ত্রয়োদশ সংসদ নির্বাচনের আগে স্বাক্ষরিত ‘জুলাই সনদ’ বাস্তবায়নের প্রক্রিয়া নিয়ে অন্তর্বর্তী সরকারের পর গঠিত নতুন সরকার ও বিরোধী দলগুলোর মধ্যে চরম বিরোধ তৈরি হয়েছে। সংবিধান সংশোধনের লক্ষ্যে জাতীয় সংসদে বিশেষ কমিটি গঠন করেছে সরকারি দল বিএনপি। তবে বিরোধী দল ও জোটগুলো এই কমিটিকে প্রত্যাখ্যান করে সংবিধান সংস্কার পরিষদের মাধ্যমে জুলাই সনদের পূর্ণ বাস্তবায়ন দাবি করছে। তাদের মতে, নির্বাচনের দিন গণভোটে পাওয়া জনগণের রায়কে পাশ কাটিয়ে কেবল সংসদীয় কমিটির মাধ্যমে সংবিধান সংশোধন করা যাবে না। এই দ্বিমুখী অবস্থানের কারণে সংবিধান সংশোধন নাকি গণভোটের রায়ের ভিত্তিতে সংস্কার—তা নিয়ে সরকার ও বিরোধীরা এখন মুখোমুখি অবস্থানে।

এর আগে অন্তর্বর্তী সরকারের সময় দীর্ঘ আলোচনার পর ২৬টি রাজনৈতিক দল ও জোটের স্বাক্ষরে ‘জুলাই জাতীয় সনদ’ প্রণীত হয়েছিল। ২০২৫ সালের ১৩ই নভেম্বর রাষ্ট্রপতি মো. সাহাবুদ্দিন ‘জুলাই জাতীয় সনদ (সাংবিধানিক সংস্কার) বাস্তবায়ন আদেশ’ জারি করেন, যার মাধ্যমে সংবিধান সংশোধনের প্রয়োজনীয় বিষয়ে গণভোটের আইনি কাঠামো নির্ধারিত হয়। বিভিন্ন কমিশনের কাজ শেষে মোট ৮৪টি বিষয়ে রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে ঐকমত্য হয়, যার মধ্যে ৪৮টির জন্য সংবিধান সংশোধন প্রয়োজন। এই ৪৮টি বিষয়ের মধ্যে মাত্র ৯টিতে নোট অব ডিসেন্ট বা আপত্তি জানিয়েছিল বিএনপি। পরবর্তীতে সংসদ নির্বাচনের দিনই এই বিষয়ে গণভোট অনুষ্ঠিত হয় এবং সেখানে ‘হ্যাঁ’ জয়ী হয়। সনদের শর্তানুযায়ী, গণভোটের রায়ের পর ত্রয়োদশ সংসদের সদস্যদের নিয়ে ‘সংবিধান সংস্কার পরিষদ’ গঠন করে ১৮০ কার্যদিবসের মধ্যে সংস্কার কাজ শেষ করার বাধ্যবাধকতা ছিল।

তবে নির্বাচনের পর বিএনপি সরকার গঠন করলেও সংবিধান সংস্কার পরিষদ গঠন করেনি এবং দলটির সংসদ সদস্যরাও সংস্কার পরিষদের সদস্য হিসেবে শপথ নেননি। এর পরিবর্তে গত ১৩ই জুলাই জাতীয় সংসদে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদকে সভাপতি করে ১২ সদস্যের ‘সংবিধান সংশোধন-সম্পর্কিত বিশেষ কমিটি’ গঠন করা হয়। এই কমিটিতে বিরোধী দল থেকে পাঁচজন প্রতিনিধির নাম চাওয়া হলেও তারা তা দিতে অস্বীকৃতি জানায়। এর আগে গত ২৯শে এপ্রিল বিএনপি ১৭ সদস্যের একটি বিশেষ সংসদীয় কমিটির প্রস্তাব দিয়েছিল, যেখানে ৭ জন বিএনপি, ৫ জন অন্যান্য দল এবং ৫ জন বিরোধী দল থেকে নেওয়ার কথা বলা হয়েছিল। ওই প্রস্তাবে সিদ্ধান্তের জন্য জামায়াতে ইসলামী সময় চেয়েছিল, কিন্তু পরে গত ১৬ই জুন সংসদের এলডি হলে এক বক্তব্যে জামায়াতের আমীর ডা. শফিকুর রহমান স্পষ্ট জানিয়ে দেন যে, তারা সংবিধান সংশোধনের বিশেষ কমিটিতে কোনো প্রতিনিধি দেবেন না। তিনি বলেন, জনগণের দাবি ছিল সংবিধান সংস্কার এবং সেজন্যই গণভোট হয়েছে। তাই সংশোধন নয়, সংস্কারের জন্য কমিটি করা হলে তারা তা বিবেচনা করবেন।

