২০২৪ সালের ৫ আগস্ট বাংলাদেশে যে ঐতিহাসিক পরিবর্তন ঘটেছিল, তা নিয়ে বিভিন্ন মহলে নানা বিভ্রান্তি রয়েছে। কেউ একে গণঅভ্যুত্থান বলছেন, কেউ বলছেন বিপ্লব, আবার কেউ কেউ একে একই সাথে গণঅভ্যুত্থান ও বিপ্লব—উভয় নামেই অভিহিত করছেন। এমনকি অনেক বিদগ্ধ ব্যক্তিও তাদের বক্তব্য ও লেখায় এ নিয়ে বিভ্রান্তি তৈরি করছেন, যার ফলে সাধারণ মানুষও দ্বিধাদ্বন্দ্বে ভুগছেন। ইতিহাস, তথ্য ও যুক্তির আলোকেই এই বিশ্লেষণটি করেছেন বিশিষ্ট আইনজীবী ও সংবিধান বিশেষজ্ঞ ব্যারিস্টার নাজির আহমদ।

গণঅভ্যুত্থান মূলত সাধারণ মানুষের স্বতঃস্ফূর্ত গণজোয়ারের মাধ্যমে গড়ে ওঠা একটি আন্দোলন, যা কোনো শাসক বা সরকারের পতন ঘটায়। এতে রাজপথে জনতার ঢল এবং পুঞ্জীভূত ক্ষোভের এক অভূতপূর্ব বিস্ফোরণ দেখা যায়। দীর্ঘদিনের রাজনৈতিক নিপীড়ন, অর্থনৈতিক বৈষম্য, ব্যাপক দুর্নীতি ও অবৈধ উপায়ে ক্ষমতা আঁকড়ে রাখার প্রতিক্রিয়ায় যখন সাধারণ নাগরিকরা রাজপথে নেমে আসে, তখনই তা গণঅভ্যুত্থানের রূপ নেয়। সহজ ভাষায় এটি হলো ক্ষমতা বদলের এক তীব্র বিস্ফোরণ। গণঅভ্যুত্থানের প্রধান বৈশিষ্ট্যগুলোর মধ্যে রয়েছে ব্যাপক জনসম্পৃক্ততা (People’s Mass Participation), তাৎক্ষণিক অসন্তোষের দ্রুত বিস্তার, বিদ্যমান ব্যবস্থার প্রতিরোধ এবং যৌথ নেতৃত্ব (Shared leadership)। এর মূল উপাদানগুলোর মধ্যে রয়েছে যৌথ সামাজিক পরিচয় (Shared Social Identity), নির্দিষ্ট দাবি বা ইশতেহার (যেমন ১৯৬৯ সালের ছাত্রদের ১১ দফা), ক্ষোভের বৈধতা এবং একটি অনুঘটক বা ট্রিগার পয়েন্ট।

গণঅভ্যুত্থান সম্পর্কে মিশরীয় প্রো-ডেমোক্রেসি মুভমেন্টের নেতা ওয়ায়েল ঘনিম (Wael Ghonim) বলেছিলেন, “The power of the people is much stronger than the people in power” (অর্থাৎ “ক্ষমতাসীনদের চেয়ে জনগণের শক্তি অনেক বেশি শক্তিশালী”)। গণঅভ্যুত্থানের মূল শক্তি হলো জনগণের এই ঐক্যবদ্ধতা, যা সরকারের পতন নিশ্চিত করে। একইভাবে আমেরিকার সামাজিক ও রাজনৈতিক নেতা অ্যাবি হফম্যান (Abbie Hoffman) বলেন, “When the people stand up, the government has to sit down” (অর্থাৎ “জনগণ যখন রুখে দাঁড়ায়, তখন সরকারকে পিছু হটে”)।

