রক্তঝরা জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের পর দেশবাসী সর্বক্ষেত্রে ন্যায্যতা ও আইনের শাসন প্রতিষ্ঠার আশা করলেও, বর্তমানে সেই প্রত্যাশার জায়গায় থাবা বসিয়েছে নজিরবিহীন ‘গ্রেফতার বাণিজ্য’। ২০২৬ (2026) সালের ২৫ সেপ্টেম্বর প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী, বৈষম্যবিরোধী আন্দোলনের সহিংসতা ও গণহত্যার বিচার দাবিতে দায়ের করা মামলাগুলোকে হাতিয়ার করে ঢাকাসহ সারা দেশে একশ্রেণির অসাধু police সদস্য ও দালালচক্র মেতে উঠেছে অর্থ আদায়ে। ভুক্তভোগী ও নিরপরাধ মানুষেরা এখন থানা ও আদালতের বারান্দায় ঘুরছেন, আর তদন্তাধীন মামলাগুলো পরিণত হয়েছে এই চক্রের আয়ের প্রধান উৎসে। মামলা ঝুলিয়ে রেখে গ্রেফতারের ভয় দেখানো, রিমান্ডের হুমকি এবং জামিন পাওয়ার পরও নতুন মামলায় ‘শ্যোন অ্যারেস্ট’ না দেখানোর আশ্বাস দিয়ে লাখ লাখ টাকা হাতিয়ে নেওয়া হচ্ছে।

পুলিশ সদর দপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৪ সালের জুলাই-আগস্টের গণ-অভ্যুত্থানের পর দেশজুড়ে হত্যা, হত্যাচেষ্টাসহ বিভিন্ন অপরাধে মোট ১ হাজার ৮৮০টি মামলা দায়ের করা হয়। এর মধ্যে বৈষম্যবিরোধী আন্দোলনের ঘটনায় হত্যা মামলা ছাড়া অন্যান্য মামলা ছিল ১ হাজার ৭৭টি। গত ১৪ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত প্রাপ্ত হিসাবে দেখা যায়, গত দুই বছরের বেশি সময়ে এই ১ হাজার ৮৮০টি মামলার মধ্যে মাত্র ৩৫২টি (১৮ দশমিক ৭ শতাংশ) নিষ্পত্তি হয়েছে। অর্থাৎ, ৮১ দশমিক ৩ শতাংশ মামলার তদন্ত এখনো শেষ হয়নি। অন্যদিকে, দায়ের হওয়া ৮০৩টি হত্যা মামলার মধ্যে নিষ্পত্তি হয়েছে মাত্র ১৪৭টি (১৮ দশমিক ৩ শতাংশ), যার ফলে ৮১ দশমিক ৭ শতাংশ হত্যা মামলার তদন্ত এখনো ঝুলে রয়েছে। হত্যা ও অন্যান্য অপরাধ মিলিয়ে মোট ২৭০টি মামলায় চার্জশিট দেওয়া হয়েছে, যার মধ্যে ৯৪টি হত্যা মামলা রয়েছে।

নিস্পত্তি হওয়া হত্যা মামলাগুলোর মধ্যে ৯৪টিতে চার্জশিট এবং ৫৩টিতে ফাইনাল রিপোর্ট দেওয়া হয়েছে। অর্থাৎ, ৬৭ দশমিক ৯ শতাংশ ক্ষেত্রে আসামিদের বিরুদ্ধে চার্জশিট এবং ৩২ দশমিক ১ শতাংশ ক্ষেত্রে ফাইনাল রিপোর্ট জমা পড়েছে। বর্তমানে ১ হাজার ৫২৮টি মামলার তদন্ত চলছে, যার মধ্যে ৬৫৬টি হত্যা মামলা। এছাড়া হত্যাচেষ্টাসহ অন্যান্য মামলার মধ্যে নিষ্পত্তি হয়েছে ২০৫টি; যার ১৭৬টিতে চার্জশিট এবং ২৫টিতে ফাইনাল রিপোর্ট দেওয়া হয়েছে। এসব মামলার মধ্যে হত্যা মামলায় ৭ হাজার ৫২৫ জন এবং অন্যান্য মামলায় ১৩ হাজার ৮৭১ জনসহ সর্বমোট ২১ হাজার ৩৯৬ জনের বিরুদ্ধে চার্জশিট দেওয়া হয়েছে।

