রাজধানী ঢাকায় চিহ্নিত চাঁদাবাজদের বেপরোয়া তৎপরতা আশঙ্কাজনকভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে। ঢাকা মহানগর পুলিশের (ডিএমপি) এক সাম্প্রতিক পরিসংখ্যানে ঢাকার বিভিন্ন এলাকায় সক্রিয় ১ হাজার ২৮০ জন চাঁদাবাজের তালিকা তৈরি করা হয়েছে। এই তালিকার মধ্যে ১৪৮ জনই অস্ত্রধারী সন্ত্রাসী হিসেবে চিহ্নিত। শুধু তাই নয়, এসব অপরাধীদের আশ্রয় ও প্রশ্রয়দাতা হিসেবে তালিকায় নাম এসেছে আরও ৩১৪ জনের। পুলিশ জানিয়েছে, এই তালিকায় প্রতিনিয়ত নতুন নতুন নাম যুক্ত হচ্ছে।

চলতি বছরের জানুয়ারি থেকে আগস্ট পর্যন্ত মাত্র আট মাসে ঢাকা মহানগরের ৫০টি থানার মধ্যে ৪৯টিতেই চাঁদাবাজির অভিযোগে ৭২৩টি মামলা হয়েছে। এর মধ্যে সবচেয়ে বেশি মামলা রেকর্ড হয়েছে মোহাম্মদপুর থানায়। এরপরই রয়েছে যাত্রাবাড়ী ও ডেমরা থানা। দায়ের হওয়া ৭২৩টি মামলার মধ্যে ৪২৫টির তদন্ত শেষে আদালতে প্রতিবেদন জমা দিয়েছে পুলিশ, যা মোট মামলার প্রায় ৪১ শতাংশ এখনও তদন্তাধীন রয়েছে। গত ২০ মাসের নথি পর্যালোচনা করে দেখা গেছে, মহানগরে চাঁদাবাজির ৩৬৫টি মামলায় চার্জশিট দেয়া হয়েছে, যার মধ্যে ৮৫ শতাংশ মামলায় আসামিদের বিরুদ্ধে অভিযোগের সত্যতা প্রমাণিত হয়েছে। বাকি ১৫ শতাংশ মামলায় অভিযোগের সত্যতা মেলেনি।

আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সূত্রগুলো বলছে, ফুটপাথ, হাসপাতাল, কাঁচাবাজার, শপিংমল, মুদির দোকান থেকে শুরু করে বাড়ির মালিক, বেসরকারি অফিস, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও কলকারখানা থেকেও নিয়মিত চাঁদা আদায় করা হচ্ছে। প্রাণনাশের ভয়ে অনেক ভুক্তভোগীই থানায় অভিযোগ বা মামলা করতে সাহস পান না। আর যারা মামলা করছেন, তারাও বিচার প্রক্রিয়ার দীর্ঘসূত্রতার কারণে দ্রুত প্রতিকার পাচ্ছেন না। অনেক ক্ষেত্রে চার্জশিট দাখিলের পরও বিচার শুরু হতে দেরি হওয়ায় আসামিরা জামিনে মুক্ত হয়ে যান অথবা উচ্চ আদালত থেকে মামলার কার্যক্রম স্থগিত করে নেন।

গোয়েন্দা তথ্যানুযায়ী, ঢাকার এই বেপরোয়া চাঁদাবাজির নেপথ্যে রয়েছে বিদেশে পলাতক শীর্ষ সন্ত্রাসী ও স্থানীয় রাজনৈতিক প্রভাবশালী নেতাদের একচ্ছত্র আধিপত্য। চিহ্নিত মূল চাঁদাবাজরা সরাসরি সামনে না এসে কিশোর গ্যাং সদস্যদের হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করছে। বিদ্যমান আইনে ১৮ বছর বয়স পর্যন্ত শিশু হিসেবে গণ্য করায় অপরাধ করেও সহজে পার পেয়ে যাচ্ছে এই কিশোররা। তাদের গ্রেপ্তার করা হলে আদালতে শিশু বিবেচনায় জামিনের আবেদন করা হয় এবং অনেক ক্ষেত্রে তারা জামিন পেয়েও যায়।

