অসহায় ও আশ্রয়হীন প্রবীণ মানুষদের জন্য দেশের আটটি শহরে দৃষ্টিনন্দন আটটি ভবন নির্মাণ করা হয়েছে, যার নাম ‘শান্তিনিবাস’। প্রতিটি ভবনে প্রবীণ নাগরিকদের বসবাসের জন্য প্রয়োজনীয় সব সরঞ্জাম থাকলেও সেখানে এখন পর্যন্ত কেউ থাকেননি। বেশির ভাগ ভবন প্রায় তিন বছর ধরে অযত্ন–অবহেলায় পড়ে আছে। ভবনের ভেতরে ধুলা জমে আসবাব নষ্ট হচ্ছে, এমনকি কোথাও কোথাও দেয়ালে শেওলাও গজিয়েছে।
যে আট জেলায় শান্তিনিবাস করা হয়েছে তার মধ্যে গোপালগঞ্জ, লালমনিরহাট, সুনামগঞ্জ ও নোয়াখালীতে শুধু নারীরা থাকতে পারবেন। পুরুষদের জন্য চারটি নিবাস রয়েছে ময়মনসিংহ, রাজশাহী, খুলনা ও বরিশালে। প্রতিটি নিবাসে ২৫ জনের থাকার ব্যবস্থা রয়েছে। আটটি শান্তিনিবাস নির্মাণে মোট ব্যয় হয়েছে ৮২ কোটি টাকা। সমাজসেবা অধিদপ্তরের ওয়েবসাইটে দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, ৬০ বছরের বেশি বয়সী পরিত্যক্ত, দাবিদারহীন, দুর্দশাগ্রস্ত ও অবহেলিত প্রবীণ ব্যক্তিদের নিরাপদ আবাসনের ব্যবস্থা করতে এই কার্যক্রম নেওয়া হয়। জায়গা হিসেবে বেছে নেওয়া হয় সরকারি শিশু পরিবারগুলো, যাতে প্রবীণদের সঙ্গে সহাবস্থানের মাধ্যমে সেখানকার শিশুদের পারিবারিক আবহে বেড়ে ওঠার সুযোগ তৈরি হয়। পাশাপাশি প্রবীণদের জীবনমান উন্নয়ন এবং তাঁদের পরিচর্যা ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করা যায়।
প্রবীণদের জন্য ৮টি শান্তিনিবাস নির্মাণের প্রকল্প নেওয়া হয় ২০২০ সালের জুলাই মাসে। পরিকল্পনা মন্ত্রণালয়ের বাস্তবায়ন পরিবীক্ষণ ও মূল্যায়ন বিভাগের (আইএমইডি) নিবিড় পরিবীক্ষণ প্রতিবেদনের তথ্য অনুযায়ী, শান্তিনিবাস প্রকল্পের প্রাক্কলিত ব্যয় ছিল ৭৩ কোটি ৯৮ লাখ ৯১ হাজার টাকা। ২০২২ সালের জুনের মধ্যে কাজ শেষ হওয়ার কথা থাকলেও নানা কারণে কাজ ব্যাহত হওয়ায় প্রকল্পের মেয়াদ বাড়িয়ে ২০২৩ সালের জুন পর্যন্ত করা হয়। পাশাপাশি সংশোধিত প্রাক্কলিত ব্যয় দাঁড়ায় ৮২ কোটি ৬৯ হাজার টাকা। ২০২৩ সালের ১৪ নভেম্বর একযোগে আটটি শান্তিনিবাসের আনুষ্ঠানিকভাবে উদ্বোধন করা হয়।
সর্বশেষ জনশুমারি ও গৃহগণনা ২০২২ অনুযায়ী, দেশে ৬০ বছরের বেশি বয়সী মানুষের সংখ্যা ১ কোটি ৫৩ লাখ ২৬ হাজার ৭১৯ জন, যা মোট জনসংখ্যার ৯ দশমিক ২৮ শতাংশ। ২০১১ সালের জনশুমারিতে এ হার ছিল ৭ দশমিক ৪৭ শতাংশ। দেশের মানুষের গড় আয়ু বেড়ে যাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে প্রবীণ মানুষের সংখ্যাও বাড়ছে। জনশুমারির