টাঙ্গাইলের বাসাইলে ১০ কোটি ৯ লাখ ৯২ হাজার টাকা ব্যয়ে নির্মাণাধীন একটি সেতুর ফুটপাতে রডের পরিবর্তে বাঁশ ব্যবহারের অভিযোগে অভিযান চালিয়েছে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক)। একই সঙ্গে এ ঘটনায় দায়ের হওয়া মামলায় শাহ আলম নামের এক সাব-ঠিকাদারকে গ্রেপ্তার করেছে পুলিশ। পাশাপাশি অবহেলার অভিযোগে স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদপ্তরের (এলজিইডি) এক উপসহকারী প্রকৌশলীকে সাময়িক বরখাস্ত এবং দুজনকে কারণ দর্শানোর নোটিশ দেওয়া হয়েছে।
বুধবার দুদক টাঙ্গাইল জেলা কার্যালয়ের সহকারী পরিচালক বিপ্লব হোসেনের নেতৃত্বে সেতুটিতে এই অভিযান চালানো হয়। অভিযানে জেলা কার্যালয়ের উপ-সহকারী পরিচালক বাসেদ আলীসহ অন্য কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন। অভিযান শেষে সহকারী পরিচালক বিপ্লব হোসেন বলেন, প্রাথমিকভাবে এখানে দুর্নীতি হয়েছে বলে মনে হয়েছে। আমরা ফুটপাতের স্ল্যাব ও রেলিংয়ের পিলার ভেঙে দেখেছি যে সেখানে প্রয়োজনীয় পরিমাণ রড নেই। সরেজমিনে সংগৃহীত তথ্যের ভিত্তিতে আমাদের বিশেষজ্ঞরা প্রতিবেদন দেবেন এবং তার ওপর ভিত্তি করে পরবর্তী আইনি পদক্ষেপের জন্য কমিশনে বিস্তারিত জানানো হবে। বাঁশ ব্যবহারের বিষয়ে তিনি বলেন, সাটারিংয়ে বাঁশের ব্যবহার আমরা দেখেছি, তবে মূল ঢালাইয়ে ব্যবহৃত বাঁশগুলো আমরা সরেজমিনে দেখতে পাইনি, যদিও গণমাধ্যমের ভিডিওতে তা দেখা গেছে।
এর আগে, মঙ্গলবার সন্ধ্যায় বাসাইল পৌরসভার মাইজখাড়া সেতুর কাছ থেকে মামলার দ্বিতীয় আসামি ও সাব-ঠিকাদার শাহ আলমকে গ্রেপ্তার করে পুলিশ। ৪৪ বছর বয়সী শাহ আলম রংপুরের পীরগাছা উপজেলার বালাপাড়া এলাকার মৃত নবুর উদ্দিনের ছেলে। এ ঘটনায় উপজেলা প্রশাসন তিন সদস্যের একটি তদন্ত কমিটি গঠন করেছে। অন্যদিকে, দায়িত্বে অবহেলার কারণে এলজিইডির উপসহকারী প্রকৌশলী মনিরুজ্জামানকে সাময়িক বরখাস্ত করা হয়েছে এবং আরও দুই প্রকৌশলীকে শোকজ করা হয়েছে। এলজিইডির প্রধান প্রকৌশলী বেলাল হোসেন স্বাক্ষরিত পৃথক তিনটি অফিস আদেশের মাধ্যমে এই সিদ্ধান্ত জানানো হয়।
বাসাইল উপজেলা প্রকৌশলী কাজী ফাত্তাউর রহমান বাদী হয়ে ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের মূল ঠিকাদার এসএম জাহাঙ্গীর আলম ও সাব-ঠিকাদার শাহ আলমের বিরুদ্ধে মামলাটি করেন। কাজী ফাত্তাউর রহমান জানান, ঠিকাদাররা তাদের অনুপস্থিতিতে কাউকে না জানিয়ে রাতে নিয়মবহির্ভূতভাবে ওয়াকওয়ে ও ফুটপাতের ঢালাইয়ের কাজ করেছেন। বিষয়টি জানার পর ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের অবহিত করে থানায় মামলা করা হয়েছে। ঢাকা অঞ্চল ও টাঙ্গাইল এলজিইডির কর্মকর্তারা ঘটনাস্থল পরিদর্শন করেছেন এবং ল্যাব টেস্টসহ প্রয়োজনীয় পরীক্ষা-নিরীক্ষা শেষে তদন্ত প্রতিবেদন অনুযায়ী পরবর্তী ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
প্রকল্পের বিবরণ অনুযায়ী, বাসাইল পৌরসভার মাইজখাড়া এলাকায় মরাগাঙ্গী নদীর ওপর (বাসাইল জিসি-কাউলজানী ইউপি ভায়া মাইজখাড়া জিপিএস সড়ক) ৯০ দশমিক শূন্য ৬ মিটার দীর্ঘ এই সেতুটি নির্মাণ করা হচ্ছে। মেসার্স ইউনুছ আল মামুন ও মেসার্স জাকির এন্টারপ্রাইজ নামের যৌথ ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান প্রায় ১০ কোটি ৯ লাখ ৯২ হাজার টাকা ব্যয়ে কাজটি করছে। ২০২২ সালের সেপ্টেম্বরে শুরু হওয়া এই কাজের মেয়াদ চলতি বছরের ফেব্রুয়ারিতে শেষ হওয়ার কথা থাকলেও নির্ধারিত সময়ে শেষ না হওয়ায় সময় বাড়ানো হয়। বর্তমানে সেতুটির প্রায় ৮০ শতাংশ কাজ শেষ হয়েছে।
স্থানীয় বাসিন্দাদের অভিযোগ, গত রবিবার রাত সাড়ে ১০টার দিকে ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের লোকজন সেতুর ফুটপাতের স্ল্যাব তৈরিতে রডের বদলে বাঁশ ব্যবহার করে ঢালাই শুরু করেন। স্থানীয়রা বিষয়টি দেখে বাধা দিলে কাজ সাময়িকভাবে বন্ধ হয়ে যায় এবং তারা মোবাইল ফোনে এর ভিডিও ধারণ করেন। কিন্তু স্থানীয়রা চলে যাওয়ার পর রাতে পুনরায় কাজ করে ঢালাই শেষ করা হয়। পরে সেই ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়লে বিষয়টি কর্তৃপক্ষের নজরে আসে এবং বিভিন্ন গণমাধ্যমে সংবাদ প্রকাশিত হয়।