেন, ১৯৫২ সালের ভাষা আন্দোলন, ১৯৫৪ সালের নির্বাচন, ১৯৫৮ সালে আইয়ুব খানের শাসন, এরপর ছয় দফা ও এগারো দফা এবং সবশেষে ১৯৭০ সালের নির্বাচনের মধ্য দিয়ে আমাদের স্বাধীনতার আন্দোলন এগিয়ে যায়। ১৯৭০ সালের নির্বাচনে শেখ মুজিবুর রহমান সারা পাকিস্তানে সংখ্যাগরিষ্ঠ ভোট পেলেও ইয়াহিয়া খান ক্ষমতা হস্তান্তর না করায় যুদ্ধ শুরু হয় এবং মুক্তিযুদ্ধের মাধ্যমে স্বাধীন বাংলাদেশের জন্ম হয়।
মুক্তিযুদ্ধে নিজের অংশগ্রহণের স্মৃতিচারণ করতে গিয়ে ২৩ বছর বয়সে যুদ্ধে যাওয়া ফজলুর রহমান আবেগাপ্লুত হয়ে পড়েন। তিনি বলেন, ‘আমি কেবল মুক্তিযুদ্ধ করিনি, আমি মুক্তিযুদ্ধ সংঘটিতও করেছি। যে রাতে বাংলাদেশের জাতীয় পতাকা তৈরি হয়েছিল, আমি সেখানে উপস্থিত ছিলাম এবং শিব নারায়ণ দাসের ঘনিষ্ঠ কর্মী ছিলাম।’ এ সময় তিনি একটি উক্তি উল্লেখ করে বলেন, ‘অস্ত্র যুদ্ধ করে না, যুদ্ধ করে অস্ত্রের পেছনের মানুষ এবং সেই মানুষের পেছনের আদর্শ।’
জাতীয় পতাকা ও ‘আমার সোনার বাংলা’ গান নির্বাচনের সময়কার স্মৃতি স্মরণ করে ফজলুর রহমান বলেন, মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে যেকোনো প্রশ্নের উত্থাপন অত্যন্ত বেদনাদায়ক। তিনি বলেন, ‘মুক্তিযুদ্ধই সত্য। যখন কেউ বলে মুক্তিযুদ্ধ হয়নি, তখন সেই কথা আমার বুকে আঘাত করে।’ তরুণদের উদ্দেশে তিনি আহ্বান জানান, ‘সত্যের পথে চলো, সত্য কথা বলো। অন্ধকার দূর করতে অন্তত একটা মোমবাতি হলেও হাতে নাও।’
অনুষ্ঠানে প্রধান আলোচক হিসেবে উপস্থিত ছিলেন জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলাম বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক ড. মোহাম্মদ মোশাররফ হোসেন। অনুষ্ঠানটি উদ্বোধন করেন কিশোরগঞ্জ জেলা পরিষদের প্রশাসক খালেদ সাইফুল্লাহ সোহেল খান।
বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতি বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক আলফারুন নাহার রুমার সভাপতিত্বে এবং রবীন্দ্র সৃজন কলা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রভাষক মো. নিজাম উদ্দিনের সঞ্চালনায় অনুষ্ঠানে বিশেষ অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন বিশ্ববিদ্যালয়ের ট্রেজারার অধ্যাপক ড. মোহাম্মদ ইমদাদুল হুদা, ভারপ্রাপ্ত রেজিস্ট্রার খন্দকার নাজমুল হাসান, সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী উম্মে কুলসুম বেগম, কিশোরগঞ্জ জেলা পাবলিক কলেজের প্রতিষ্ঠাতা ও অধ্যক্ষ রফিকুল ইসলাম, বিশ্ববিদ্যালয় শাখা ছাত্রদলের আহ্বায়ক হাবিবুর রহমান হাবিব এবং সদস্য সচিব মামুন সরকার প্রমুখ।