জ্বালানি তেলের মূল্যবৃদ্ধির পর দূরপাল্লার বাসের ভাড়া কিলোমিটারে ১৭ পয়সা বাড়িয়ে নতুন তালিকা প্রকাশ করেছে বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন কর্তৃপক্ষ (বিআরটিএ)। গত মঙ্গলবার সরকার এ ভাড়া বৃদ্ধির সিদ্ধান্ত নেয় এবং বৃহস্পতিবার নতুন ভাড়ার তালিকা প্রকাশ করা হয়। অবশ্য গত রোববার জ্বালানি তেলের দাম বাড়ার পর থেকেই দূরপাল্লার বাসে দূরত্বভেদে ৫০ থেকে ২০০ টাকা পর্যন্ত বাড়তি ভাড়া আদায় করছেন পরিবহনমালিক ও শ্রমিকেরা।

নতুন হার অনুযায়ী, দূরপাল্লার পথে ৫১ আসনের বাসের ভাড়া যাত্রীপ্রতি কিলোমিটারে ২ টাকা ৪০ পয়সা। সে হিসাবে পঞ্চগড় পর্যন্ত যমুনা সেতুর টোলসহ ৫১ আসনের ভাড়া হওয়ার কথা ১ হাজার ৮৬ টাকা। তবে দূরের পথে অধিকাংশ কোম্পানি আসন কমিয়ে ৪০ আসনের আরামদায়ক বাস চালায়, যেখানে ভাড়া বেশি পড়ে; বাদ দেওয়া আসনগুলোর ভাড়া অন্য যাত্রীদের ওপর ভাগ করে দেওয়া হয়।

এ ছাড়া দূরপাল্লার পথে চলাচলকারী শীতাতপনিয়ন্ত্রিত (এসি) বাসের ভাড়া সরকার নির্ধারণ করে না। এসি বাসের মালিকেরা নিজেদের মতো ভাড়া ঠিক করেন, ফলে একই দূরত্বে একেক কোম্পানির এসি বাসের ভাড়া ভিন্ন হয়। মূলত কোম্পানির সুনাম, বাসের মান ও সেবার ওপর ভিত্তি করে এসি বাসের ভাড়ার তারতম্য হয়।

ঢাকা থেকে ৪০ আসনের বাসে পঞ্চগড়ের ভাড়া হবে ১ হাজার ৩৭৬ টাকা। আগে এই পথের ভাড়া ছিল ১ হাজার ২৬৩ টাকা।

উত্তরের পথে ঢাকা থেকে বগুড়ার দূরত্ব ১৯১ কিলোমিটার। এই পথে ৪০ আসনের বাসে ভাড়া ৫০ টাকা বেড়ে নতুন ভাড়া নির্ধারণ করা হয়েছে ৬২০ টাকা; আগে ভাড়া ছিল ৫৭০ টাকা। ৫১ আসনের বাসে বগুড়ার ভাড়া ৪৮৬ টাকা।

ঢাকা থেকে রাজশাহীর দূরত্ব ২৪৭ কিলোমিটার। নতুন হার অনুযায়ী ৪০ আসনের বাসে ভাড়া ৭৯২ টাকা নির্ধারণ করা হয়েছে; আগে এই পথে ভাড়া ছিল ৭২৭ টাকা, অর্থাৎ ভাড়া বেড়েছে ৩৫ টাকা। ৫১ আসনের বাসে রাজশাহীর ভাড়া এখন ৬২১ টাকা।

দেশের সবচেয়ে দূরের পথ ঢাকা থেকে কক্সবাজারের টেকনাফ পর্যন্ত। ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়ক ধরে টেকনাফ পর্যন্ত দূরত্ব ৪৬২ কিলোমিটার। এই পথে ৪০ আসনের বাসের ভাড়া ১২৬ টাকা বেড়ে সরকার নির্ধারিত ভাড়া দাঁড়িয়েছে ১ হাজার ৪৩৫ টাকা; বৃদ্ধির আগে ভাড়া ছিল ১ হাজার ৩০৯ টাকা। ৫১ আসনের বাসে এই পথের ভাড়া ১ হাজার ১২৬ টাকা।

ঢাকা থেকে কক্সবাজারের দূরত্ব ৩৯৬ কিলোমিটার। এই পথে ৪০ আসনের বাসের ভাড়া বেড়ে দাঁড়িয়েছে ১ হাজার ২৩৩ টাকা; এত দিন ভাড়া ছিল ১ হাজার ১২৪ টাকা। ৫১ আসনের বাসের নতুন ভাড়া ৯৬৭ টাকা।

ঢাকা-চট্টগ্রাম পথের দূরত্ব ২৪২ কিলোমিটার। এই পথে ভাড়া বেড়েছে ৬৭ টাকা; ৪০ আসনের বাসে ঢাকা থেকে চট্টগ্রামের ভাড়া এখন ৭৫৭ টাকা, আগে ছিল ৬৯০ টাকা।

পরিবহন খাতের সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা জানিয়েছেন, ঢাকা থেকে চট্টগ্রাম, কক্সবাজার ও টেকনাফ পথে ৫১ আসনের বাস খুব একটা চলে না। বেশির ভাগ বাসই এসি, এসি স্লিপার ও ৪০ আসনের। এসি বাসের ভাড়া দেড় হাজার থেকে আড়াই হাজার টাকা পর্যন্ত নেওয়া হতো; জ্বালানি তেলের দাম বাড়ার পর এসব বাসের মালিকেরা ২০০ টাকার মতো ভাড়া বাড়িয়েছেন। ৪০ আসনের নন-এসি বাসেও ১০০ থেকে ১৫০ টাকা পর্যন্ত ভাড়া বাড়ানো হয়েছে।