এই বিষয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করে অ্যাটর্নি জেনারেল ব্যারিস্টার রুহুল কুদ্দুস কাজল জানান, যেকোনো অপরাধে দ্রুত বিচার সাময়িক স্বস্তি দিলেও দীর্ঘমেয়াদি সুফল বয়ে আনে না। ১৮ বছর বয়সে একজন কিশোর পুরোপুরি পরিণত হয়ে ওঠে। বর্তমানে কিশোর গ্যাং সদস্যরা এই বয়সের আইনি সুবিধার অপব্যবহার করছে। তাই তিনি শিশু আইনের বয়সসীমা কমিয়ে আনার পরামর্শ দেন।

পুলিশের তালিকায় থাকা অস্ত্রধারী চাঁদাবাজদের বড় অংশই গুলশান, বাড্ডা ও রামপুরা এলাকায় সবচেয়ে বেশি সক্রিয়। গোয়েন্দা সূত্রে জানা গেছে, গুলশান, মহাখালী, বাড্ডা, রামপুরা ও মগবাজার এলাকায় পেশাদার সন্ত্রাসী গ্রুপগুলোর মধ্যে জিসান গ্রুপের সদস্য সংখ্যা সবচেয়ে বেশি। বিদেশে বসে জিসান এই অপরাধ চক্র পরিচালনা করছে। জিসান গ্রুপের অস্ত্রধারী চাঁদাবাজদের তালিকায় রয়েছে শামীম, জাকির হোসেন, আবুল বাশার বাদশা, কায়সার ওরফে গলাকাটা কায়সার, মহারাজ মিয়া, শফিকুল ইসলাম হেলাল, তানভীর, আরিফ হোসেন রিপন, আবু সাঈদ রাসেল, কাওসার মোল্লা ওরফে কানা কাওসার, সায়মন, বরিশাইল্যা শান্ত, নাহিদ, মামুন, রাব্বী, মিনহাজ, আরিফ ওরফে পিস্তল আরিফ এবং শুভ ওরফে ঘাতক শুভ। এছাড়া তালিকার বাইরেও এই গ্রুপে আশিক, মাহবুব, বাদল, মগবাজারের পিঙ্কু, গোড়ানের সুজন ও রামপুরার শাহজাদার নাম রয়েছে।

যুক্তরাষ্ট্রে অবস্থানকারী কলিং মেহেদীও দূর থেকে নিজের বাহিনী দিয়ে চাঁদাবাজি নিয়ন্ত্রণ করছে। মেহেদী বাহিনীর সদস্যদের মধ্যে রয়েছে ওয়াসির সাঈদ ওরফে বড় সাঈদ, দুলাল হোসেন, আবদুল মান্নান, মোরছালিন হায়দার বাবু, আবদুর রহমান রুবেল, সাইফুল, ইমরান, ময়লা সাঈদ, মারুফুল ইসলাম পলক, মোবিনুল ইসলাম বাঁধন, রায়হান শরীফ মানিক, সজল মিয়া, অর্ণব সাঈদ, হোসেন শাওন, তপন, রবিউল, খোকন, জিয়া, ইসমাইল, হৃদয় ওরফে চোরা হৃদয়, বুলেট বাবু, সোহেল ওরফে কান্নি সোহেল, আমির হোসেন বাবু, এসএম আমিনুল হক, তানভীর ইসলাম, নুর আলম, রনি ও হাবিবুর রহমান।

বাড্ডা এলাকায় দীর্ঘদিন ধরে সক্রিয় রবিন-ডালিম-মাহবুব গ্রুপ। এই গ্রুপের তিন প্রধানই বর্তমানে মালয়েশিয়ায় অবস্থান করে বাড্ডা এলাকার চাঁদাবাজি, দখলবাজি ও ভাড়াটে খুনি হিসেবে নিজেদের বাহিনী পরিচালনা করছে। তাদের অস্ত্রধারীরা হলো সাইমন মাসুম, আনিসুর রহমান সীমান্ত, ইকবাল হোসেন, সালাউদ্দিন সালু, শফিকুল ইসলাম, হেলাল, সাব্বির হোসেন, রুবেল, শাহ মোহাম্মদ, সালমান ও মফিজুর রহমান। বাড্ডার আরেকটি সক্রিয় গ্রুপ হচ্ছে চঞ্চল গ্রুপ, যার প্রধান চঞ্চল বর্তমানে যুক্তরাষ্ট্রে রয়েছে বলে ধারণা পুলিশের। তার গ্রুপের আরাফাত হোসেন তামীম ও সোহেল মাহমুদের নাম তালিকায় রয়েছে।

