দেশের বিভিন্ন মহাসড়কের পাশে দীর্ঘদিন ধরে অলস পড়ে থাকা ২৪টি ট্রমা সেন্টারকে দ্রুত সচল করার উদ্যোগ নিয়েছে সরকার। এগুলোকে আধুনিকায়ন করে ‘অ্যাকসিডেন্ট অ্যান্ড ইমার্জেন্সি ট্রিটমেন্ট সেন্টার’ বা দুর্ঘটনা ও জরুরি চিকিৎসা কেন্দ্র হিসেবে নতুনভাবে চালু করা হবে। একই সাথে দেশজুড়ে ২৪ ঘণ্টার একটি সার্বক্ষণিক অ্যাম্বুলেন্স নেটওয়ার্ক গড়ে তোলার পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে। প্রয়োজনীয় চিকিৎসক, নার্স, চিকিৎসা সরঞ্জাম ও অন্যান্য লজিস্টিকস নিশ্চিত করে পর্যায়ক্রমে এই ২৪টি কেন্দ্রেই চিকিৎসাসেবা চালু করা হবে।

গত ১২ আগস্ট স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তাদের সঙ্গে এক বৈঠকে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান এই ট্রমা সেন্টারগুলো চালুর বিষয়ে প্রয়োজনীয় নির্দেশনা দেন। বৈঠকে সিদ্ধান্ত হয়, বিদ্যমান ২৪টি ট্রমা সেন্টারের নাম পরিবর্তন করে ‘অ্যাকসিডেন্ট অ্যান্ড ইমার্জেন্সি ট্রিটমেন্ট সেন্টার’ করা হবে। এছাড়া সড়ক ও মহাসড়ক বিভাগের সাথে আলোচনা করে মহাসড়কের পাশের খালি জায়গায় প্রকল্পের মাধ্যমে আরও নতুন জরুরি চিকিৎসা কেন্দ্র স্থাপন করা হবে। এসব কেন্দ্রের জন্য প্রয়োজনীয় এক্স-রে মেশিন, অ্যাম্বুলেন্স ও অন্যান্য চিকিৎসা সরঞ্জাম ক্রয়ের ব্যয় স্বাস্থ্য সেবা বিভাগের অনুমোদিত বাজেট থেকে মেটানোর নির্দেশনা দিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী।

সড়ক দুর্ঘটনায় আহতদের দ্রুততম সময়ে চিকিৎসাসেবা দিয়ে প্রাণহানি কমিয়ে আনার লক্ষ্য নিয়ে মহাসড়কগুলোর পাশে বিভিন্ন সময়ে এই ট্রমা সেন্টারগুলো নির্মাণ করা হয়েছিল। তবে প্রয়োজনীয় জনবল, চিকিৎসা সরঞ্জাম ও প্রশাসনিক অনুমোদনের অভাবে বছরের পর বছর ধরে এগুলো অব্যবহৃত অবস্থায় পড়ে রয়েছে। স্বাস্থ্য বিভাগ সূত্রে জানা গেছে, দেশের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ মহাসড়কের পাশে ২০০৪-০৫ অর্থবছরে ১০টি এবং ২০১০ সালে আরও ২৪টি ট্রমা সেন্টার নির্মাণের উদ্যোগ নেওয়া হয়। বর্তমানে এগুলোর মধ্যে মাত্র দুটিতে সীমিত পরিসরে বহির্বিভাগ চালু আছে এবং একটি কেন্দ্র সংশ্লিষ্ট জেলা হাসপাতালের অর্থোপেডিকস বিভাগের অংশ হিসেবে ব্যবহৃত হচ্ছে। মূলত মাথা, বুক, মেরুদণ্ড ও হাড়ে গুরুতর আঘাতপ্রাপ্ত রোগীদের দ্রুত চিকিৎসা দিতে তিন তলা বিশিষ্ট এসব ভবনে ২০ শয্যার আইসিইউ এবং ৪০ শয্যার আইসোলেশন সেন্টার স্থাপনের পরিকল্পনা ছিল।

এই ২৪টি কেন্দ্রের তালিকায় রয়েছে পাবনার আটঘরিয়া, বগুড়ার শেরপুর, সিরাজগঞ্জ সদর ও উল্লাপাড়া, কিশোরগঞ্জের ভৈরব, গোপালগঞ্জ সদর, মাদারীপুরের শিবচর, মানিকগঞ্জের শিবালয়, শরীয়তপুরের জাজিরা, ফরিদপুরের ভাঙ্গা (মধুখালী), মুন্সিগঞ্জের শ্রীনগর, ঢাকার ধামরাই, টাঙ্গাইলের এলেঙ্গা, চট্টগ্রামের লোহাগাড়া, হাটহাজারী ও রাউজান, কুমিল্লার দাউদকান্দি, ময়মনসিংহের ভালুকা, সুনামগঞ্জের ছাতক এবং হবিগঞ্জের বাহুবল। এর মধ্যে একটি হলো সিরাজগঞ্জ সদরের মুলিবাড়ি ট্রমা সেন্টার, যা ঢাকা-রাজশাহী-রংপুর মহাসড়কের পাশে ২০২০ সালে প্রায় ১১ কোটি টাকা ব্যয়ে নির্মিত হয়। দীর্ঘ ছয় বছর অব্যবহৃত থাকার পর গত কোরবানির ঈদে ২১ মে থেকে মাত্র ১৪ দিনের জন্য অস্থায়ীভাবে এটি চালু করা হলেও পরে আবার বন্ধ হয়ে যায়।

মূল পরিকল্পনা অনুযায়ী, প্রতিটি ট্রমা সেন্টারে ৩ জন অর্থোপেডিক সার্জন, ২ জন অ্যানেসথেটিস্ট, ২ জন আবাসিক চিকিৎসা কর্মকর্তা ও ৭ জন কনসালট্যান্টসহ মোট ১৪ জন চিকিৎসক থাকার কথা ছিল। এছাড়া ১০ জন নার্স, ফার্মাসিস্ট, রেডিওগ্রাফার ও টেকনিশিয়ান নিয়োগের কথা থাকলেও কোনো কেন্দ্রেই এই প্রস্তাবিত জনবল কাঠামো অনুযায়ী নিয়োগ দেওয়া হয়নি। এ বিষয়ে স্বাস্থ্য প্রতিমন্ত্রী ড. এম এ মুহিত জানান, মহাসড়কের এই ২৪টি ট্রমা সেন্টারকে দ্রুত ‘অ্যাকসিডেন্ট অ্যান্ড ইমার্জেন্সি সেন্টার’-এ রূপান্তর করা হচ্ছে। সড়ক দুর্ঘটনায় দ্রুত জরুরি সেবা নিশ্চিত করতে অ্যাম্বুলেন্স ও মোটরসাইকেলের মাধ্যমে প্রশিক্ষিত স্বেচ্ছাসেবকদের নিয়ে একটি সমন্বিত নেটওয়ার্ক গড়ে তোলা হচ্ছে। এটিকে দেশের নিয়মিত স্বাস্থ্য ব্যবস্থার একটি টেকসই অংশ হিসেবে গড়ে তোলার লক্ষ্যে সরকার কাজ করছে বলে তিনি উল্লেখ করেন।