গত সপ্তাহে অফিসের লাইব্রেরিতে গিয়ে এমনিতেই বইয়ের পাতা উল্টাচ্ছিলাম। হঠাৎ একটা বইয়ের পাতাজুড়ে গ্রাজিয়া দেলেদ্দার ছবিতে চোখে পড়ল। কৌতূহল থেকে পড়া শুরু করেছিলাম, আর তারপর থেকে যেন মুগ্ধ হয়ে আছি। গত এক সপ্তাহ ধরে তাঁকে পড়ছি, জানছি, বোঝার চেষ্টা করছি। তাঁর লেখায় নৈসর্গিক সৌন্দর্য, গভীর অনুভব, কল্পনা আর বাস্তবতার অপূর্ব মেলবন্ধন আছে। অসাধারণ তাঁর লেখনী সত্যিই গভীরভাবে ছুঁয়ে গেছে আমাকে।

গ্রাজিয়া দেলেদ্দা ছিলেন ইতালির একজন প্রখ্যাত সাহিত্যিক ও নোবেলজয়ী ঔপন্যাসিক। তাঁর লেখায় মানবমনের গভীর টানাপোড়েন, নৈতিক দ্বন্দ্ব, ভালোবাসা, অপরাধবোধ এবং সার্ডিনিয়ার প্রকৃতি ও গ্রামীণ জীবনের অনবদ্য চিত্র ফুটে ওঠে। সহজ অথচ গভীর ভাষাশৈলী এবং বাস্তবতার সঙ্গে কাব্যিক মেলবন্ধন তাঁর সাহিত্যকে দিয়েছে এক অনন্য উচ্চতা।

১৮৭১ সালের ২৭ সেপ্টেম্বর সার্ডিনিয়ার প্রত্যন্ত পাহাড়ি গ্রাম নুওরোতে তাঁর জন্ম। এক জায়গা যেখানে মেয়েদের জীবন আগে থেকেই লেখা থাকত—প্রাথমিক বিদ্যালয়, রান্নাবান্না, সেলাইফোঁড়াই, বিয়ে, সন্তান। গ্রাজিয়া দেলেদ্দা এ পথেই হাঁটছিলেন। চার ভাইবোনের মধ্যে তিনি ছিলেন চতুর্থ। এগারো বছর বয়সে তাঁর লেখাপড়া শেষ। হাতে তুলে দেওয়া হলো সেলাইয়ের সুঁই। কিন্তু কেউ তাঁকে পড়া থামানোর কথা বলেনি। পরিবারের সবাই যখন ঘুমিয়ে পড়ত, তিনি লুকিয়ে লুকিয়ে পড়তেন। সেলাইয়ের ঝুড়ির নিচে লুকিয়ে রাখতেন বই। আর ভোরের নিস্তব্ধ প্রহরে শুরু করলেন লেখালেখি—সার্ডিনিয়ার মেষপালক, সংগ্রামী কৃষক, ভালোবাসাহীন দাম্পত্যে আটকে পড়া নারী, আর সম্মানের বেড়াজালে ধ্বংস হওয়া পুরুষদের গল্প।

সতেরো বছর বয়সে রোমের এক পত্রিকায় প্রথম গল্প পাঠালেন। তা ছাপা হলো। তাঁর নাম প্রথমবারের মতো প্রকাশিত হলো। পরিবার আঁতকে উঠল। নারীর জন্য লেখালেখি সম্মানজনক নয়। লেখা প্রকাশ করাটা আরও খারাপ। ভাইয়েরা বলল তিনি পরিবারের সম্মান ধুলোয় মিশিয়ে দিচ্ছেন। পাড়া-প্রতিবেশী কানাঘুষা করল। খবরের কাগজ ব্যঙ্গ করল। গ্রাজিয়া লেখা চালিয়ে গেলেন।

