রাজস্ব আদায়ে ঘাটতি থাকায় বাজেট বাস্তবায়নে ঋণের ওপর সরকারের নির্ভরতা দিন দিন বাড়ছে। তবে দেশের ব্যাংকিং খাতের ওপর চাপ কমাতে এবং বেসরকারি খাতে ঋণপ্রবাহ স্বাভাবিক রাখতে এবার বিকল্প উৎস থেকে অর্থ সংগ্রহের উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে। এর অংশ হিসেবে চীন, জাপান, হংকং ও যুক্তরাষ্ট্রের পুঁজিবাজারে সার্বভৌম বন্ড ছাড়ার পরিকল্পনা করছে সরকার।

অর্থ মন্ত্রণালয় সূত্রে জানা গেছে, আগামী ডিসেম্বরের মধ্যে আন্তর্জাতিক বাজার থেকে ৫০ কোটি থেকে ১০০ কোটি ডলার সংগ্রহের লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে। এ লক্ষ্যে চীনের বাজারে চীনা মুদ্রা ইউয়ানে ‘পান্ডা বন্ড’ এবং জাপানের বাজারে জাপানি মুদ্রা ইয়েনে ‘সামুরাই বন্ড’ ছাড়ার প্রাথমিক সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। এছাড়া হংকংয়ের বাজারে ‘ডিমসাম বন্ড’ এবং যুক্তরাষ্ট্রের বাজারে ডলারভিত্তিক বন্ড ছাড়ার পরিকল্পনা রয়েছে। এই বন্ডগুলোর পরিমাণ ও শর্ত পরবর্তী সময়ে চূড়ান্ত করা হবে। এ বিষয়ে অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী সম্মতি দিয়েছেন এবং চূড়ান্ত অনুমোদনের জন্য প্রধানমন্ত্রীর কাছে প্রস্তাব পাঠিয়েছে অর্থ বিভাগ।

সার্বভৌম বন্ড ইস্যুর কৌশল ও সম্ভাব্যতা যাচাই করতে গত জুলাইয়ে প্রধানমন্ত্রীর বিনিয়োগ ও পুঁজিবাজারবিষয়ক বিশেষ সহকারী তানভীর গণিকে প্রধান করে একটি উচ্চ পর্যায়ের কমিটি গঠন করা হয়। এই কমিটিতে অর্থ বিভাগ, অর্থনৈতিক সম্পর্ক বিভাগ, বাংলাদেশ ব্যাংক এবং সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশনের প্রতিনিধিরা রয়েছেন। কমিটি ইতিমধ্যে তাদের পর্যালোচনা প্রতিবেদন অর্থ মন্ত্রণালয়ে জমা দিয়েছে। এছাড়া আন্তর্জাতিক বাজার থেকে অর্থ সংগ্রহের এই প্রক্রিয়ায় বৈশ্বিক আর্থিক প্রতিষ্ঠান জেপি মরগান ও এইচএসবিসির বিশেষজ্ঞদের পরামর্শ নেবে সরকার।

সার্বভৌম বন্ড ছাড়াও ব্যাংকিং ব্যবস্থার বাইরে অর্থায়নের অন্যান্য বিকল্প খুঁজছে সরকার। এর মধ্যে রয়েছে অবকাঠামো উন্নয়নে দীর্ঘমেয়াদি সুকুক বা ইসলামী বন্ড, বহুপক্ষীয় সংস্থার কাছ থেকে বাজেট সহায়তা, স্বল্পমেয়াদি সার্বভৌম সুকুক, অভ্যন্তরীণ ট্রেজারি বন্ডের বিপরীতে বন্ধকি ঋণ এবং সবুজ ও ও নীল বন্ডের মতো নতুন উদ্যোগ।

বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, সদ্য সমাপ্ত অর্থবছরে সরকারের মোট ঋণের পরিমাণ ছিল ১ লাখ ৯৫ হাজার কোটি টাকা। এর মধ্যে বিদেশি উৎস থেকে এসেছে ৫৮ হাজার কোটি টাকা এবং অভ্যন্তরীণ উৎস অর্থাৎ ব্যাংক ও সঞ্চয়পত্র থেকে নেওয়া হয়েছে ১ লাখ ৩৭ হাজার কোটি টাকা। অভ্যন্তরীণ উৎস থেকে ঋণ নেওয়ার লক্ষ্যমাত্রা ছিল ১ লাখ ২৫ হাজার কোটি টাকা, যা লক্ষ্যমাত্রার চেয়ে ১২ হাজার কোটি টাকা বেশি।

এদিকে অর্থনীতিবিদ ও নীতিনির্ধারকরা সতর্ক করে বলেছেন, বিকল্প পদ্ধতিগুলো শেষ পর্যন্ত ঋণই। তাই মূল রাজস্ব আহরণ বাড়ানোর লক্ষ্য থেকে সরকারের মনোযোগ সরানো ঠিক হবে না। বিশেষ করে আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের (আইএমএফ) ঋণ টেকসইতার মূল্যায়নে বাংলাদেশের অবস্থান এখন ‘নিম্ন ঝুঁকি’ থেকে ‘মধ্যম ঝুঁকি’তে উন্নীত হয়েছে। পাশাপাশি ২০২৪ সালে আন্তর্জাতিক ঋণমান নির্ধারণকারী সংস্থা মুডিস ও এসঅ্যান্ডপি বাংলাদেশের ঋণমান কমিয়েছে। ফলে আন্তর্জাতিক বাজার থেকে ঋণ নেওয়ার ক্ষেত্রে সরকারকে বাড়তি সতর্কতা অবলম্বন করতে হবে।