দেশের পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে ভাইস চ্যান্সেলর (ভিসি) নিয়োগকে কেন্দ্র করে তৈরি হওয়া প্রশাসনিক জটিলতা ও অসন্তোষ কোনোভাবেই থামছে না। একের পর এক বিশ্ববিদ্যালয়ে ভিসি নিয়োগের পর শুরু হওয়া বিতর্ক, শিক্ষার্থীদের তীব্র আন্দোলন এবং দ্রুততম সময়ে ভিসি পরিবর্তনের মতো ঘটনা উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোতে অস্থিরতা তৈরি করেছে। এই পরিস্থিতির কারণে এখন প্রশ্ন উঠছে, বিশ্ববিদ্যালয়ের সর্বোচ্চ এই প্রশাসনিক পদে নিয়োগ দেওয়ার আগে প্রার্থীদের যোগ্যতা ও অতীত কর্মকাণ্ডের বিষয়ে কোনো সঠিক যাচাই-বাছাই করা হচ্ছে কি না। নিয়োগের পর আন্দোলন বা বিতর্কের মুখে সিদ্ধান্ত বদলানোর চেয়ে কেন আগেই তা শনাক্ত করা যাচ্ছে না, তা নিয়ে শিক্ষাঙ্গনে নানা আলোচনা চলছে।
বর্তমানে দেশের অন্তত দুটি বিশ্ববিদ্যালয়ে ভিসি নিয়োগকে কেন্দ্র করে লাগাতার আন্দোলন চলছে। এর মধ্যে চট্টগ্রাম প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ে (চুয়েট) সাবেক ভিসি অধ্যাপক ড. আবু সাদাত মুহাম্মদ সায়েমকে পুনর্বহালের দাবিতে শিক্ষার্থী, শিক্ষক ও কর্মকর্তা-কর্মচারীরা টানা আট দিন ধরে আন্দোলন করছেন। এতে চুয়েটের একাডেমিক ও প্রশাসনিক কার্যক্রম পুরোপুরি স্থবির হয়ে পড়েছে। মাত্র ৫৬ দিন দায়িত্ব পালনের পর অধ্যাপক সায়েমকে বদলি করে অধ্যাপক ড. শেখ শরিফুল আলমকে নতুন ভিসি হিসেবে নিয়োগ দেয় সরকার। তবে আন্দোলনকারীদের দাবি, আগের ভিসি অত্যন্ত দক্ষ ও চুয়েট বান্ধব ছিলেন। নতুন ভিসি বর্তমানে অনলাইনে দায়িত্ব পালন করছেন বলে জানা গেছে, যা এই সংকটের সুরাহা নিয়ে আরও অনিশ্চয়তা তৈরি করেছে।
একই ধরনের অস্থিরতা চলছে ঢাকা সেন্ট্রাল ইউনিভার্সিটিতে। সেখানে নতুন ভিসি অধ্যাপক মো. লুৎফর রহমানের নিয়োগ বাতিলের দাবিতে আন্দোলনে নেমেছেন শিক্ষার্থীরা। গত ২৬শে সেপ্টেম্বর শিক্ষা মন্ত্রণালয় জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রো-ভিসি ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের পরিসংখ্যান বিভাগের এই অধ্যাপককে ভিসি হিসেবে নিয়োগ দিয়ে প্রজ্ঞাপন জারি করে। শিক্ষার্থীরা জানান, তারা ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় সিন্ডিকেট থেকে কোনো ভিসি চান না। এই আন্দোলনের মধ্যেই রোববার তিনি বারিধারার অস্থায়ী কার্যালয়ে গিয়ে দায়িত্ব গ্রহণ করেন। উল্লেখ্য, এই বিশ্ববিদ্যালয়ে এক বছরের মধ্যে দুইবার ভিসি নিয়োগের ঘটনা ঘটল।
এদিকে, সিলেট কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়েও দীর্ঘ সময় ধরে ভিসি অধ্যাপক ড. আলিমুল ইসলামের পদত্যাগ ও অপসারণের দাবিতে আন্দোলন চলছে। আন্দোলনের অংশ হিসেবে গত ৭ই সেপ্টেম্বর বিশ্ববিদ্যালয়ের বিভিন্ন প্রশাসনিক পদ থেকে পাঁচজন শিক্ষকসহ মোট ১১ জন শিক্ষক ও কর্মকর্তা একযোগে পদত্যাগ করেন। পরবর্তীতে ভিসির পদত্যাগের দাবিতে তারা মানববন্ধন ও অবস্থান কর্মসূচিও পালন করেছেন।