১৯৬৯ সালের গণঅভ্যুত্থান, যার ফলে আইয়ুব খানের পতন ঘটে এবং পরবর্তীতে স্বাধীন “বাংলাদেশ” নামক রাষ্ট্রের জন্ম হয়।১৯৯০ সালের গণঅভ্যুত্থান, যা প্রেসিডেন্ট এরশাদের প্রায় এক দশকের স্বৈরশাসনের অবসান ঘটায়।২০১০-২০১১ সালের আরব বসন্ত, যার মাধ্যমে তিউনিসিয়া, মিশর, লিবিয়াসহ মধ্যপ্রাচ্যের একাধিক দেশে একনায়কতন্ত্রের পতন ঘটেছিল। can be seen on the other side, বিপ্লব হলো সমাজ ব্যবস্থার কাঠামোগত ও মৌলিক পরিবর্তন। এটি কেবল সরকার বা শাসক বদল করে না, বরং পুরো সিস্টেম বা রাষ্ট্রব্যবস্থাকেই বদলে দেয়। প্রচলিত শাসনব্যবস্থা বা সামাজিক কাঠামো ভেঙে সম্পূর্ণ নতুন একটি ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠার উদ্দেশ্যে বিপ্লব সংঘটিত হয়। বিপ্লবের পেছনে থাকে দীর্ঘমেয়াদী আদর্শ, সুনির্দিষ্ট পরিকল্পনা ও কাঠামোগত রূপান্তর। রাজনৈতিক বিপ্লব ছাড়াও সামাজিক ও শিল্প ক্ষেত্রেও বিপ্লব হতে পারে, যেমন শিল্প বিপ্লব বা कृषि বিপ্লব। বিপ্লবের প্রধান উপাদানগুলো হলো ব্যাপক জন-অসন্তুষ্টি (People’s Mass Frustration), বিকল্প বৈপ্লবিক আদর্শ ও দৃষ্টিভঙ্গি (Alternative Revolutionary Ideology), নেতৃত্ব ও বিপ্লবী সংগঠন (Leadership and Revolutionary organisation), শাসকগোষ্ঠীর সংকট ও দুর্বলতা (State Crisis) এবং গণঅভ্যুত্থান ও সংহতি (Mass Mobilisation)। এর প্রধান বৈশিষ্ট্যগুলোর মধ্যে রয়েছে আমূল পরিবর্তন (Radical Change), জনগণের ব্যাপক অংশগ্রহণ, দ্রুত রূপান্তর (Rapid Transition), সহিংসতার উপস্থিতি বা সম্ভাবনা এবং সুদূরপ্রসারী প্রভাব (Farsighted Impact)।

আমূল পরিবর্তনের বিষয়ে মার্কিন দার্শনিক গ্রেস লি বগস (Grace Lee Boggs) লিখেছেন, “Revolution is about the need to evolve, not just a desire to protest” (অর্থাৎ “বিপ্লব মানে বিবর্তিত হওয়ার প্রয়োজনীয়তা, কেবল প্রতিবাদ করার আকাঙ্ক্ষা নয়”)। বিপ্লব নিজে নিজে ঘটে না, একে সংগঠিত করতে হয়। কিউবার বিপ্লবের মহানায়ক চে গুয়েভারার ভাষায়, “The revolution is not an apple that falls when it is ripe. You have to make it fall” (অর্থাৎ “বিপ্লব এমন কোনো আপেল নয়, যা পেকে গেলেই নিজে থেকে নিচে পড়ে যায়; একে নিচে নামিয়ে আনতে হয়”)।