তাঁর বিবাহ ও সংসার জীবনের যাত্রা শুরু হলো ১৯০০ সালে। গ্রাজিয়ার বিয়ে হলো পালমিরো মাদেজানির সঙ্গে, ইতালির অর্থ মন্ত্রণালয়ের এক কর্মকর্তা। বিয়ের পরই তাঁরা চলে গেলেন রোমে। সংসার, স্বামী, আর দুই পুত্রসন্তান সার্দুস (১৯০১) ও ফ্রাঞ্চেস্কো "ফ্রাঞ্জ" (১৯০৪)—সবকিছু সামলে তিনি লেখালেখি চালিয়ে গেলেন। বছরে প্রায় একটি করে উপন্যাস বের হতো তাঁর কলম থেকে। এলিয়াস পোর্তোলু (১৯০৩), চেনেরে (১৯০৪), লেদেরা (১৯০৮), আর তাঁর সবচেয়ে জনপ্রিয় উপন্যাস কানে আল ভেন্তো (১৯১৩) একের পর এক সৃষ্টি। একজন স্ত্রী, একজন মা, একজন গৃহিণী এসবই ছিলেন তিনি। কিন্তু তার চেয়েও বড় ছিলেন তিনি একজন লেখক।

এরপর এল ১৯২৬ সাল। সুইডিশ একাডেমি ঘোষণা করল সাহিত্যে নোবেল পুরস্কার পাচ্ছেন গ্রাজিয়া দেলেদ্দা। ইতিহাসে দ্বিতীয় নারী হিসেবে সাহিত্যে নোবেল জয়ী। প্রথম ইতালীয় নারী। সংবাদ শুনে তাঁর প্রথম প্রতিক্রিয়া ছিল "ইতিমধ্যেই?" যে শহর দশকের পর দশক তাঁকে উপহাস করেছিল, সেই শহরই গর্ব করতে লাগল। খবরের কাগজ আর ফটোগ্রাফারদের ভিড়ে তাঁর রোমের বাড়ি ভরে গেল। কিন্তু একসময় বিরক্ত হলেন তিনি। তাঁর প্রিয় পোষা কাক চেক্কা পর্যন্ত বিরক্ত হয়ে পড়েছিল লোকজনের আনাগোনায়। গ্রাজিয়া বললেন, "চেক্কা যদি সহ্য করতে না পারে, আমিও পারি না।" এবং ফিরে গেলেন তাঁর লেখার টেবিলে।

শেষ বয়সে স্তন ক্যানসারে আক্রান্ত হয়েও তিনি লেখা থামাননি। অস্ত্রোপচারের পরও লিখে গেছেন। ১৯৩৬ সালে ৬৪ বছর বয়সে রোমে শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন তিনি। তাঁর শেষ উপন্যাস লা কিয়েসা দেলা সোলিতুদিনে (The Church of Solitude) আত্মজীবনীমূলক—এক তরুণী মারাত্মক রোগের সঙ্গে মানিয়ে নেওয়ার গল্প। তাঁর মৃত্যুর পর আরেকটি পাণ্ডুলিপি কোজিমা উদ্ধার হয়, যা প্রকাশিত হয় ১৯৩৭ সালে।

গ্রাজিয়া দেলেদ্দার গল্প কি আমাদের চেনা নয়? এ দেশের কোটি কোটি মেয়ের জন্যও পথ আগে থেকে নির্ধারিত—পড়াশোনা করেছো? এখন বিয়ে করো। সংসার করো। লেখালেখি করে কী হবে? সংসার, সন্তান, স্বামী এসবের পাশে দাঁড়িয়েও নিজের স্বপ্নকে বাঁচিয়ে রাখা। বাংলাদেশের রোকেয়া, সুফিয়া কামাল, বেগম সুফিয়া—তাঁরাও তো একই পথ পেরিয়ে এসেছেন। পেরিয়ে আসছেন আজও হাজারো নারী, রাত জেগে, ভোরের প্রথম আলোয় কলম ধরে। গ্রাজিয়া দেলেদ্দা প্রমাণ করে গেছেন একজন নারী একসঙ্গে মা, স্ত্রী, গৃহিণী আর বিশ্বসাহিত্যে নোবেলজয়ী লেখক হতে পারেন যদি কেউ তাঁকে থামাতে না পারে।