বিভাগভিত্তিক হিসাবে দেশে ৬০ বছরের বেশি বয়সী মানুষের সংখ্যা ঢাকা বিভাগে সবচেয়ে বেশি ৩৬ লাখ ৬ হাজার ৬৬২ জন। এরপরই চট্টগ্রাম বিভাগে আছেন ২৭ লাখ ৯৫ হাজার ৬৭৯ জন। এ ছাড়া রাজশাহী বিভাগে ২০ লাখ ৬৯ হাজার ১৬৯ জন, খুলনা বিভাগে ১৮ লাখ ৬৯ হাজার ৬১২ জন, রংপুরে ১৭ লাখ ৮১ হাজার ৭৮৯ জন, ময়মনসিংহে ১২ লাখ ৭৪ হাজার ১১১ জন, বরিশালে ৯ লাখ ৯৭ হাজার ১৮৩ জন এবং সিলেটে ৯ লাখ ১৪ হাজার ৭৩৯ জন। প্রবীণদের জন্য প্রতিবছর ১ অক্টোবর আন্তর্জাতিকভাবে দিবস পালন করা হয়, যার এবারের প্রতিপাদ্য ‘দীর্ঘ জীবনের জন্য নতুন ভাবনা’।
রাজধানীর আগারগাঁওয়ে বাংলাদেশ প্রবীণ হিতৈষী সংঘ ও জরাবিজ্ঞান প্রতিষ্ঠানে ৫০ শয্যার একটি নিবাস থাকলেও সেখানে টাকার বিনিময়ে থাকতে হয়। আটটি শান্তিনিবাস একই নকশায় নির্মিত, যেখানে পাঁচতলা ভিত্তির ওপর তিনতলা ভবন করা হয়েছে। প্রতিটি ভবনের আয়তন ১ হাজার ৬২১ বর্গমিটার। ভবনগুলোতে লিফট, অভ্যর্থনা কক্ষ, দর্শনার্থী কক্ষ, বসার জায়গা, শয্যাকক্ষ, স্বাস্থ্যসেবা কর্নার, বিনোদনের ব্যবস্থা, শরীরচর্চার কর্নার, প্রার্থনাকক্ষ, প্রশিক্ষণ কর্নার ও কফি কর্নারসহ আধুনিক নানা সুবিধা রাখা হয়েছে। সমাজসেবা অধিদপ্তরের আওতাধীন এই প্রকল্প বাস্তবায়ন করেছে গৃহায়ণ ও গণপূর্ত অধিদপ্তর। প্রতিটি ভবন নির্মাণে ছয় থেকে সাত কোটি টাকা করে খরচ হয়েছে এবং আসবাবসহ অন্যান্য সরঞ্জামের জন্য পৃথক বাজেট বরাদ্দ ছিল।
বরিশাল গণপূর্ত কার্যালয় সূত্র জানায়, প্রায় সাত কোটি টাকা ব্যয়ে তিনতলা শান্তিনিবাস ভবনের নির্মাণকাজ শেষ হয় ২০২৩ সালের জুনে। এরপর আরও প্রায় দুই কোটি টাকা ব্যয়ে নিবাসটিকে বসবাসের উপযোগী করে সমাজসেবা অধিদপ্তরের কাছে হস্তান্তর করা হয়। তবে আটটি জেলার সমাজসেবা কার্যালয়ের কর্মকর্তাদের ভাষ্যমতে, ভবন তৈরি হলেও এখন পর্যন্ত জনবল নিয়োগ হয়নি এবং প্রতিটি নিবাস চালু করার জন্য প্রয়োজনীয় বাজেট বরাদ্দও অনুমোদন হয়নি। ৮টি নিবাস চালু হলে ২০০ জন প্রবীণ ব্যক্তির থাকার সুযোগ হবে। সমাজসেবা অধিদপ্তরের মহাপরিচালক শাহ মোহাম্মদ মাহ্বুব জানান, জনবল না থাকায় শান্তিনিবাসগুলো চালু করা যায়নি, তবে গত মাসে জনবল অনুমোদন দেওয়া হয়েছে এবং অক্টোবরের মধ্যে সেগুলো চালু করা সম্ভব হবে বলে তিনি আশা করছেন।
