বেসামরিক বিমান চলাচল কর্তৃপক্ষের (বেবিচক) কর্মকর্তাদের একটি বিদেশ সফরকে কেন্দ্র করে নজিরবিহীন জিও (সরকারি আদেশ) জালিয়াতির ঘটনা ঘটেছে। কম্পিউটারভিত্তিক প্রশিক্ষণ ব্যবস্থা (সিবিটি) ল্যাব আধুনিকীকরণ প্রকল্পের পণ্য পরীক্ষার (এফএটি) জন্য যুক্তরাষ্ট্রে যাওয়ার তালিকায় কর্তৃপক্ষের চেয়ারম্যানের অনুমোদিত নাম বাদ দিয়ে যুক্ত করা হয়েছে এমন এক কর্মকর্তার নাম, যার নাম প্রাথমিক নথিতেই ছিল না। কার নির্দেশে বা কোন কর্তৃপক্ষের অনুমোদনে এই পরিবর্তন করা হয়েছে, সরকারি নথিপত্রে তার কোনো ব্যাখ্যা মেলেনি। এই ঘটনাকে কেন্দ্র করে বেবিচকের ভেতরে তীব্র তোলপাড় ও ক্ষোভের সৃষ্টি হয়েছে।

সংশ্লিষ্ট নথি অনুযায়ী, হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের নিরাপত্তা জোরদারসংক্রান্ত এই সফরের জন্য গত ৩০ জুলাই বেবিচক চেয়ারম্যান এয়ার ভাইস মার্শাল মো. মোস্তফা মাহমুদ সিদ্দিক একটি স্মারকপত্রে তিন কর্মকর্তার নাম সুপারিশ করেছিলেন। ওই তালিকার ১ নম্বরে প্রতিনিধি দলের প্রধান হিসেবে ছিলেন বেবিচকের সদস্য (প্রশাসন) অতিরিক্ত সচিব এসএম লাবলুর রহমান। অন্য দুই সদস্য ছিলেন পরিচালক মো. আব্দুল্লাহ কায়সার এবং শাহজালাল বিমানবন্দরের উপপরিচালক স্কোয়াড্রন লিডার এসএম তানজিল আহসান। তবে গত ২০ সেপ্টেম্বর বেসামরিক বিমান পরিবহন ও পর্যটন মন্ত্রণালয় থেকে জারি করা চূড়ান্ত জিওতে দেখা যায়, লাবলুর রহমানের নাম বাদ দিয়ে সেখানে বেবিচকের সিভিল অ্যান্ড ইলেকট্রো-মেকানিক্যাল সার্ভিসেস ইউনিটের (সেমসু) নির্বাহী পরিচালক মো. আবদুল ওয়াদুদের নাম যুক্ত করা হয়েছে।

এ বিষয়ে ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশের (টিআইবি) নির্বাহী পরিচালক ড. ইফতেখারুজ্জামান যুগান্তরকে বলেন, মূল প্রস্তাব এবং চূড়ান্ত জিওর মধ্যে যদি কোনো অমিল থাকে, তবে দেখতে হবে এই পরিবর্তনের পেছনে কার নোট রয়েছে। দাপ্তরিক তথ্যের ধারাবাহিকতা রক্ষা না হওয়াকে প্রশাসনিক শৃঙ্খলা ভঙ্গের চরম দৃষ্টান্ত হিসেবে উল্লেখ করে তিনি বলেন, এ ধরনের খেয়ালখুশি পরিবর্তনের ঘটনায় প্রশাসনিকভাবে তদন্ত করে দ্রুত ব্যবস্থা নেওয়া উচিত।

চূড়ান্ত জিওতে স্বাক্ষরকারী বেসামরিক বিমান ও পর্যটন মন্ত্রণালয়ের উপসচিব মো. নুরুল হুদা এ বিষয়ে যুগান্তরকে বলেন, মন্ত্রণালয় যেভাবে নাম পেয়েছে, সে অনুযায়ীই জিও জারি করা হয়েছে। তবে নথিপত্র টেম্পারিং ও রদবদলের সুনির্দিষ্ট প্রক্রিয়া সম্পর্কে জানতে চাইলে তিনি কোনো সদুত্তর না দিয়ে বলেন, "এর বেশি কিছু বলতে পারব না।"