ঢাকা থেকে সিলেটের পথেও প্রচুর এসি ও নন-এসি ৪০ আসনের বাস চলাচল করে। নরসিংদী, ব্রাহ্মণবাড়িয়া হয়ে সিলেটের দূরত্ব ২৫৭ কিলোমিটার। এই পথে ৪০ আসনের বাসের ভাড়া নির্ধারণ করা হয়েছে ৭৯৬ টাকা; এত দিন ছিল ৭২৮ টাকা, অর্থাৎ ভাড়া বেড়েছে ৬৮ টাকা। ৫১ আসনের বাসে সিলেটের ভাড়া ৬২৪ টাকা।

ঢাকা থেকে কুমিল্লা পর্যন্ত ৪০ আসনের বাসের ভাড়া ৩২৮ টাকা এবং ৫১ আসনের বাসের ভাড়া ২৫৭ টাকা নির্ধারণ করা হয়েছে। এই পথের দূরত্ব ১০২ কিলোমিটার; ভাড়া বেড়েছে ১৮ থেকে ৩১ টাকা।

পদ্মা সেতু হয়ে বরিশাল ও খুলনা বিভাগের বিভিন্ন জেলায় বাসে যাতায়াত করা যায়। আগে ফেরিতে পারাপার করতে হতো; এখন বরিশাল তিন-চার ঘণ্টায় এবং খুলনায় পাঁচ ঘণ্টায় পৌঁছানো যায়। তবে দ্রুত যাতায়াতের জন্য যাত্রীদের বাড়তি টাকা গুনতে হয়। এই পথের যাত্রীদের ঢাকা-ভাঙা এক্সপ্রেসওয়ে, পদ্মা সেতুসহ ছোট-বড় আরও কিছু সেতুর টোল দিতে হয়। পরিবহন মালিক-শ্রমিকেরা বলছেন, দেশে সবচেয়ে বেশি টোল দিতে হয় পদ্মা সেতু হয়ে চলাচলকারী যানবাহনের।

ঢাকা থেকে পদ্মা সেতু হয়ে বরিশালের দূরত্ব ১৭১ কিলোমিটার। ৪০ আসনের বাসে এই পথের ভাড়া নির্ধারণ করা হয়েছে ৬২৯ টাকা; এত দিন ভাড়া ছিল ৫৩৪ টাকা, অর্থাৎ ভাড়া বেড়েছে ৯৫ টাকা। ৫১ আসনের বাসে বরিশালের ভাড়া ৫৩৪ টাকা।

পদ্মা সেতু দিয়ে ঢাকা থেকে গোপালগঞ্জ হয়ে খুলনায় বাসের ভাড়া দাঁড়িয়েছে ৭৩৪ টাকা। এই পথের দূরত্ব ২০৫ কিলোমিটার এবং প্রত্যেক যাত্রীর পেছনে টোল বাবদ খরচ পড়ে ১০৭ টাকার মতো। এই পথে ৫১ আসনের বাসের ভাড়া নির্ধারণ করা হয়েছে ৫৭৬ টাকা।

ঢাকা থেকে পদ্মা সেতু হয়ে কুয়াকাটার দূরত্ব ২৮০ কিলোমিটার। এই পথে ৪০ আসনের বাসের নতুন ভাড়া ৯৯৬ টাকা; এত দিন ভাড়া ছিল ৯০৮ টাকা, অর্থাৎ ভাড়া বেড়েছে ৮৮ টাকা। ৫১ আসনের বাসে কুয়াকাটার ভাড়া দাঁড়িয়েছে ৭৮১ টাকা।

নতুন ভাড়ার তালিকা প্রসঙ্গে বিআরটিএর পরিচালক (প্রকৌশল) মো. শহীদুল্লাহ প্রথম আলোকে বলেন, পরিবহন মালিক-শ্রমিকেরা এই তালিকা মেনে ভাড়া আদায় করবেন। কেউ বাড়তি ভাড়া আদায় করলে ভ্রাম্যমাণ আদালতের মাধ্যমে আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

পরিবহন বিশেষজ্ঞ এবং বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বুয়েট) পুর কৌশল বিভাগের অধ্যাপক মো. হাদীউজ্জামান প্রথম আলোকে বলেন, জ্বালানির মূল্যবৃদ্ধির পর যে ভাড়া বাড়ানো হয়েছে, তা যৌক্তিক। কিন্তু মূল প্রশ্নটা হচ্ছে, সরকার নির্ধারিত ভাড়া কার্যকর থাকবে কি না। বরাবরই সরকারের নির্ধারিত ভাড়ার চেয়ে বাড়তি নেন মালিক-শ্রমিকেরা। এখানেই বিআরটিএ ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর দায়িত্ব। তিনি বলেন, দেশের মানুষ এমনিতেই মূল্যবৃদ্ধির কষ্টে আছেন; এর মধ্যে পরিবহন মালিক-শ্রমিকেরা যাতে বাড়তি ভাড়া আদায় করতে না পারেন, তা সরকারকেই নিশ্চিত করতে হবে।

বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন কর্তৃপক্ষের (বিআরটিএ) তালিকা অনুযায়ী, দূরত্ব ৪৩৮ কিলোমিটার।

ভাড়া বৃদ্ধির পর এই পথে ৪০ আসনের বাসের ভাড়া ১১৩ টাকা বেড়েছে।