তথ্য অধিকার আইন সম্পর্কে নাগরিকদের সচেতনতা বাড়লেও আইনটি ব্যবহারের ক্ষেত্রে এখনও বড় ধরনের ঘাটতি বিদ্যমান। সম্প্রতি রাজধানীর ডেইলি স্টার ভবনে তথ্য অধিকার ফোরাম আয়োজিত এক সম্মেলনে উপস্থাপিত 'বাংলাদেশ তথ্য অধিকার জরিপ ২০২৬' প্রতিবেদনে উঠে এসেছে যে, দেশের ৭২.৪০% নাগরিক মনে করেন তাদের প্রয়োজনীয় তথ্য পাওয়ার সুযোগ নেই। ২০১৯ সালে এই হার ছিল ৬৮.৩০%।
আন্তর্জাতিক তথ্য জানার অধিকার দিবস-২০২৬ উপলক্ষে আয়োজিত এই সম্মেলনে অংশ নেন সাংবাদিক, তথ্য অধিকারকর্মী, সরকারি কর্মকর্তা এবং নাগরিক সমাজের প্রতিনিধিরা। ড. অনন্য রায়হান জরিপটি উপস্থাপন করে জানান, ২০১৯ থেকে ২০২৫ সাল পর্যন্ত নাগরিকদের তথ্যের চাহিদা, সচেতনতা এবং কর্তৃপক্ষের ভূমিকা বিশ্লেষণ করা হয়েছে। জরিপে দেখা গেছে, তথ্য অধিকার আইন সম্পর্কে সচেতনতার প্রধান উৎস হিসেবে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ভূমিকা রাখলেও নাগরিক সমাজ সংগঠনগুলোর অংশগ্রহণ সর্বনিম্ন।
তথ্য চাওয়ার ক্ষেত্রে প্রতিশোধ বা হয়রানির ভয় (ফিয়ার অব রিটালিয়েশন), প্রাতিষ্ঠানিক সক্ষমতার অভাব এবং দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তাদের লিখিতভাবে তথ্য দিতে অনীহা আইনটি ব্যবহারের বড় বাধা হিসেবে কাজ করছে। জরিপ অনুযায়ী, ২০১৯ সালে সচেতনতার হার ছিল ৭.৭%, যা ২০২৫ সালে বেড়ে ১০.৫০% হয়েছে। তবে সচেতন নাগরিকদের মধ্যেও মাত্র ৮%-এর কিছু বেশি তথ্য পাওয়ার প্রক্রিয়া জানেন এবং ৯.৩% নির্দিষ্ট সময়সীমা সম্পর্কে অবগত। তরুণদের মধ্যে এ হার প্রায় ১৮.৫০% এবং গ্র্যাজুয়েটদের মধ্যে প্রায় ৩৮%। এছাড়া আপিল কর্তৃপক্ষ সম্পর্কেও রয়েছে জ্ঞানের ঘাটতি; ৪৬% মনে করেন ইউপি চেয়ারম্যান আপিলের বিষয়টি নিষ্পত্তি করবেন, যেখানে মাত্র ১৯.৯০% সঠিকভাবে তথ্য কমিশনকে শনাক্ত করতে পেরেছেন।
এমআরডিআইয়ের নির্বাহী পরিচালক হাসিবুর রহমান জানান, তথ্য কমিশন কার্যকর না থাকায় বর্তমানে সাড়ে ৮০০-এর বেশি শুনানি আটকে আছে। তিনি নতুন কমিশন গঠনের পর দ্রুত এসব শুনানি নিষ্পত্তির পাশাপাশি কমিশনারদের পদমর্যাদা ক্যাবিনেট সচিবের ওপরে উন্নীত করার দাবি জানান। টিআইবির নির্বাহী পরিচালক ড. ইফতেখারুজ্জামান বলেন, তথ্য কমিশনকে স্বাধীন ও প্রভাবমুক্ত হতে হবে এবং এটিকে অবসরপ্রাপ্ত আমলাদের পুনর্বাসনকেন্দ্র হিসেবে ব্যবহার করা উচিত নয়।
ব্যারিস্টার সারা হোসেন জানান, মাত্র ৪৯% দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তা প্রশিক্ষিত এবং ৬৪% কর্মকর্তা কোনো তথ্যের আবেদনই পাননি। ‘মানুষের জন্য ফাউন্ডেশন’-এর (এমজেএফ) নির্বাহী পরিচালক শাহীন আনাম বলেন, ২০০৯ সালে তথ্য অধিকার আইন প্রণয়নের পর জনগণের মধ্যে তথ্য চাওয়ার আগ্রহ যতটা বাড়ার কথা ছিল, তা হয়নি। ২০১৯ সালের তুলনায় কিছুটা উন্নতি হলেও তা যথেষ্ট নয়। তিনি আইন সংস্কারের অপেক্ষায় না থেকে বিদ্যমান কমিশনকে দ্রুত কার্যকর করার ওপর জোর দেন। তথ্য কমিশন বাংলাদেশ-এর সচিব মোহাম্মদ শাহ আলম জানান, তথ্যের আধিক্যের যুগে যাচাই করা ও নির্ভরযোগ্য তথ্য পাওয়াই এখন মানুষের বড় দাবি। সরকারি দপ্তরগুলো স্বপ্রণোদিতভাবে তথ্য প্রকাশ করলে নাগরিকদের অধিকার আরও সুপ্রতিষ্ঠিত হবে বলে মন্তব্য করেন এনজিও বিষয়ক ব্যুরোর পরিচালক ড. কে. এম. মামুনুজ্জামান।