গত বছরের তুলনায় প্রায় আড়াই লাখ টন বেশি সার আমদানি করা সত্ত্বেও দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে সার সংকট কাটছে না। দেশীয় উৎপাদন প্রায় স্বাভাবিক থাকলেও বিপণন ব্যবস্থার বিশৃঙ্খলা ও ডিলার নিয়োগের নতুন প্রক্রিয়াকে কেন্দ্র করে মাঠ পর্যায়ে এক ধরনের অস্থিরতা তৈরি হয়েছে। এতে চরম অনিশ্চয়তায় পড়েছেন কৃষকেরা, যা দেশের সামগ্রিক কৃষি ও খাদ্য উৎপাদনে বড় ধরনের বিপর্যয়ের শঙ্কা তৈরি করছে। বিভিন্ন স্থানে সারের দাবিতে বিক্ষোভ, দোকানে হামলা ও গুদাম লুটের মতো অনভিপ্রেত ঘটনাও ঘটছে।
বাংলাদেশ কেমিক্যাল উচ্চারণ ও শিল্প কর্পোরেশন (বিসিআইসি) সূত্রে জানা গেছে, দেশে বছরে বিভিন্ন ধরনের সারের মোট চাহিদা ৬৫ থেকে ৬৮ লাখ টন। চলতি অর্থবছরে এই চাহিদা নির্ধারণ করা হয়েছে ৬৮ থেকে ওনসত্তর লাখ টন। এর মধ্যে সবচেয়ে বেশি ব্যবহৃত ইউরিয়া সারের বার্ষিক চাহিদা ২৬ থেকে ২৭ লাখ টন। এছাড়া ডিএপি সারের চাহিদা ১৫ থেকে ১৬ লাখ টন, টিএসপি সাত থেকে আট লাখ টন এবং এমওপি সারের চাহিদা ৯ থেকে ১০ লাখ টন। দেশে বার্ষিক চাহিদার মধ্যে ১১ থেকে ১২ লাখ টন ইউরিয়া এবং এক লাখ টন ডিএপি উৎপাদিত হয়। বাকি সিংহভাগ সারই বিদেশ থেকে আমদানি করে মেটানো হয়।
আমদানি তথ্যে দেখা যায়, ২০২৫ সালের ১ জানুয়ারি থেকে ১৯ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত কাস্টমস দিয়ে মোট ২৪ লাখ ৮৬ হাজার টন সার খালাস হয়েছিল। চলতি ২০২৬ সালের একই সময়ে তা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ২৭ লাখ ২৪ হাজার টনে, যা গত বছরের চেয়ে প্রায় আড়াই লাখ টন বেশি। অন্যদিকে, দেশীয় উৎপাদনও বড় কোনো ঘাটতিতে পড়েনি। ২০২৫-২৬ অর্থবছরে বিসিআইসির সাতটি কারখানায় মোট ১২ লাখ ২৯ হাজার টন সার উৎপাদন হয়, যার মধ্যে ৬৮ হাজার টন ডিএপি ও বাকিটা ইউরিয়া। আর চলতি ২০২৬-২৭ অর্থবছরের প্রথম দুই মাসে উৎপাদিত হয়েছে দুই লাখ ৯ হাজার টন ইউরিয়া।
কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের চট্টগ্রাম অঞ্চলের অতিরিক্ত পরিচালক মোহাম্মদ আলী জিন্নাহ জানান, বর্তমানে খরিপ-২ মৌসুম চলছে এবং আগামী ১৬ অক্টোবর থেকে রবি মৌসুম শুরু হবে। রবি মৌসুমে সারের চাহিদা আরও বাড়বে। তিনি সতর্ক করে বলেন, সারের সঠিক ব্যবস্থাপনা অত্যন্ত জরুরি। ধানের চারা রোপণের দুই সপ্তাহ পর যে সার প্রয়োজন, তা ২০ দিন পর দিলে কাজ হবে না, আবার ১০ দিন বয়সে দিলেও চলবে না। কম বা বেশি—উভয় ধরনের সার প্রয়োগই ফসলের ক্ষতি করতে পারে। তাই প্রয়োজনে প্রশাসনিক ক্ষমতা ব্যবহার করে দ্রুত এ খাতে শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনা উচিত।