নতুন সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পর বিভিন্ন পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ে ভিসি নিয়োগের ক্ষেত্রে এক ধরনের অসন্তোষ নিয়মিত চিত্র হয়ে দাঁড়িয়েছে। কোনো কোনো বিশ্ববিদ্যালয়ে নিয়োগ দেওয়ার মাত্র কয়েকদিনের মাথায় ভিসি সরিয়ে নেওয়ার ঘটনাও ঘটেছে। গত ১৪ই মে দেশের ১১টি পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ে একযোগে ভিসি নিয়োগ দেওয়া হয়েছিল। সেদিন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের মার্কেটিং বিভাগের অধ্যাপক ড. মো. আনিসুর রহমানকে বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের ভিসি হিসেবে দায়িত্ব দেওয়া হয়। কিন্তু নজিরবিহীনভাবে নিয়োগের এক ঘণ্টার মাথায় আরেকটি প্রজ্ঞাপন জারি করে সরকার তার সেই নিয়োগ বাতিল করে দেয়।
গাজীপুরের ঢাকা প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়েও (ডুয়েট) সরকার নিযুক্ত ভিসির বিরুদ্ধে শিক্ষার্থীরা তীব্র আন্দোলন গড়ে তোলেন। 'ডুয়েট ব্লকেড' কর্মসূচির আওতায় শিক্ষার্থীরা বিশ্ববিদ্যালয়ের মূল ফটকে তালা ঝুলিয়ে দেন। গত ১৪ই মে শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ড. মোহাম্মদ ইকবালকে ডুয়েটের ভিসি নিয়োগ দেওয়া হলে ক্যাম্পাস থেকেই ভিসি নিয়োগের দাবিতে আন্দোলন শুরু হয়। পরিস্থিতি এমন দাঁড়ায় যে, নতুন ভিসি যোগদানের পরও তাকে ক্যাম্পাসে ঢুকতে বাধা দেওয়া হয়। পরবর্তীতে 'নতুন ভিসিকে লাল কার্ড' কর্মসূচির জেরে শিক্ষার্থীদের দুই পক্ষের মধ্যে ধাওয়া-পাল্টা ধাওয়া ও সংঘর্ষে অন্তত ২০ জন আহত হন।
দ্রুত ভিসি পরিবর্তনের আরেকটি ঘটনা ঘটেছে গোপালগঞ্জ বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ে। গত ১৯শে জুলাই খুলনা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ড. মো. नाजমুস সাদাতকে সেখানে ভিসি হিসেবে নিয়োগ দেওয়া হয়। কিন্তু মাত্র ৩৭ দিনের মাথায় ২৫শে আগস্ট তাকে সরিয়ে নারায়ণগঞ্জ বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রথম ভিসি হিসেবে দায়িত্ব দেওয়া হয়। অন্যদিকে, জামালপুর বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ে (জাবিপ্রবি) নামের বিভ্রান্তির কারণে ২৩ দিনের মাথায় ভিসি বদলের ঘটনা ঘটে। গত ১৪ই মে জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ড. মোহাম্মদ আমির হোসেন ভূঁইয়াকে জাবিপ্রবির ভিসি করা হয় এবং তিনি দুই দিনের মধ্যে যোগদান করেন। কিন্তু ৬ই জুন শিক্ষা মন্ত্রণালয় এক নতুন প্রজ্ঞাপনে বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ড. মো. আমির হোসেনকে নতুন ভিসি নিয়োগ দেয়। সে সময় টাইপিং ভুলের কারণে এই বিভ্রান্তি তৈরি হয়েছিল বলে গুঞ্জন ওঠে।
