প্রকাশ : ২৬ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ০৬: ৫৩

মানিকগঞ্জের শিবালয়, দৌলতপুর ও হরিরামপুর উপজেলার দুর্গম চরাঞ্চলের সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়গুলোতে শিক্ষা কার্যক্রম মারাত্মকভাবে ব্যাহত হচ্ছে। শিক্ষক সংকট, যাতায়াতের চরম দুর্ভোগ, আবাসন সমস্যা, নদীভাঙন, দুর্বল মোবাইল নেটওয়ার্ক এবং অভিভাবকদের অসচেতনতার কারণে চরাঞ্চলের এই প্রাথমিক শিক্ষাব্যবস্থা কার্যত মুখ থুবড়ে পড়েছে। দীর্ঘদিন ধরে এসব সমস্যা জিইয়ে থাকলেও তা সমাধানে এখন পর্যন্ত কোনো দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা নেওয়া হয়নি।

সংশ্লিষ্ট উপজেলাগুলোর চরাঞ্চল হিসেবে পরিচিত শিবালয়ের আলোকদিয়া, মধ্যনগর, গঙ্গাপ্রসাদ, ত্রিশুণ্ডি; দৌলতপুরের বাগুটিয়া, চরকাটারি, বাচামারা এবং হরিরামপুরের আজিমনগর, লেছড়াগঞ্জ ও সুতালড়ি এলাকায় এই সংকট সবচেয়ে প্রকট। এই তিন উপজেলায় মোট ৫৭টি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় রয়েছে, যার মধ্যে হরিরামপুরে ১৩টি, শিবালয়ে ৫টি এবং দৌলতপুরে ৩৯টি। বিদ্যালয়গুলোতে মোট ২৩৫ জন শিক্ষক কর্মরত আছেন—হরিরামপুরে ৪৯ জন, শিবালয়ে ১৭ জন এবং দৌলতপুরে ১৬৯ জন। তবে সুতালড়ি রামচন্দ্রপুর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের কার্যক্রম বর্তমানে সম্পূর্ণ বন্ধ রয়েছে। বাকি বিদ্যালয়গুলোর বেশিরভাগেই শিক্ষক সংকট তীব্র, যার মধ্যে আটটি বিদ্যালয়ে কোনো প্রধান শিক্ষকই নেই।

দুর্গম যাতায়াত ব্যবস্থার কারণে শিক্ষকেরা এসব বিদ্যালয়ে যেতে চান না। নদীভাঙন ও নৌকার ওপর নির্ভরশীলতার কারণে বর্ষাকালে পরিস্থিতি আরও কঠিন হয়ে দাঁড়ায়। সমতল থেকে প্রতিদিন ইঞ্জিনচালিত নৌকায় চড়ে শিক্ষকদের পদ্মা নদী পার হতে হয়। অনেক শিক্ষককে প্রতিদিন ২০ থেকে ২৫ কিলোমিটার পথ পাড়ি দিয়ে বিদ্যালয়ে পৌঁছাতে দুই থেকে আড়াই ঘণ্টা সময় ব্যয় করতে হয়। নৌযান সংকট, অতিরিক্ত ভাড়া এবং মাঝিদের স্বেচ্ছাচারিতার কারণে শিক্ষকদের ভোগান্তি নিত্যদিনের সঙ্গী।

যাতায়াতের পেছনে শিক্ষকদের বেতনের একটি বড় অংশ চলে যায়। এনায়েতপুর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সহকারী শিক্ষক আরমান আলী নিজের অভিজ্ঞতা জানিয়ে বলেন, ‘যাতায়াতে প্রতিদিন প্রায় দুই ঘণ্টা সময় চলে যায়। খরচ হয় প্রায় ৩০০ টাকা। বর্ষায় সময় ও খরচ দুটোই বেড়ে যায়। কিন্তু এ জন্য আমাদের কোনো ভাতা নেই।’ চরাঞ্চলে দায়িত্ব পালনের জন্য কোনো বিশেষ যাতায়াত সুবিধা বা দুর্গম ভাতা না থাকায় শিক্ষকেরা চরম আর্থিক ও মানসিক চাপে থাকেন। দীর্ঘ যাতায়াতের ক্লান্তি তাদের শারীরিক সক্ষমতাও কমিয়ে দেয়।

শুধু শিক্ষক সংকটই নয়, শিক্ষার্থীদের উপস্থিতির হার নিয়েও উদ্বেগ রয়েছে। চরের অধিকাংশ পরিবার কৃষিকাজ ও দিনমজুরির ওপর নির্ভরশীল হওয়ায় অনেক অভিভাবক সন্তানদের নিয়মিত স্কুলে পাঠানোর চেয়ে গৃহস্থালি বা চাষের কাজে নিয়োজিত করাকে বেশি গুরুত্ব দেন। এছাড়া চরে শিক্ষকদের থাকার কোনো আবাসন ব্যবস্থা নেই, যা বিশেষ করে নারী শিক্ষকদের জন্য বড় ধরনের নিরাপত্তা ও যাতায়াত সংকট তৈরি করে। মোবাইল নেটওয়ার্কের দুর্বলতার কারণে শিক্ষকেরা দুর্যোগের সময় পরিবার বা বিদ্যালয় কর্তৃপক্ষের সাথে যোগাযোগ করতে পারেন না, যা বাড়তি উৎকণ্ঠার কারণ হয়ে দাঁড়ায়।

চরাঞ্চলের শিক্ষকদের বদলি প্রক্রিয়াও অত্যন্ত জটিল। একবার নিয়োগ পেলে বছরের পর বছর একই বিদ্যালয়ে কাজ করতে হয়, ফলে অন্যত্র বদলি হতে না পেরে অনেক শিক্ষকের মধ্যে চরম হতাশা তৈরি হচ্ছে। এই সামগ্রিক সংকটের বিষয়ে মানিকগঞ্জ জেলা প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তা গকুল চন্দ্র দেবনাথ জানান, সমস্যা সমাধানে পরিকল্পনা তৈরির কাজ চলছে। জেলা উন্নয়ন ও সমন্বয় সভায় বিষয়টি নিয়ে আলোচনা হয়েছে এবং এটি চূড়ান্ত হলে ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের কাছে পাঠানো হবে। অন্যদিকে জেলা প্রশাসক নাজমুন সুলতানা জানিয়েছেন, চরে শিক্ষকদের আবাসন ব্যবস্থার কথা ভাবা হচ্ছে এবং কর্মস্থলে থেকে দায়িত্ব পালনের কোনো বিকল্প নেই।