গ্রাজিয়া দেলেদ্দার সবচেয়ে প্রশংসিত উপন্যাস কানে আল ভেন্তো (১৯১৩)। সার্ডিনিয়ার এক সম্ভ্রান্ত পরিবারের চার বোনের গল্প, পিতার মৃত্যুর পর যাদের জীবন ভেঙে পড়ে, কিন্তু এক রহস্যময় আত্মীয়ের আগমন সবকিছু বদলে দেয়। উপন্যাসটির শিরোনাম যেন গল্পের আত্মাকে ধারণ করে—নলখাগড়ার মতো মানুষ, বাতাসে যারা নুয়ে পড়ে কিন্তু ভাঙে না। দেলেদ্দার ভাষা এতটাই নির্মল ও মৃদু যে পড়তে পড়তে মনে হয় সার্ডিনিয়ার পাহাড়ি বাতাস এসে গায়ে লাগছে। প্রেম, অপরাধবোধ, মুক্তি আর নিয়তির এক চমৎকার আখ্যান। যারা নারীর অন্তর্জগত বুঝতে চান, তাদের জন্য আবশ্যক পাঠ।

কখনও কখনও একজন মানুষের পক্ষে সবচেয়ে শক্তিশালী কাজটি হলো পৃথিবী তাঁর জন্য যা নির্ধারণ করে দিয়েছে, তা হতে স্রেফ অস্বীকার করা। গ্রাজিয়া দেলেদ্দার উপন্যাসে নিষিদ্ধ প্রেম মানে কিন্তু শারীরিক যৌনতা নয়, বরং সমাজের নির্ধারিত সীমানা ভেঙে ফেলা আবেগ, যার পরিণতি হয় অপরাধবোধ, পাপবোধ ও করুণ ট্র্যাজেডি। তাঁর প্রধান তিনটি নিষিদ্ধ প্রেমের ধারা—

ভাইয়ের বধূর সঙ্গে প্রেম: এলিয়াস পোর্তোলু (১৯০৩)-এ এলিয়াস এক সাবেক আসামি, জেল থেকে ফিরে আসে নিজের গ্রামে। সেখানে সে দেখে তার ভাই পিয়েত্রোর ভাবী স্ত্রী মারিয়া মাদ্দালেনা, এক অপূর্ব সুন্দরী নারী। দুটো হৃদয়ের মধ্যে অনৈতিক প্রেম জন্মায়। শারীরিক সম্পর্ক হয়। গর্ভধারণ। পাপবোধে জর্জরিত এলিয়াস সিদ্ধান্ত নেয় সে পুরোহিত হবে। পবিত্রতার পোশাকে আশ্রয় নেবে এই নিষিদ্ধ প্রেমের আগুন থেকে। কিন্তু নিয়তি আরও নির্মম। পিয়েত্রো মারা যায়। এখন এলিয়াস পারে সে মারিয়া মাদ্দালেনাকে বিয়ে করে সন্তানের বৈধ পিতা হতে। সে যা চায়, তাই। কিন্তু সে পুরোহিত হওয়ার পথ বেছে নেয়। সন্তান মারা যায়। আমরা মানুষ, এলিয়াস, নলখাগড়ার মতো fragile। আমাদের ওপরে এক শক্তি আছে যা আমরা জয় করতে পারি না। এটা দস্তয়েভস্কির অপরাধ ও শাস্তি-র মতো একটি পাপ, তার পরিণতি, আর অনন্ত অপরাধবোধের কাহিনি। অসাধারণ ছিল এই উপন্যাস।