দেশের পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে ভিসি নিয়োগের জন্য একটি সার্চ কমিটি কাজ করে। গত ১লা এপ্রিল গঠিত এই সার্চ কমিটিতে রাখা হয় শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা বিভাগের সচিব আবদুল খালেককে। এছাড়া সদস্য সচিব হিসেবে রয়েছেন মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা বিভাগের বিশ্ববিদ্যালয় শাখার অতিরিক্ত সচিব। কমিটির অন্য সদস্যরা হলেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ভিসি প্রফেসর ড. এবিএম ওবায়দুল ইসলাম, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের ভিসি প্রফেসর ড. মো. ফরিদুল ইসলাম, ইউজিসির সাবেক সদস্য প্রফেসর মোহাম্মদ তানজীমউদ্দিন খান এবং ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের মার্কেটিং বিভাগের প্রফেসর ড. মো. মোর্শেদ হাসান।
একের পর এক ভিসি নিয়োগ নিয়ে বিতর্ক ওঠায় সার্চ কমিটির কর্মপরিধি ও গোয়েন্দা তথ্যের কার্যকারিতা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন সংশ্লিষ্টরা। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একজন সাবেক ভিসি ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, নিয়োগ পাওয়ার পর তার অতীতের কিছু কর্মকাণ্ডের ছবি সামনে এনে বিতর্ক তৈরি করা হয়েছিল। তার প্রশ্ন, যদি এসব বিষয় যাচাইয়ের প্রয়োজনই ছিল, তবে তা নিয়োগের আগে কেন করা হলো না? নিয়োগ দিয়ে আবার সরিয়ে দেওয়া একজন শিক্ষকের জন্য অত্যন্ত অপমানজনক। তিনি আরও বলেন, দলীয় বিবেচনায় নিয়োগ এ দেশে নতুন নয়, তবে দলের মধ্য থেকেও যোগ্য ও গ্রহণযোগ্য ব্যক্তি খুঁজে বের করা সম্ভব। ভিসি পদ কোনো রাজনৈতিক পদ নয় এবং পপুলিস্ট বা তাৎক্ষণিক রাজনৈতিক সিদ্ধান্তের কারণে বিশ্ববিদ্যালয়ের ভাবমূর্তি নষ্ট হয়।
বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশনের (ইউজিসি) সাবেক চেয়ারম্যান অধ্যাপক ড. এ এস এম ফায়েজ বলেন, কিছু বিশ্ববিদ্যালয়ের সিদ্ধান্ত শিক্ষার্থীদের হতাশ করেছে। এসব বিষয়ে সরকারের আরও সচেতন হওয়া উচিত ছিল। তিনি মনে করেন, কোনো শিক্ষক যদি ভিসি হওয়ার জন্য লবিং করেন, তবে তিনি শুরুতেই নিজের অযোগ্যতা প্রকাশ করলেন। পরবর্তীতে কেউ লবিং করলে শুরুতেই তার আবেদন বাতিল করা উচিত। তিনি আরও বলেন, একটু আন্তরিকতার সাথে কাজ করলে হয়তো এই সমস্যাগুলো সামনে আসতো না।
সারগ্রাহী এই নিয়োগ প্রক্রিয়া সম্পর্কে সম্প্রতি এক অনুষ্ঠানে শিক্ষামন্ত্রী ড. আ ন ম এহছানুল হক মিলন বলেছিলেন, পুরো প্রক্রিয়াটি একটি নিয়মের মধ্য দিয়েই সম্পন্ন হয়। সার্চ কমিটি প্রথমে কাজ করে সুপারিশ তৈরি করে এবং পরবর্তীতে তা চ্যান্সেলরের কাছে পাঠানো হয়।