১৭৮৯ সালের ফরাসি বিপ্লব, যা ফ্রান্সের রাজতন্ত্র ও সামন্তবাদের অবসান ঘটিয়ে প্রজাতন্ত্র প্রতিষ্ঠা করে।১৯১৭ সালের রুশ বিপ্লব, যেখানে বলশেভিকদের নেতৃত্বে জার শাসনের অবসান ঘটিয়ে সমাজতান্ত্রিক সরকার প্রতিষ্ঠিত হয়।১৯৭৯ সালের ইরানি বিপ্লব, যা ইরানকে একটি ইসলামি প্রজাতন্ত্রে রূপান্তরিত করে।১৯১১ সালের চীন বিপ্লব (সিনহাই বিপ্লব), যার মাধ্যমে চীনের দীর্ঘদিনের রাজবংশের অবসান ঘটেছিল।উপরোক্ত তথ্য, ইতিহাস ও উদাহরণগুলো পর্যালোচনা করলে দেখা যায় যে, ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট বাংলাদেশে একটি স্বতঃস্ফূর্ত গণঅভ্যুত্থান সংঘটিত হয়েছিল। কারণ গণঅভ্যুত্থানের সব উপাদান ও বৈশিষ্ট্য এতে পুরোপুরি বিদ্যমান ছিল। কিন্তু একে বিপ্লব বলা কঠিন, কারণ বিপ্লবের অন্যতম প্রধান দুটি উপাদান—বৈপ্লবিক সংগঠন ও নেতৃত্ব এবং আমূল পরিবর্তন—এখানে অনুপস্থিত ছিল। ৫ আগস্টের গণঅভ্যুত্থানে কোনো একক নেতৃত্ব বা বিপ্লবী সংগঠন ছিল না। জুলাই গণঅভ্যুত্থানের পর দেশ ও সমাজের কোনো কাঠামোগত বা আমূল পরিবর্তন ঘটেনি এবং এমন কোনো আলামতও দেখা যাচ্ছে না। ৫ আগস্টের মাধ্যমে শেখ হাসিনার ১৫ বছরের দীর্ঘ স্বৈরশাসন ও ফ্যাসিবাদের অবসান ঘটলেও রাষ্ট্রকাঠামোর মৌলিক পরিবর্তন হয়নি। বিপ্লবের জন্য যে দীর্ঘমেয়াদী পরিকল্পনা এবং তা বাস্তবায়নের জন্য বিপ্লবী সংগঠন ও নেতৃত্ব প্রয়োজন, তার কোনোটিই এখানে ছিল না।

তবে এটি নিঃসন্দেহে একটি স্বতঃস্ফূর্ত গণঅভ্যুত্থান ছিল। সরকারি চাকরিতে কোটা পদ্ধতিকে কেন্দ্র করে গড়ে ওঠা বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলন অত্যন্ত দ্রুততার সাথে সরকার পতনের এক দফা দাবিতে রূপ নেয়। সেই আন্দোলনে দল, মত ও ধর্ম নির্বিশেষে সর্বস্তরের মানুষ রাজপথে নেমে এসেছিল। এই বিশ্লেষণের লেখক নাজির আহমদ একজন বিশিষ্ট আইনজীবী, সংবিধান বিশেষজ্ঞ, রাষ্ট্রচিন্তক এবং ইংল্যান্ডের প্র্যাকটিসিং ব্যারিস্টার। তার ইমেইল ঠিকানা: [email protected]

আমেরিকার সামাজিক ও রাজনৈতিক নেতা Abbie Hoffman—এর ভাষায় “When the people stand up, the government has to sit down” (অর্থাৎ “জনগণ যখন রুখে দাঁড়ায়, তখন সরকারকে পিছু হটে”।)ইতিহাসের পাতায় কয়েকটি গণঅভ্যুত্থানের উদাহরণ: (১) ১৯৬৯ সালের গণঅভ্যুত্থান যার ফলে আইয়ুব খানের পতন ঘটে এবং অল্পদিনের মধ‍্যে স্বাধীন “বাংলাদেশ” নামে নতু

ইতিহাসে বিপ্লবের কয়েকটি উদাহরণ: (১) ফরাসি বিপ্লব (১৭৮৯)- এটি ফ্রান্সের রাজতন্ত্র এবং সামন্তবাদের অবসান ঘটিয়ে প্রজাতন্ত্র প্রতিষ্ঠা করে, (২) রুশ বিপ্লব (১৯১৭)-বলশেভিকদের নেতৃত্বে রাশিয়ায় জার শাসনের অবসান ও সমাজতান্ত্রিক সরকার প্রতিষ্ঠা, (৩) ইরানি বিপ্লব (১৯৭৯)-এই বিপ্লব ইরানকে ইসলামি প্রজাতন্ত্রে পরিণত করে, (৪) চীন বি