সাতক্ষীরা-৪ আসনের তিনবারের সংসদ সদস্য গাজী নজরুল ইসলামের রাজনৈতিক ও ব্যক্তিগত জীবনে মাত্র দুই মাসের ব্যবধানে এক নাটকীয় পতন ঘটেছে। ১৯৯১ ও ১৯৯৬ সালের মতো প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ নির্বাচনে জামায়াতে ইসলামীর প্রার্থী হিসেবে জয়ী হওয়া এই প্রবীণ রাজনীতিক সর্বশেষ ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনেও জয়লাভ করেন। তবে সম্প্রতি ব্যক্তিগত মুহূর্তের ভিডিও ছড়িয়ে পড়া, नैतिक স্খলনের দায়ে দল থেকে বহিষ্কার এবং সবশেষে দ্বিতীয় স্ত্রীর রহস্যজনক মৃত্যুর ঘটনায় তিনি এখন পুলিশের চার দিনের রিমান্ডে রয়েছেন।

घटनाর সূত্রপাত গত ১৭ জুন, যখন ঢাকার বাসিন্দা মো. মাসুম বিল্লাহর মেয়ে ১৯ বছর বয়সী মরিয়ম খাতুনের সঙ্গে গাজী নজরুলের বিয়ে হয়। পারিবারিকভাবে এবং প্রথম স্ত্রী মাকছুদা বেগমের সম্মতিতে এই বিয়ে সম্পন্ন হলেও এতে মরিয়মের মামা ওবায়দুর রহমানের গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা ছিল। কিন্তু বিয়ের দেড় মাসের মাথায়, জুলাইয়ের শেষ দিকে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে এক তরুণীর সঙ্গে গাজী নজরুলের একটি ঘনিষ্ঠ ভিডিও ছড়িয়ে পড়ে। শুরুতে জামায়াতের নেতা-কর্মীরা একে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআই-এর কারসাজি বলে দাবি করলেও পরে গাজী নজরুল নিজেই স্বীকার করেন যে ভিডিওর তরুণী তাঁর দ্বিতীয় স্ত্রী মরিয়ম।

এই ভিডিও ফাঁসের জেরে জামায়াতে ইসলামী সাংগঠনিক তদন্ত শুরু করে। তদন্তে নৈতিক স্খলন প্রমাণিত হওয়ায় গত ২২ জুলাই দলের কেন্দ্রীয় কার্যনির্বাহী পরিষদের জরুরি বৈঠকে গঠনতন্ত্রের ৬২ নম্বর ধারা অনুযায়ী গাজী নজরুলকে দল থেকে বহিষ্কার করা হয়। জামায়াতের পক্ষ থেকে বিষয়টি সংসদ সচিবালয় ও নির্বাচন কমিশনকে চিঠি দিয়ে জানানো হলেও সংবিধানে সরাসরি কোনো রাজনৈতিক দল থেকে বহিষ্কার হলেই সংসদ সদস্য পদ বাতিলের বিধান না থাকায় তাঁর পদটি টিকে থাকে। এ বিষয়ে স্পিকার হাফিজ উদ্দিন আহম্মেদ এখনো কোনো চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত দেননি। তবে সংসদীয় কার্যক্রমে তাঁর অবস্থান সংকুচিত হয়ে পড়ে; মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক মন্ত্রণালয়-সম্পর্কিত সংসদীয় স্থায়ী কমিটি এবং সরকারি প্রতিশ্রুতি-সম্পর্কিত কমিটি থেকে তাঁর নাম বাদ দেওয়া হয়। জামায়াত নেতারা তাঁকে পদত্যাগের পরামর্শ দিলেও তিনি দলে ফেরার চেষ্টা করছিলেন এবং রাষ্ট্রপতি নির্বাচনের দিন বিরোধী দলের এমপিদের সঙ্গেও যোগাযোগের চেষ্টা চালান।

এই রাজনৈতিক টানাপোড়েনের মধ্যেই গত ২০ সেপ্টেম্বর রাজধানীর শেরেবাংলা নগরের ন্যাম ভবনের একটি ফ্ল্যাট থেকে মরিয়ম খাতুনের ঝুলন্ত মরদেহ উদ্ধার করে পুলিশ। এজাহারের তথ্য অনুযায়ী, ২০ সেপ্টেম্বর বেলা আনুমানিক ৩টা থেকে বিকেল সাড়ে ৫টার মধ্যে কোনো একসময় এই মৃত্যুর ঘটনা ঘটে। বিকেল সাড়ে ৫টার দিকে গাজী নজরুল মরিয়মের বাবা মাসুম বিল্লাহকে ফোন করে দ্রুত বাসায় আসতে বলেন। মাসুম বিল্লাহ সেখানে গিয়ে মেয়েকে ঝুলন্ত অবস্থায় দেখতে পান এবং পরে পুলিশের উপস্থিতিতে দরজা ভেঙে ভেতরে প্রবেশ করা হয়। ঘর থেকে একটি কথিত সুইসাইড নোট উদ্ধার করা হয়, যাতে বিশ্বাসভঙ্গ ও প্রতারণার কারণে মানসিকভাবে বিপর্যস্ত হওয়ার ইঙ্গিত রয়েছে। তবে নোটটি মরিয়মের নিজের লেখা কি না, তা নিশ্চিত করতে ফরেনসিক পরীক্ষা করা হবে।

মরিয়মের মৃত্যুর পর তাঁর বাবা মাসুম বিল্লাহ বাদী হয়ে আত্মহত্যায় প্ররোচনার অভিযোগে মামলা দায়ের করেন। মামলায় গাজী নজরুল ইসলাম, তাঁর প্রথম স্ত্রী মাকছুদা বেগম এবং মরিয়মের মামা ওবায়দুর রহমানকে আসামি করা হয়েছে। এজাহারে অভিযোগ করা হয়, বিয়ের পর থেকেই মরিয়মকে শারীরিক ও মানসিক নির্যাতন করা হতো, যা তিনি মুঠোফোনে পরিবারকে জানিয়েছিলেন। মামলার পর পুলিশ গাজী নজরুল ও তাঁর প্রথম স্ত্রীকে গ্রেপ্তার করে এবং আদালত গাজী নজরুলকে জিজ্ঞাসাবাদের জন্য চার দিনের রিমান্ড মঞ্জুর করেন। তিনবারের একজন সংসদ সদস্যের এমন ব্যক্তিগত ও রাজনৈতিক বিপর্যয় এখন দেশজুড়ে ব্যাপক আলোচনার জন্ম দিয়েছে।