সুব্রত বাইন গ্রুপের অস্ত্রধারীদের তালিকায় রয়েছে মাহফুজুর রহমান ওরফে বিপু, আরাফাত ইব্নে নাসির, শরীফ ও মধু। এছাড়া তালিকায় নাম না আসা সহযোগীদের মধ্যে ফেন্সি বাশার, শুটার নয়ন, ড্রাইভার ওসমান ও শুটার বাপ্পী অন্যতম।

ডিএমপির তালিকায় ঢাকার অন্যান্য এলাকার অস্ত্রধারী চাঁদাবাজদের নামও উঠে এসেছে। ডেমরা এলাকায় আবুল কালাম আজাদ, মোহাম্মদ বিজয় ও মোহাম্মদ শিবলী আহমেদ খান; শ্যামপুর এলাকায় কৃষ্ণ বাবু, রাশেদ, মোহাম্মদ রাজন, সজল ও বাপ্পারাজ; ওয়ারী এলাকায় মাহিন খান, মারজান আহমেদ ওরফে ভাগনে রনি ও মো. শামীম মিয়া; কদমতলী এলাকায় মো. জাহাঙ্গীর আলম, ওয়াহিদুজ্জামান ও মোহন চাঁদ এবং কামরাঙ্গীরচর এলাকায় মো. সিদ্দিক, ফারুক আহমেদ, রহমত উল্লাহ ও শেখ আনোয়ার সক্রিয় রয়েছে। চকবাজার এলাকায় রয়েছে মো. সালাউদ্দিন ওরফে বিয়ার সালাউদ্দিন ও হাসান সারোয়ার পিলু।

সবুজবাগ এলাকায় সক্রিয় রয়েছে রিফাতুল্লাহ নাঈম, হৃদয় সরকার, মো. সাঈদ, শফিকুল ইসলাম ও নুরুন্নবী বাবু। খিলগাঁও এলাকায় মকবুল হোসেন, মিন্টু ওরফে কিলার মিন্টু, কিশোর গ্যাং লিডার আলিফ এবং শুভ ওরফে রিপন সক্রিয়। পল্টন থানায় কাজী হাসিবুর রহমান ও মুজাহিদুল ইসলাম সোহাগের নাম রয়েছে। এছাড়া শাহজাহানপুর, লালবাগ, মোহাম্মদপুর, মিরপুর ও পল্লবী এলাকার চাঁদাবাজদের নামও তালিকায় স্থান পেয়েছে। ধানমণ্ডি ও হাজারীবাগ এলাকায় শীর্ষ সন্ত্রাসী ইমন গ্রুপ এবং মোহাম্মদপুরে পিচ্চি হেলাল গ্রুপের সদস্যরা চাঁদাবাজিতে জড়িত বলে পুলিশের কাছে তথ্য রয়েছে।

অপরাধ বিশেষজ্ঞরা বলছেন, চাঁদাবাজিতে প্রতিনিয়ত নতুন নতুন মুখের আগমন ঘটছে, যাদের নিয়ন্ত্রণ করছে মূলত চিহ্নিত পুরনো অপরাধীরা। সবচেয়ে বড় উদ্বেগের বিষয় হলো অস্ত্রধারী চাঁদাবাজরা, যারা অস্ত্রের ভয় দেখিয়ে নীরবে চাঁদা আদায় করে। অপরাধ বিশেষজ্ঞ ড. তৌহিদুল হক এ প্রসঙ্গে বলেন, পুলিশ দীর্ঘদিন ধরে চাঁদাবাজদের তালিকা তৈরি করে কিছু অভিযান চালাচ্ছে। কিন্তু এই অপরাধের পেছনে যারা মূল সুবিধাভোগী, তাদের তালিকা কখনোই করা হয় না। তালিকায় থাকা সবাইকে যদি আইনের আওতায় আনা সম্ভব না হয়, তবে আংশিক ব্যবস্থা নিয়ে এই পরিস্থিতি কোনোভাবেই নিয়ন্ত্রণ করা যাবে না।