প্রকাশ: ২০ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ১২:০০ এএম (20 September 2026, 12:00 AM)

ক্ষমতার সাত মাস পার হতেই দেশের রাজনীতিতে নানামুখী ষড়যন্ত্র ও অস্থিতিশীলতার আভাস পাওয়া যাচ্ছে। একদিকে ক্ষমতাচ্যুত আওয়ামী লীগ সরকারের প্রধান শেখ হাসিনা আগামী ডিসেম্বরে দেশে ফেরার হুমকি দিচ্ছেন, অন্যদিকে বিরোধী দলগুলো একদফা আন্দোলনের হুঁশিয়ারি দিচ্ছে। কেবল এই দুই চ্যালেঞ্জই নয়, অবনতিশীল আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির পাশাপাশি পুলিশ, সিভিল প্রশাসন এবং অর্থনৈতিক খাতেও চক্রান্তের গুঞ্জন শোনা যাচ্ছে। রাজনৈতিক বিশ্লেষক ও বিভিন্ন দলের নেতারা মনে করছেন, এখনই সতর্ক না হলে পরিস্থিতি আরও জটিল রূপ নিতে পারে, যার সুযোগ নিতে পারে জুলাই গণ-আন্দোলনের মুখে পালিয়ে যাওয়া নিষিদ্ধ ঘোষিত আওয়ামী লীগ।

সম্প্রতি ঘটে যাওয়া কয়েকটি ঘটনা সরকারের বিরুদ্ধে চক্রান্তের বিষয়টিকে আরও স্পষ্ট করেছে। গত ১১ সেপ্টেম্বর রাজধানীর গুলশানে নিষিদ্ধ ঘোষিত আওয়ামী লীগ ও এর অঙ্গসংগঠনের নেতাকর্মীরা একটি ঝটিকা মিছিল বের করে। গোয়েন্দা তথ্যের ঘাটতি ও পুলিশের নিষ্ক্রিয়তার অভিযোগে পরবর্তীতে গুলশান মডেল থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মো. দাউদ হোসেন এবং গুলশান বিভাগের উপ-পুলিশ কমিশনার (ডিসি) এম তানভীর আহমেদকে প্রত্যাহার করা হয়। এর পরপরই ক্যান্টনমেন্ট থানার ওসি মো. রাকিবুল হাসানের একটি অডিও বার্তা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ে। সেখানে তাকে শেখ হাসিনার ডিসেম্বরে ফিরে আসার বিষয়ে বিতর্কিত মন্তব্য করতে এবং বর্তমান সরকার, প্রশাসন, সেনাবাহিনী ও পুলিশ বাহিনীর তীব্র সমালোচনা করতে শোনা যায়। এমনকি ওসি পদায়নে অর্থ লেনদেনের অভিযোগও তোলেন তিনি।

সহিংসতা ও নাশকতার মাত্রা আরও বৃদ্ধি পায় গত শুক্রবার ও শনিবার। শুক্রবার রাজধানীর তিনটি স্থানে বাসে আগুন দেওয়া হয় এবং রাতে ভারতের মাটিতে আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় কার্যনির্বাহী কমিটির সভা অনুষ্ঠিত হয়, যেখানে পলাতক সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ভার্চুয়ালি যুক্ত হয়ে বক্তব্য দেন। একই রাতে রাজধানীর ৭টি স্থানে ককটেল বিস্ফোরণের ঘটনা ঘটে। শনিবারও রাজধানীতে একাধিক বাসে অগ্নিসংযোগের খবর পাওয়া গেছে। এর পাশাপাশি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ভিউয়া তথ্য ও ভিন্ন দেশের ভিডিও ছড়িয়ে সরকারের বিরুদ্ধে বিভ্রান্তি সৃষ্টির চেষ্টা চালানো হচ্ছে বলে অভিযোগ উঠেছে।

