২০২৭ সালের জানুয়ারি থেকে শুরু হতে যাওয়া শিক্ষাবর্ষের পাঠ্যবইয়ে বড় ধরনের পরিবর্তন আনতে যাচ্ছে জাতীয় শিক্ষাক্রম ও পাঠ্যপুস্তক বোর্ড (এনসিটিবি)। নতুন বইগুলোতে মুক্তিযুদ্ধের সেক্টর ও ব্রিগেড ফোর্স, বীরশ্রেষ্ঠদের জীবনী, ১৯৭৫ সালের ৭ নভেম্বরের পটভূমি এবং নব্বইয়ের গণ-অভ্যুত্থানে সাবেক প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়ার অবদান যুক্ত করা হচ্ছে। পাশাপাশি সাবেক রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের একটি নিবন্ধও স্থান পাচ্ছে মাধ্যমিকের বাংলা বইয়ে।
এনসিটিবি সূত্রে জানা গেছে, ইতিহাসের পাশাপাশি বাংলা এবং তথ্য ও যোগাযোগপ্রযুক্তি (আইসিটি) বিষয়েও নতুন কনটেন্ট যুক্ত করা হচ্ছে। চতুর্থ ও ষষ্ঠ শ্রেণিতে বাধ্যতামূলক হিসেবে যুক্ত হচ্ছে দুটি করে মোট চারটি নতুন বই। তবে এগুলোতে কোনো বার্ষিক পরীক্ষা থাকবে না, বরং ধারাবাহিক মূল্যায়নের মাধ্যমে শিক্ষার্থীদের অগ্রগতি যাচাই করা হবে। বর্তমানে এনসিটিবিতে বিশেষজ্ঞদের মাধ্যমে এই বইগুলোর বিষয়বস্তু যাচাইয়ের চূড়ান্ত কাজ চলছে। ২০২৮ সালে শিক্ষাক্রমে বড় ধরনের পরিমার্জনের পরিকল্পনা রয়েছে এনসিটিবির। তার আগে অন্তর্বর্তী সরকারের সংস্কারের ধারাবাহিকতায় ২০২৭ সালে এই পরিবর্তনগুলো আনা হচ্ছে। এর আগে অন্তর্বর্তী সরকারের আমলে ২০২২ সালের শিক্ষাক্রম বাতিল করে ২০১২ সালের শিক্ষাক্রম চালু করা হয়েছিল, যা বর্তমানে চলমান রয়েছে। তবে ওই সময় নতুন শিক্ষাক্রম প্রণয়নে কোনো কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি।
বিষয়ভিত্তিক পরিবর্তনের ক্ষেত্রে ষষ্ঠ শ্রেণির ‘বাংলাদেশ ও বিশ্বপরিচয়’ বইয়ে বীরশ্রেষ্ঠদের জীবনী এবং অষ্টম শ্রেণির বাংলা বইয়ে মুক্তিযুদ্ধের ব্রিগেড ফোর্স সংক্রান্ত লেখা যুক্ত করা হবে। নবম-দশম শ্রেণির বাংলা বইয়ে অন্তর্ভুক্ত হচ্ছে সাবেক রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের লেখা ‘স্বাধীনতাযুদ্ধের স্মৃতি’ শীর্ষক নিবন্ধ। এছাড়া ষষ্ঠ থেকে নবম শ্রেণির ‘বাংলাদেশ ও বিশ্বপরিচয়’ বইয়ে ১৯৭৫ সালের ৭ নভেম্বরের ঘটনা এবং অষ্টম ও নবম শ্রেণির একই বইয়ে নব্বইয়ের গণ-অভ্যুত্থানে সাবেক প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়ার ভূমিকা তুলে ধরা হবে।