পিতার শাসন ভেঙে প্রেমের পথে পলায়ন: কানে আল ভেন্তো (১৯১৩)-তে পিন্টর পরিবারের প্রধান ডন জামে এক রক্তপাগল, অহংকারী, সম্মান-পাগল পিতা। তাঁর চার মেয়ের কেউ বাড়ির বাইরে পা রাখতে পারে না। শুধু ঘরের কাজ, নীরবতা, আর বাধ্যতা। কিন্তু লিয়া, তৃতীয় মেয়েটি বিদ্রোহ করে। পিতার সব নিয়ম ভেঙে সে পালিয়ে যায় ইতালি মূল ভূখণ্ডে। সেখানে বিয়ে করে, সন্তানের মা হয়… কিন্তু মৃত্যু হয় অকালে। ডন জামে পাগলের মতো হয়ে যান। এরপর রহস্যজনকভাবে তাঁর মৃত্যু হয়—হত্যা না দুর্ঘটনা? এখানে নিষিদ্ধ প্রেম মানে পিতার ইচ্ছার বিরুদ্ধে গিয়ে নিজের জীবন বেছে নেওয়া। লিয়ার অপরাধ? সে একজন পুরুষকে ভালোবেসেছে, নিজের ইচ্ছায় বিয়ে করেছে—একটি মেয়ের জন্য এটুকুই ছিল তখনকার সময়ের সার্ডিনিয়ায় অপরাধ।

পৌরোহিত্য বনাম মানবিক প্রেম: এলিয়াস পোর্তোলু-তে দ্বিতীয় মাত্রা এলিয়াসের মধ্যে দ্বন্দ্ব শুধু একজন বধূর প্রতি প্রেমের নয়, বরং ঈশ্বরের সেবক বনাম মানুষের পিতা হওয়ার দ্বন্দ্ব। সে তার সন্তানকে ভালোবাসে। কিন্তু পুরোহিতের ব্রত তাকে ডাকে। একদিকে পার্থিব প্রেম, অন্যদিকে পবিত্রতার আকাঙ্ক্ষা। দেলেদ্দা এই ধর্মীয় ব্রত ও মানবিক আবেগের দ্বন্দ্বকে নিষিদ্ধ প্রেমের আরেক রূপ হিসেবে দেখান, যেখানে প্রেম নিজেই পাপ হয়ে ওঠে না, বরং প্রেম ও পবিত্রতার সঠিক পথ বেছে নিতে না পারে।

দেলেদ্দার নিষিদ্ধ প্রেম বলতে বোঝায় পরকীয়া (ভাইয়ের স্ত্রীর প্রতি আসক্তি), পিতৃতন্ত্রের বিরুদ্ধে প্রেমের অধিকার (পিতার শাসন ভেঙে নিজের ভালোবাসা বেছে নেওয়া), এবং ধর্মীয় ব্রত বনাম মানবিক আবেগের দ্বন্দ্ব। তিনি দেখান এই প্রেমগুলোর ফলাফল কতটা করুণ হয়—অপরাধবোধ, সন্তানহারা, মৃত্যু, আর অনন্ত নীরবতা। কিন্তু একইসঙ্গে তিনি এই প্রশ্নও রেখে যান, "প্রেম যখন সমাজের নিয়ম ভাঙে, তখন কি প্রেমটাই ভুল, নাকি সমাজের নিয়মটাই অন্যায়?" এই দ্বন্দ্বের উত্তর খুঁজতে গিয়েই দেলেদ্দা লিখে গেছেন সারা জীবন।

লেখক: নাজমীন মর্তুজা, অস্ট্রেলিয়া প্রবাসী

তাঁর Canne al vento* (বাতাসে নলখাগড়া) গ্রাজিয়া দেলেদ্দার সবচেয়ে প্রশংসিত উপন্যাস Canne al vento (১৯১৩)।

তাঁর প্রধান তিনটি নিষিদ্ধ প্রেমের ধারা ভাইয়ের বধূর সাথে প্রেম *Elias Portolu* (১৯০৩) এলিয়াস পোর্তোলু এক সাবেক আসামী, জেল থেকে ফিরে আসে নিজের গ্রামে।