এদিকে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী এবং তাদের নেতৃত্বাধীন ১১ দলীয় জোট দেশব্যাপী লংমার্চ কর্মসূচি পালন করছে। সম্প্রতি ঢাকা থেকে চট্টগ্রাম লংমার্চ শেষ করার পর শনিবার দলটির আমির ডা. শফিকুর রহমান হুঁশিয়ারি দিয়েছেন, তাদের দাবি মানা না হলে বর্তমান আট দফা আন্দোলন পরবর্তীতে সরকার পতনের ‘একদফা’ আন্দোলনে রূপ নিতে পারে। বিগত সরকারের রেখে যাওয়া অর্থনৈতিক ও প্রশাসনিক বিশৃঙ্খলা সামাল দেওয়ার মাঝেই বিরোধী দলের এই আন্দোলন ও চক্রান্তের যোগসূত্র থাকতে পারে বলে আশঙ্কা করছেন বিশ্লেষকরা।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক উপাচার্য ও ইমেরিটাস অধ্যাপক ড. আনোয়ারউল্লাহ্ চৌধুরী মনে করেন, পরাজিত শক্তি সবসময়ই দেশকে অস্থিতিশীল করতে মরিয়া থাকে। বিগত দেড় দশকে যারা রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলো ধ্বংস করেছে, তারাই এখন পুনরায় ফেরার চক্রান্ত করছে। সামনে স্থানীয় সরকার নির্বাচনকে কেন্দ্র করে এই গোষ্ঠী আরও বড় ধরনের ক্রাইসিস তৈরি করতে পারে। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে সরকারকে অত্যন্ত কঠোর অবস্থান নেওয়ার পাশাপাশি বিদেশি পরাশক্তিগুলোর সঙ্গে কূটনৈতিক সম্পর্ক জোরদার করার পরামর্শ দেন তিনি। সুজন সম্পাদক বদিউল আলম মজুমদার বলেন, সাড়ে ১৫ বছর ধরে সব প্রতিষ্ঠানে নিজেদের লোক বসিয়েছিল আওয়ামী লীগ, তাই চক্রান্ত হওয়াটা স্বাভাবিক। তবে রাজনীতিতে বর্তমানে নৈতিক শক্তির চরম ঘাটতি দেখা যাচ্ছে। আওয়ামী লীগ অস্থিরতা তৈরি করতে পারলেও তাদের ফিরে আসার মতো নৈতিক শক্তি নেই বলে তিনি মন্তব্য করেন।

সরকারের ভেতরেই ষড়যন্ত্রকারীরা লুকিয়ে আছে বলে দাবি করেছেন বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর সেক্রেটারি জেনারেল মিয়া গোলাম পরওয়ার। তিনি বলেন, ভেতরের লোকদের যোগসাজশ ছাড়া গুলশানের মতো জায়গায় আওয়ামী লীগ মিছিল করার দুঃসাহস পেত না। তিনি সরকারকে বিভেদ না বাড়িয়ে জুলাইয়ের ঐক্য ধরে রাখার আহ্বান জানান। অন্যদিকে বিএনপি চেয়ারপারসনের উপদেষ্টা সৈয়দ মোয়াযযেম হোসেন আলাল বলেন, এসব ঘটনা কোনো বিচ্ছিন্ন বিষয় নয়, বরং একটি বড় সংকেত। অতীতে বিএনপির শাসনামলে দেশজুড়ে একযোগে ৬৩ জেলায় বোমা হামলা এবং বাংলা ভাই ও শায়খ আব্দুর রহমানের মতো উগ্রবাদীদের উত্থান যেভাবে বিপর্যয় ডেকে এনেছিল, বর্তমান পরিস্থিতিও তেমন কোনো বড় সংকটের ইঙ্গিত দিচ্ছে কিনা তা ভাববার সময় এসেছে। বিপ্লবী ওয়ার্কার্স পার্টির সাধারণ সম্পাদক সাইফুল হক বলেন, আওয়ামী লীগ ককটেল বিস্ফোরণ ও নাশকতার মাধ্যমে কেবল ভীতি ছড়াচ্ছে, মূলধারার রাজনীতিতে তাদের ফেরা সম্ভব নয়। তবে administrations-এর ভেতরে থাকা ফ্যাসিবাদের দোসরদের ওপর গভীর নজরদারি প্রয়োজন। জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) যুগ্ম-আহ্বায়ক মনিরা শারমিন ও মো. গোলাম সারোয়ার তুষারও সরকারের কঠোর সমালোচনা করে বলেন, সরকার মানুষের নিরাপত্তা দিতে ও নাশকতাকারীদের চিহ্নিত করতে ব্যর্থ হচ্ছে, তবে ছাত্র-জনতা কোনোভাবেই ফ্যাসিবাদের পুনর্বাসন হতে দেবে না।