সরকারি নিয়ম অনুযায়ী যে কোনো সরকারি বিদেশ সফরের আগে জিও জারি করার বাধ্যবাধকতা থাকলেও এই ক্ষেত্রে ঘটেছে আরেকটি বড় অসঙ্গতি। বেবিচকের প্রস্তাবিত সূচি অনুযায়ী প্রতিনিধি দলটির যুক্তরাষ্ট্রে সফরের কথা ছিল ২০২৬ সালের ৮ থেকে ১৪ সেপ্টেম্বর। অথচ মন্ত্রণালয় থেকে চূড়ান্ত জিওটি জারি করা হয়েছে সফর শেষ হওয়ার প্রায় এক সপ্তাহ পর, ২০ সেপ্টেম্বর। নির্ধারিত সময় পার হওয়ার পর কেন এই আদেশ জারি করা হলো, তা নিয়ে প্রশাসনিক ও আইনি মহলে বড় ধরনের প্রশ্ন উঠেছে।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক বেবিচকের এক ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা জানান, চেয়ারম্যানের সই করা ফাইল মন্ত্রণালয়ে পাঠানোর পর তা ফেরত এসেছিল এবং পরে দেখা যায় যে মূল তালিকার একজনকে বাদ দিয়ে সম্পূর্ণ নতুন একজনের নামে জিও জারি করা হয়েছে। নিয়ম অনুযায়ী, চেয়ারম্যানের সুপারিশকৃত তালিকায় কোনো পরিবর্তন আনতে হলে সংশ্লিষ্ট সংস্থাকে অবহিত করে প্রয়োজনীয় অনুমোদন নিতে হয়, যা এই ক্ষেত্রে মানা হয়নি। এই ঘটনায় বেবিচক চেয়ারম্যান অত্যন্ত ক্ষুব্ধ হয়েছেন। বিমান পরিবহনমন্ত্রী বর্তমানে বিদেশে অবস্থান করছেন এবং তিনি দেশে ফিরলে বিষয়টি আনুষ্ঠানিকভাবে তার কাছে তুলে ধরা হবে বলে জানা গেছে।

অভিযোগের বিষয়ে জানতে চাইলে সেমসু-র নির্বাহী পরিচালক মো. আবদুল ওয়াদুদ যুগান্তরকে বলেন, "কীভাবে আমার নাম এসেছে তা আমি জানি না।" তবে তিনি দাবি করেন, চেয়ারম্যান সুপারিশ করলেই যে সেই নাম চূড়ান্ত হতে হবে এমন কোনো বাধ্যবাধকতা নেই; মন্ত্রণালয় চাইলে অধীনস্থ প্রতিষ্ঠান থেকে অন্য কাউকেও মনোনীত করতে পারে।

বিশেষজ্ঞ ও কর্মকর্তাদের মতে, আইকাও-এর নিরাপত্তা নিরীক্ষা, বিমানবন্দরের নিরাপত্তা ও বিস্ফোরক শনাক্তকরণ ব্যবস্থার মতো অত্যন্ত সংবেদনশীল ও কারিগরি প্রকল্পের ফ্যাক্টরি একসেপ্টেন্স টেস্টের (এফএটি) জন্য প্রতিনিধি নির্বাচনের ক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তার কাজের সামঞ্জস্য থাকা জরুরি। এমন একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রকল্পের প্রতিনিধি দল গঠনে এই ধরনের অস্পষ্টতা ও অস্বচ্ছতা পুরো প্রক্রিয়াটির জবাবদিহিতা ও প্রশাসনিক অখণ্ডতাকে বড় ধরনের প্রশ্নের মুখে দাঁড় করিয়েছে।