কুমিল্লার ১৩ বছর বয়সী স্কুলছাত্র ইশায়াত শাহরিয়ার অপ্রতিম হত্যাকাণ্ডের তদন্তে একের পর এক চাঞ্চল্যকর তথ্য বেরিয়ে আসছে। পুলিশ ও তদন্তসংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের মতে, কেবল একটি দামি আইফোন ছিনিয়ে নেওয়ার লোভই নয়, এর পেছনে কাজ করেছে পাঁচ হাজার টাকা পাওনা নিয়ে ক্ষোভ, টিকটক ভিডিও তৈরির প্রলোভন এবং বয়সে বড়দের সঙ্গে অপ্রতিমের ‘অসম বন্ধুত্ব’। অপ্রতিম হত্যা মামলায় এ পর্যন্ত মূল অভিযুক্ত সাইফুল ইসলাম ওরফে তুহিনসহ তিনজনকে গ্রেপ্তার করেছে পুলিশ, যার মধ্যে দুজনই কিশোর। এদের বাইরে সিয়াম নামের আরেক তরুণের সম্পৃক্ততা যাচাই করা হচ্ছে।
অপ্রতিমের বাবা কে এম ফিরোজ শাহরিয়ারের মুঠোফোনের যন্ত্রাংশ বিক্রির প্রতিষ্ঠান ‘ইয়েসটেক’-এ কাজ করত গ্রেপ্তার হওয়া এক কিশোর। তদন্তে জানা গেছে, ওই কিশোরকে পাঁচ হাজার টাকা ধার দিয়েছিল বর্ডার গার্ড পাবলিক স্কুলের সপ্তম শ্রেণির ছাত্র অপ্রতিম। সম্প্রতি সে টাকা ফেরত চাইলে ওই কিশোর ক্ষুব্ধ হয়। পুলিশকে সে জানিয়েছে, অপ্রতিম বেঁচে না থাকলে টাকা আর ফেরত দিতে হবে না—এমন চিন্তা থেকেই সে হত্যাকাণ্ডে জড়ায়। প্রযুক্তিতে দক্ষ ১৫ বছর বয়সী এই কিশোর ঘটনার দিন নিজের ফোন বাড়িতে রেখে পরিবারের অন্য একজনের ফোন নিয়ে বের হয়েছিল, যাতে তথ্যপ্রযুক্তির মাধ্যমে ঘটনাস্থলে তার উপস্থিতি শনাক্ত করা না যায়। গ্রেপ্তারের সময়ও তার গায়ে অপ্রতিমের বাবার প্রতিষ্ঠানের নাম লেখা টি-শার্ট ছিল। এই কিশোরের বাবা ঘটনার পর থেকেই নিখোঁজ রয়েছেন এবং তাঁর অনুপস্থিতির সঙ্গে হত্যাকাণ্ডের কোনো যোগসূত্র আছে কি না, তা খতিয়ে দেখছে পুলিশ।
তদন্তসংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো বলছে, ঘটনার দিন গত শুক্রবার অপ্রতিমকে বাসা থেকে বের করতে টিকটক ভিডিও ও ছবি তোলার প্রলোভন দেওয়া হয়। মূল অভিযুক্ত তুহিন অপ্রতিমের ফোনে বারবার খুদে বার্তা পাঠিয়ে তাকে মায়ের আইফোন ১৭ প্রো ম্যাক্সটি নিয়ে বের হতে বলেন। শেষ পর্যন্ত রাজি হয়ে বেলা আড়াইটার দিকে অপ্রতিম বাসা থেকে বের হয়। বেলা ৩টা থেকে ৩টা ১০ মিনিটের দিকে তুহিনের সঙ্গে তার দেখা হয়। এরপর বিশ্ববিদ্যালয়সংলগ্ন এলাকাসহ অন্তত চারটি সিসিটিভি ক্যামেরার ফুটেজে তাদের স্বাভাবিকভাবে হেঁটে যেতে দেখা যায়। একটি ফুটেজে তাদের পেছনে আরও দুজনকে এবং অন্য একটি ফুটেজে চারজনকেই একসঙ্গে দেখা গেছে।