অনুসন্ধানে জানা গেছে, মামলার এজাহারভুক্ত আসামিদের বাঁচানোর প্রতিশ্রুতি দিয়ে এবং নাম না থাকলেও অজ্ঞাতনামা আসামির ভয় দেখিয়ে সচ্ছল ব্যবসায়ী, চাকরিজীবী, সাবেক স্থানীয় রাজনৈতিক নেতাকর্মী বা প্রবাসী পরিবারের সদস্যদের টার্গেট করা হচ্ছে। গ্রেফতারের সময় দালাল বা স্থানীয় প্রভাবশালীদের মাধ্যমে থানায় দরকষাকষি হয়। টাকা দিলে রাতেই নির্দোষ সার্টিফিকেট দিয়ে ছেড়ে দেওয়া হয়, অন্যথায় পাঠানো হয় আদালতে। এমনই এক ঘটনায় আটক ব্যক্তির মুক্তির জন্য থানায় প্রথমে ১০ লাখ টাকা দাবি করা হয়। পরে ৫ লাখ টাকা দিয়ে একজন মুক্তি পেলেও তার বড় ভাইকে পেন্ডিং মামলায় চালান দেওয়া হয়। পরবর্তীতে বড় ভাইকে নতুন কোনো মামলায় শ্যোন অ্যারেস্ট না দেখানোর নিশ্চয়তা পেতে স্বজনদের আরও ২ লাখ টাকা গুনতে হয়। প্রায় ৬ মাস কারাভোগের পর তিনি জামিনে মুক্তি পান।

এ বিষয়ে ভাটারা ও ক্যান্টনমেন্ট থানার তৎকালীন ওসি রাকিবুল হাসান (যাকে ১৭ সেপ্টেম্বর ডিএমপি সদর দপ্তরে সংযুক্ত করা হয়) জানান, প্রতিদিন অনেক ঘটনা ঘটায় সুনির্দিষ্টভাবে এটি তার মনে নেই। তিনি সরাসরি কাউকে গ্রেফতার করেন না, কর্মকর্তারা আসামি ধরেন। টাকার বিনিময়ে আসামি ছেড়ে দেওয়া বা শ্যোন অ্যারেস্ট না দেখানোর বিষয়ে তিনি কিছু জানেন না বলে দাবি করেন। এদিকে, ভাটারার গুরুতর অসুস্থ প্রবীণ বাসিন্দা নাছির উদ্দিন একটি হত্যাচেষ্টা মামলা থেকে নিজের নাম প্রত্যাহারের জন্য ডিএমপি কমিশনারের কার্যালয়ে লিখিত আবেদন করেছেন। গত ১৮ জুলাইয়ের একটি ঘটনায় দায়ের হওয়া ৯২ নম্বর মামলার আসামি করা হয়েছে তাকে, অথচ ঘটনার দিন তিনি বা তার পরিবারের কেউ ওই এলাকায় ছিলেন না।

ভুক্তভোগীদের অভিযোগ, court থেকে জামিন পাওয়ার পরও কারাগার থেকে বের হতে ৫ ধাপের জটিল প্রক্রিয়া পার হতে হয়। থানায় ঘুসের টাকা না দিলে কোনো-না-কোনো ধাপে ফাইল আটকে রাখা হয় এবং এই সুযোগে অন্য থানায় নতুন মামলা সাজিয়ে শ্যোন অ্যারেস্ট দেখানো হয়। ঢাকার শাহজাহানপুর এলাকার এক মাংস ব্যবসায়ী জানান, জামিন পাওয়ার পরও জেলগেট থেকে বের হওয়ার আগে তাকে আরও তিনটি মামলায় শ্যোন অ্যারেস্ট দেখানো হয়। পরে আইনজীবীর মাধ্যমে পুলিশকে বড় অঙ্কের টাকা দিয়ে তিনি মুক্তি পান। একইভাবে, সিলেটের দুই যুবক গত ২ জুলাই পেশাগত কাজে ঢাকায় এসে শপিংমল এলাকা থেকে গ্রেফতার হন। আন্দোলনের সময় তারা সিলেটে থাকলেও রামপুরা থানার এক হত্যা মামলায় তাদের আসামি করা হয়। দুই মাস কারাভোগের পর জামিন মিললেও অন্য মামলায় শ্যোন অ্যারেস্ট ঠেকাতে পুলিশকে বড় অঙ্কের টাকা দেওয়া হয়। তবুও তাদের অন্য মামলায় গ্রেফতার দেখানো হলে ক্ষুব্ধ পরিবার পরবর্তীতে সেই টাকা ফেরত নেয়।

এই পরিস্থিতি নিয়ে পুলিশ সদর দপ্তরের কর্মকর্তারা বলছেন, সুনির্দিষ্ট অভিযোগ ও প্রমাণ পেলে কোনো পুলিশ সদস্যকে ছাড় দেওয়া হবে না এবং ইতোমধ্যে কিছু অসাধু সদস্যের বিরুদ্ধে বিভাগীয় ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে। পুলিশের ডিআইজি (ক্রাইম ম্যানেজমেন্ট) মোহাম্মদ আবু সুফিয়ান জানান, জুলাই আন্দোলনের মামলাগুলো নিয়ে শুরুতে বাদীরা এক ধরনের বাণিজ্য করেছিল, যা পুলিশের নজরে আসার পর বন্ধ করা হয়েছে। ঝুলে থাকা মামলাগুলোর তদন্ত দ্রুত শেষ করার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে এবং মাঠপর্যায়ে তদন্তকাজে গতি এসেছে বলেও তিনি উল্লেখ করেন।