অন্যান্য বিষয়ের মধ্যে ষষ্ঠ শ্রেণির বাংলা বইয়ে ‘তৃতীয় ভাষা’ শিরোনামে একটি নতুন প্রবন্ধ যুক্ত হচ্ছে, যার মাধ্যমে তৃতীয় ভাষা শেখার গুরুত্ব ও প্রয়োজনীয়তা শেখানো হবে। মাধ্যমিকের আইসিটি বইয়ে প্রযুক্তির দ্রুত পরিবর্তনের সাথে শিক্ষার্থীদের খাপ খাওয়াতে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআই নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা রাখা হচ্ছে। শ্রেণিভেদে এসব বিষয়ের বর্ণনা কম-বেশি হবে; ষষ্ঠ থেকে অষ্টম শ্রেণিতে বর্ণনা কিছুটা সংক্ষেপ হলেও নবম শ্রেণিতে তা বিস্তারিত থাকবে।
নতুন যুক্ত হওয়া বইগুলোর মধ্যে ষষ্ঠ শ্রেণির ‘আমার কারিগরি শিক্ষা’ বইটির লক্ষ্য শিক্ষার্থীদের কারিগরি শিক্ষায় আগ্রহী করা। এতে কারিগরি শিক্ষা পরিচিতি, চারপাশের প্রযুক্তি ও নতুন বিশ্ব, যারা বানায় তারাই পৃথিবী বদলায়, সমস্যা ও সমাধান করি, ছোট উদ্যোগ বড় সম্ভাবনা, ভবিষ্যৎ পেশা ও দক্ষতা, সবুজ প্রযুক্তি ও টেকসই জীবনযাপন এবং শব্দকোষ অধ্যায়গুলো থাকবে। ষষ্ঠ শ্রেণির অপর নতুন বই ‘আনন্দময় শিক্ষা’ সাজানো হয়েছে মূল্যবোধ, পুষ্টি ও স্বাস্থ্যগত জীবনযাপন এবং আনন্দে থাকার মতো বিষয় নিয়ে। চতুর্থ শ্রেণির ‘বাংলাদেশের সংস্কৃতি’ বইয়ে সংস্কৃতির ধারণা, ব্যক্তিগত জীবনে সংস্কৃতির প্রভাব, জাতীয়, ধর্মীয় ও সামাজিক উৎসব এবং সাংস্কৃতিক চর্চার গুরুত্ব তুলে ধরা হবে। আর একই শ্রেণির ‘খেলাধুলা’ বইয়ে ফুটবল, ক্রিকেট, ব্যাডমিন্টন, কাবাডি, দাবা, অ্যাথলেটিকস, সাঁতার ও মার্শাল আর্ট—এই আটটি খেলার ওপর জোর দেওয়া হয়েছে। এই চারটি নতুন বইয়ে মোট ৭১০টি চিত্র বা ইলাস্ট্রেশন থাকবে, যার মধ্যে শুধু খেলাধুলা বইয়েই থাকবে তিন শতাধিক ছবি।
আগামী শিক্ষাবর্ষে প্রাক-প্রাথমিক থেকে নবম শ্রেণি এবং ক্ষুদ্র জাতিগোষ্ঠী ও দৃষ্টিপ্রতিবন্ধী শিক্ষার্থীদের জন্য প্রায় ৩১ কোটি পাঠ্যবই ছাপানো হচ্ছে। এর মধ্যে মাধ্যমিকের জন্য ২২ কোটির বেশি এবং প্রাথমিকের জন্য প্রায় ৮ কোটি ২০ লাখ বই রয়েছে। এবার বই ছাপাতে আনুমানিক ১ হাজার ৮৭৯ কোটি টাকা ব্যয় ধরা হয়েছে। প্রাথমিকের বই চার রঙে এবং ন্যূনতম ৮৫ শতাংশ উজ্জ্বলতার কাগজে ছাপা হচ্ছে। প্রাথমিকের বইয়ের জন্য ৫২টি এবং মাধ্যমিকের জন্য ৭৬টি মুদ্রণপ্রতিষ্ঠান কাজ পেয়েছে।
২০ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত প্রাথমিকের প্রায় ২১ শতাংশ বইয়ের প্রাক-সরবরাহ পরিদর্শন শেষ হয়েছে এবং ১৮ শতাংশের বেশি বই সরবরাহ করা হয়েছে। এনসিটিবির লক্ষ্য ৩০ নভেম্বরের মধ্যে মূল বইগুলো মাঠপর্যায়ে পাঠানো, তবে নতুন চারটি বইয়ের কাজ এই সময়ে শেষ নাও হতে পারে। সার্বিক অগ্রগতি নিয়ে এনসিটিবির পাঠ্যপুস্তক সদস্য অধ্যাপক মোহাম্মদ আবু নাসের জানান, লক্ষ্যমাত্রা অনুযায়ীই বই ছাপার কাজ চলছে এবং নির্ধারিত সময়ের মধ্যেই তা পাঠানো সম্ভব হবে বলে তারা আশা করছেন।