অপ্রতিমকে নিয়ে যাওয়া হয় লালমাই পাহাড়ের সানন্দা এলাকার একটি নির্জন জঙ্গলে, যা মূল সড়ক থেকে প্রায় দেড় কিলোমিটার ভেতরে অবস্থিত। পুলিশ জানায়, শুক্রবার বিকেল ৫টা থেকে ৬টার মধ্যে অপ্রতিমের কাছ থেকে ফোনটি কেড়ে নেওয়ার চেষ্টা করা হলে সে বাধা দেয়। এ সময় ধস্তাধস্তির একপর্যায়ে তুহিন প্রথমে বাঁশের লাঠি দিয়ে অপ্রতিমের মাথায় আঘাত করেন এবং পরে অন্যরাও তাকে আঘাত করে। অপ্রতিমের মৃত্যু নিশ্চিত হলে তারা ফোনটি নিয়ে পালিয়ে যায়। নির্জন এলাকা হওয়ায় বাইরে থেকে কেউ বিষয়টি টের পায়নি। রাতে শিয়াল অপ্রতিমের মরদেহ টানাটানি করায় শরীরে কিছু অতিরিক্ত ক্ষত তৈরি হয় বলে ধারণা করছেন তদন্তকারীরা, যা ময়নাতদন্ত ও ফরেনসিক রিপোর্টের মাধ্যমে যাচাই করা হচ্ছে। সিয়াম নামের আরেক তরুণ ঘটনাস্থলে না থাকলেও পাহারা দেওয়ার মতো কোনো ভূমিকা পালন করেছিলেন কি না, সেটিও খতিয়ে দেখছে পুলিশ।
তদন্তের একটি গুরুত্বপূর্ণ মোড় আসে শনিবার সকালে। সকাল ৯টার দিকে তুহিনকে হেফাজতে নেয় পুলিশ। প্রথমে অস্বীকার করলেও দীর্ঘ জিজ্ঞাসাবাদের পর রাত ৮টার দিকে তিনি অপরাধ স্বীকার করেন। অন্যদের নাম না বলার জন্য ‘ওয়াদাবদ্ধ’ থাকায় তিনি চুপ ছিলেন, কিন্তু ওই সময় তাঁর ফোনে বারবার কল আসছিল ইয়েসটেকে কাজ করা সেই কিশোরের। বিষয়টি নজরে আসায় পুলিশ তাকেও আটক করে এবং পরে আরেক কিশোরের নাম জানতে পারে। এদিকে হত্যার পর অপ্রতিমের মায়ের আইফোনটি তুহিন তাঁর বাড়িতে লুকিয়ে রেখেছিলেন। তিনি তাঁর ছোট ভাই তুষারকে ফোনটি সাবধানে লুকিয়ে রাখতে বলেছিলেন। শনিবার রাতে পুলিশ তুহিনের সানন্দার বাড়িতে গেলে তাঁর মা শিরিনা আক্তার বিছানার তোশকের নিচ থেকে ফোনটি বের করে দেন।
অপ্রতিম ছিল শান্ত ও পড়াশোনায় ভালো ছাত্র বলে জানিয়েছেন তার স্কুলের ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষক ফেরদৌসী জাহান। অন্যদিকে স্থানীয়রা জানান, তুহিন বিশ্ববিদ্যালয় এলাকায় অল্প বয়সীদের নিয়ে একটি দল বা গ্যাং তৈরি করেছিলেন। এ বিষয়ে পুলিশ সুপার মো. আনিসুজ্জামান জানান, কিশোর গ্যাংয়ের সম্পৃক্ততা খতিয়ে দেখা হচ্ছে। তবে গ্রেপ্তার ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে আগে কোনো পুলিশ রেকর্ড নেই। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদও সচিবালয়ে এক সংবাদ সম্মেলনে জানান, জড়িতরা কিশোর অপরাধ চক্রের মতো এবং নিহত অপ্রতিমের চেয়ে তারা ৫ থেকে ১০ বছরের বড় ছিল। অপ্রতিমের মা নাহিদা বেগম (কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক) ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, 'তোরা আইফোন নিয়ে যেতি, কিন্তু আমার ছেলেকে খুন করলি কেন?' গতকাল কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়ের কেন্দ্রীয় মাঠে প্রথম এবং গন্ধমতী ঈদগাহ মাঠে দ্বিতীয় জানাজা শেষে অপ্রতিমকে দাফন করা হয়। শেষবিদায় দিতে গিয়ে অপ্রতিমের বাবা কে এম ফিরোজ শাহরিয়ার বলেন, ‘আর কাউকে যেন আমার মতো সন্তান হারাতে না হয়।’