ভেনিস চলচ্চিত্র উৎসবে পুরস্কার গ্রহণের মঞ্চে দাঁড়িয়ে ইরানের নারীদের স্বাধীনতা নিয়ে কথা বলে নিজ দেশে ব্যাপক তোপের মুখে পড়েছেন ইরানি অভিনেত্রী লালেহ মারজবান। দেশটির সরকারি প্রশাসন ও রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যম তার এই বক্তব্যের তীব্র সমালোচনা করেছে। এমনকি তার বিরুদ্ধে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেওয়ার দাবিও উঠেছে।

এবারের ভেনিস চলচ্চিত্র উৎসবের ওরিজোন্তি বিভাগে ‘ফলিং হাউজ’ চলচ্চিত্রে দুর্দান্ত অভিনয়ের জন্য শ্রেষ্ঠ অভিনেত্রীর পুরস্কার লাভ করেন লালেহ মারজবান। মোহসেন ঘারায়ি পরিচালিত এই সিনেমাটিতে ইরানের একটি পরিবারের তিন প্রজন্মের নারীদের জীবন সংগ্রাম ফুটিয়ে তোলা হয়েছে, যেখানে পরিবারের কর্তা বা বাবা নারীদের নিজেদের ঘরের ভেতর বন্দি করে রাখেন। এই ছবিতে মারজবান 'এনসি' চরিত্রে অভিনয় করেছেন, যে কি না ইরান ছেড়ে তুরস্কে গিয়ে মডেলিং করার স্বপ্ন দেখে। কিন্তু তার এই ইচ্ছায় ক্ষুব্ধ হয়ে বাবা 'রশিদ' তাকে ও পরিবারের অন্য নারীদের ঘরে আটকে রাখেন।

ভেনিসের মঞ্চে ট্রফি হাতে নিয়ে লালেহ মারজবান তার এই অর্জন উৎসর্গ করেন ইরানের সাধারণ নারীদের প্রতি। ফারসি ভাষায় দেওয়া এক আবেগঘন বক্তব্যে তিনি বলেন, তার দেশের নারীরা সামান্যতম স্বাধীনতার জন্যও অনেক বড় মূল্য চুকিয়েছেন। একই সঙ্গে প্রতিকূল ও কঠিন সময়ের মধ্যেও ইরানের মানুষকে আশা না হারানোর আহ্বান জানান তিনি。

তার এই বক্তব্যের পরেই ইরানে তীব্র প্রতিক্রিয়া শুরু হয়। দেশটির নীতি নির্ধারণী সংস্থা 'সুপ্রিম কাউন্সিল অব দ্য কালচারাল রেভল্যুশন' এক বিবৃতিতে মারজবানের বক্তব্যের কড়া সমালোচনা করে। তাদের দাবি, ভেনিসের মঞ্চে দেওয়া বক্তব্য ও আচরণের মধ্য দিয়ে ইরানি নারীদের একটি একপেশে এবং পশ্চিমা দৃষ্টিভঙ্গির সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নেতিবাচক চিত্র তুলে ধরা হয়েছে।

রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যমগুলোতেও এই অভিনেত্রীকে নিয়ে সমালোচনার ঝড় বইছে। ইসলামিক রিপাবলিক অব ইরান ব্রডকাস্টিংয়ের (আইআরআইবি) সঙ্গে যুক্ত সাংবাদিক ও উপস্থাপক জাহরা চেখমাগি তাকে ব্যক্তিস্বার্থপর ও ভণ্ড বলে আক্রমণ করেছেন। অন্যদিকে, আইআরআইবি-ঘনিষ্ঠ আরেক actress জিল্লা সাদেগি প্রশ্ন তুলেছেন, মারজবান কেন তার এই পুরস্কারটি যুক্তরাষ্ট্রের ক্ষেপণাস্ত্র হামলায় নিহত ইরানি শিশুদের উদ্দেশে উৎসর্গ করলেন না।

এছাড়া, রাষ্ট্রীয় টেলিভিশনের একটি অনুষ্ঠানে অংশ নিয়ে একজন কোরআন বিশেষজ্ঞ দাবি করেন, মারজবান মূলত ‘শত্রুর দ্বারা প্রতারিত’ হয়েছেন। তিনি এই অভিনেত্রীকে ইরানে কাজ করতে না দেওয়ার জোর দাবি জানান। একই সুরে দেশটির স্টুডেন্ট নিউজ নেটওয়ার্কও সংস্কৃতি মন্ত্রণালয়ের প্রতি লালেহ মারজবানের ওপর নিষেধাজ্ঞা আরোপের আহ্বান জানিয়েছে।

এর আগে ভেনিসে ছবিটির প্রদর্শনীর পর ইরানে সম্ভাব্য প্রতিক্রিয়া কেমন হতে পারে—এমন এক প্রশ্নের জবাবে মারজবান বলেছিলেন, ইরানের নারীদের নিজেদের লক্ষ্যে পৌঁছাতে হলে একবারে একটি করে ছোট পদক্ষেপ নিতে হয়। তিনি আরও বলেন, ‘আমি আমার ছোট্ট অংশটুকু করেছি। আমি আমার অবদান রেখেছি। আশা করি, আরও অনেকে আমাদের অভিন্ন লক্ষ্যের দিকে এমন ছোট ছোট পদক্ষেপ নেবেন।’ মারজবানের এই বক্তব্য ও পরবর্তী প্রতিক্রিয়া ইরানের চলচ্চিত্র অঙ্গন এবং নারীদের স্বাধীনতা নিয়ে চলমান বিতর্ককে নতুন করে উসকে দিয়েছে।