এদিকে গত ২০শে সেপ্টেম্বর সংসদীয় বিশেষ কমিটির বৈঠক শেষে কমিটির সভাপতি ও স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ জানান, জুলাই জাতীয় সনদের সুপারিশ ও সংবিধান সংশোধনী বাস্তবায়নের কাজ দ্রুত এগিয়ে নেওয়া হচ্ছে। আগামী ডিসেম্বরের মধ্যেই যাবতীয় আলোচনা শেষ করে সংসদে চূড়ান্ত প্রতিবেদন দেওয়া হবে। সংবিধান সংস্কার পরিষদ গঠন না করার বিষয়ে প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, একটি প্রতিষ্ঠিত ও স্বাধীন রাষ্ট্রে নতুন করে সংবিধান পুনর্লিখন বা সংস্কার পরিষদ গঠনের প্রয়োজন পড়ে না। সংসদীয় নিয়মে যেকোনো সংশোধনী গ্রহণ করাই এক ধরনের সংস্কার।

সরকারের এই অবস্থানের বিপরীতে জামায়াতে ইসলামীর নেতৃত্বাধীন বিরোধী দলগুলো শুরু থেকেই এই বিশেষ কমিটিকে প্রত্যাখ্যান করে আসছে। গত ২০শে সেপ্টেম্বর রাজনৈতিক দলগুলোর সঙ্গে বিশেষ কমিটির মতবিনিময় সভায় জামায়াতসহ ১১টি দল অংশ নেয়নি। ওইদিন এক সংবাদ সম্মেলনে জামায়াতের সেক্রেটারি জেনারেল মিয়া গোলাম পরওয়ার বলেন, জনগণের ভোটে যে সাংবিধানিক ম্যান্ডেট দেওয়া হয়েছে, সেটিকে পাশ কাটিয়ে কোনো বিকল্প প্রক্রিয়াকে জনগণের রায়ের সমতুল্য বিবেচনা করা যায় না। জামায়াতের সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল এডভোকেট এহসানুল মাহবুব জুবায়ের সংবাদমাধ্যমকে বলেন, দীর্ঘদিন ধরে সংস্কার নিয়ে আলোচনা হয়েছে এবং গণভোটে ৭০ শতাংশ মানুষ সংস্কারের পক্ষে রায় দিয়েছেন। এখন সেই রায় কার্যকর না করে সংবিধান সংশোধনের জন্য কমিটি করার কোনো ভিত্তি বা প্রয়োজনীয়তা নেই।

বিশেষ কমিটির দ্বিতীয় বৈঠকে সনদের সই করা ২৬টি দল ও জোটের প্রতিনিধিদের আমন্ত্রণ জানানো হলেও জামায়াত, এনসিপিসহ ১১টি দল তাতে অংশ নেয়নি। অন্যদিকে, সনদের সই না করা চার বামপন্থি দল—সিপিবি, বাসদ, বাংলাদেশ জাসদ ও বাসদ (মার্কসবাদী)-কে এই মতবিনিময়ে আমন্ত্রণই জানানো হয়নি। জামায়াত জোট থেকে বের হওয়া খেলাফত মজলিসও সংস্কারের দাবিতে অনড় থেকে বৈঠকে যায়নি। রাষ্ট্রসংস্কার আন্দোলন জানিয়েছে, তারা বৈঠকে গিয়ে সংবিধান সংশোধন নয়, বরং গণভোটের ফল অনুযায়ী সংস্কারের দাবি জানাবে। আর জেএসডি জানিয়েছে, বিএনপি গণভোটকে অস্বীকার করায় তারা এই কমিটির বৈঠকে অংশ নেবে না।

এনসিপি’র নীতিনির্ধারণী ফোরামের সদস্য ও মিডিয়া উপ-কমিটির প্রধান সারোয়ার তুষার সংবাদমাধ্যমকে বলেন, সংবিধান সংস্কার পরিষদ গঠন না করে কেন এই সংশোধন কমিটি করা হচ্ছে এবং কেনই বা বিরোধী দল সেখানে নাম দেবে? আগের পুরো প্রক্রিয়া লঙ্ঘন করে এই কমিটি গঠন করায় তারা এর সাথে থাকতে পারেন না। তিনি সতর্ক করে বলেন, সরকার যদি এককভাবে এটি করতে চায় তবে করতে পারবে, কিন্তু এর কোনো নৈতিক বৈধতা বা লেজিটিমেসি থাকবে না। গণভোটের রোডম্যাপ অনুযায়ী সংবিধান সংস্কারের কাজ করা হলে তারা শতভাগ সহযোগিতা করবেন।