বিসিআইসির পরিচালক (বাণিজ্য) মোহাম্মদ মনিরুজ্জামান দাবি করেন, সার আমদানি ও উৎপাদনে কোনো ঘাটতি নেই। বিএডিসি বা ডিলারদের গুদামে পর্যাপ্ত সার মজুত রয়েছে এবং কৃষি বিভাগের সমন্বয়ে তা বিতরণ করা হচ্ছে। যে সব এলাকায় বিশৃঙ্খলার খবর আসছে, সেখানে প্রতিনিধি পাঠিয়েও কোনো ঘাটতি পাওয়া যায়নি। তবে বাজার মনিটরিংয়ের কাজ বিসিআইসির নয় বলে জানান তিনি। এদিকে চট্টগ্রাম কাস্টম হাউসের মুখপাত্র ও সহকারী কমিশনার শরীফ মোহাম্মদ আল আমিন জানান, সম্প্রতি চট্টগ্রামে সার আমদানি কিছুটা কমলেও মোংলাসহ অন্যান্য বন্দরে বেড়েছে। কাস্টমস কর্তৃপক্ষ সবসময় সারবাহী জাহাজকে অগ্রাধিকার দিয়ে দ্রুত খালাসের ব্যবস্থা করে থাকে।
মাঠ পর্যায়ের এই অস্থিরতার পেছনে সরকারের নতুন নীতিমালাকে অন্যতম কারণ হিসেবে দেখছেন সংশ্লিষ্টরা। কৃষকের কাছে নির্ধারিত মূল্যে সরাসরি সার পৌঁছাতে গত ৩০ আগস্ট কৃষি মন্ত্রণালয় ‘সার ডিলার নিয়োগ ও সার বিতরণ সংক্রান্ত সমন্বিত নীতিমালা-২০২৬’ বাস্তবায়নের নির্দেশ দেয়। আগের নিয়মে প্রতি ইউনিয়নে সাধারণত দুইজন ‘মাস্টার ডিলার’ থাকত, কিন্তু নতুন নীতিমালায় তা বাড়িয়ে প্রতি ইউনিয়ন ও পৌরসভায় তিনজন করার বিধান করা হয়েছে। এই নতুন ডিলার নিয়োগ প্রক্রিয়া শুরু হওয়ায় পুরোনো ডিলারদের মধ্যে আতঙ্ক এবং নতুন প্রার্থীদের বাজারে ঢোকার চেষ্টা মাঠ পর্যায়ে এক ধরনের অনিশ্চয়তা তৈরি করেছে, যার প্রভাব পড়ছে খুচরা বাজারে।
বাংলাদেশ ফার্টিলাইজার অ্যাসোসিয়েশনের সাবেক চেয়ারম্যান কপিল উদ্দিন জানান, নতুন ডিলার নিয়োগে রাজনীতিকরণের অভিযোগ রয়েছে। ডিলারের সংখ্যা তিনগুণ করা হলেও সব এলাকায় এত ডিলারের চাহিদা নেই এবং এক এলাকার ডিলার অন্য এলাকায় সার দিতে পারেন না। এছাড়া কৃষি বিভাগের পাঠানো চাহিদাপত্রে পরিসংখ্যানগত ভুল থাকায় এলাকাভিত্তিক সংকট তৈরি হয়। তবে তিনি মনে করেন, এবার সংকটের চেয়ে অপপ্রচার ও আতঙ্ক বেশি ছড়ানো হয়েছে। সরকারকে বিপদে ফেলতে একটি পক্ষ অপপ্রচার চালাচ্ছে, যা রোধে প্রশাসনের পর্যাপ্ত সক্রিয়তা দেখা যাচ্ছে না। এর ফলে কৃষকদের মধ্যে জ্বালানি তেলের মতো সারের ক্ষেত্রেও 'প্যানিক বায়িং' বা আতঙ্কিত হয়ে অতিরিক্ত ক্রয়ের প্রবণতা তৈরি হয়েছে।