বরিশালের শান্তিনিবাসের মেঝে, সিঁড়ি ও বারান্দায় ধুলার স্তর জমেছে, শরীরচর্চার সরঞ্জাম ও আসবাব পড়ে আছে এবং লিফটও চালু হয়নি। প্রবীণ শিক্ষাবিদ ও জেলা মহিলা পরিষদের সভাপতি অধ্যাপক শাহ সাজেদা বলেন, বিপুল ব্যয়ে ভবন নির্মাণের পর জনবলের অভাবে শান্তিনিবাস চালু না হওয়া অত্যন্ত দুঃখজনক এবং এটি সরকারের সংশ্লিষ্ট বিভাগের উদাসীনতা। রাজশাহীর শান্তিনিবাসে গত ৫ আগস্ট সিনেমার শুটিং করতে দেখা গেছে। স্থানীয় পরিচালক কর্তৃপক্ষের অনুমতি নিয়ে ভবনের নিচতলার দুটি কক্ষকে থানার ডিউটি অফিসারের কক্ষ ও কুশীলবদের বসার জায়গা হিসেবে ব্যবহার করছিলেন। ভবনের ভিত্তিফলক থেকে তৎকালীন সমাজকল্যাণমন্ত্রীর নামটি কালি দিয়ে মুছে দেওয়া হয়েছে।
গোপালগঞ্জের টুঙ্গিপাড়ায় অবস্থিত শান্তিনিবাসেও অযত্ন–অবহেলার চিত্র দেখা গেছে, যেখানে বিছানায় ময়লা জমেছে এবং নিয়মিত পরিষ্কার করা হয় না। খুলনার শান্তিনিবাসে সিঁড়ি, বারান্দা ও দেয়ালে শেওলা জমেছে, রেলিংয়ে জং ধরেছে এবং অগ্নিনির্বাপক যন্ত্রের মেয়াদ পেরিয়ে গেছে। লালমনিরহাটের শান্তিনিবাসে বৈদ্যুতিক সংযোগ বিচ্ছিন্ন রয়েছে এবং লিফট রক্ষণাবেক্ষণ চুক্তির মেয়াদ শেষ হয়েছে। সুনামগঞ্জের শান্তিনিবাসের পানির পাম্প অচল। ময়মনসিংহের শান্তিনিবাসে বৃষ্টির পানি ঢুকে আসবাব নষ্ট হচ্ছে, যে কারণে খাটের ওপর টেবিল ও আলমারি তুলে রাখা হয়েছে। নোয়াখালীর শান্তিনিবাসে বর্তমানে সরকারি শিশু পরিবারের সদস্যরা থাকছেন, কারণ বন্যার সময় তাদের নিজস্ব ভবনটি ব্যবহার অনুপযোগী হয়ে পড়েছিল। নোয়াখালীর সমাজসেবা কর্মকর্তারা ভবনের নির্মাণ মান নিয়ে অসন্তোষ প্রকাশ করেছেন, কারণ ট্রান্সফরমার কক্ষ মূল ভবনের ভেতরে স্থাপন করা হয়েছে, যা দুর্ঘটনার ঝুঁকি তৈরি করেছে।
সুশাসনের জন্য নাগরিকের (সুজন) খুলনা জেলার সাধারণ সম্পাদক কুদরত-ই-খুদা বলেন, জনবল কাঠামো ও পরিচালনার বরাদ্দ ছাড়া প্রকল্প গ্রহণ প্রমাণ করে যে প্রকল্প প্রণয়নকারীদের আগ্রহ ছিল শুধু টাকা খরচ করে ভবন নির্মাণে, যা দুর্নীতির সুযোগ তৈরি করে। লালমনিরহাট সরকারি শিশু পরিবারের উপতত্ত্বাবধায়ক মোছা. হাওয়া খাতুন গত ১১ নভেম্বর জেলা প্রশাসককে চিঠি দিয়ে ভবন ও আসবাবের ক্ষতির কথা জানিয়েছেন। লালমনিরহাট সদরের সত্তরোর্ধ্ব আছিয়া খাতুন জানান, তাঁর থাকার সুব্যবস্থা নেই এবং শান্তিনিবাস চালু হলে তিনি জীবনের শেষ দিনগুলো সেখানে কাটাতে চান।
লিফট অপারেটিং (রক্ষণাবেক্ষণ) চুক্তির মেয়াদ শেষ হয়েছে।জেলা সমাজসেবা কার্যালয় সূত্র বলছে, ৮ কোটি ১ লাখ ৪১ হাজার ৩২৯ টাকায় ভবনটি নির্মাণ করা হয়েছে।
২০২৪ সালের বন্যার সময় শিশু পরিবারের জরাজীর্ণ ভবনের ভেতরে পানি ঢুকে সেটি সম্পূর্ণ ব্যবহার অনুপযোগী হয়ে পড়ে।