চলতি ২০২৬ সালের প্রথমার্ধে বাংলাদেশ ও চীনের মধ্যকার দ্বিপক্ষীয় বাণিজ্য রেকর্ড ১২.৮ বিলিয়ন মার্কিন ডলারে পৌঁছেছে। এটি আগের বছরের একই সময়ের তুলনায় ১০.৬ শতাংশ বেশি। ঢাকায় অবস্থিত চীনা দূতাবাস এক বিবৃতিতে এই তথ্য জানিয়েছে।
বৃহস্পতিবার (১ অক্টোবর) গণপ্রজাতন্ত্রী চীন প্রতিষ্ঠার ৭৭তম বার্ষিকী উপলক্ষে দেওয়া এক বিবৃতিতে দূতাবাস দুই দেশের মধ্যে বাণিজ্য, বিনিয়োগ, অবকাঠামো ও স্বাস্থ্যসেবা খাতে ক্রমবর্ধমান সহযোগিতার চিত্র তুলে ধরে। বিবৃতিতে উল্লেখ করা হয়, ২০১০ থেকে ২০২৫ সাল পর্যন্ত টানা ১৬ বছর ধরে চীন বাংলাদেশের বৃহত্তম বাণিজ্যিক অংশীদার হিসেবে নিজের অবস্থান বজায় রেখেছে।
দুই দেশের বাণিজ্যের সম্প্রসারণে বাংলাদেশের তাজা আম ও কাঁঠালসহ বিভিন্ন কৃষি পণ্য চীনা বাজারে প্রবেশের সুযোগ পেয়েছে। এর পাশাপাশি পেয়ারা ও সুগন্ধি চালের বাজার সুবিধা নিশ্চিত করতেও বর্তমানে প্রচেষ্টা চলছে। বাংলাদেশের রপ্তানি সক্ষমতা বৃদ্ধি এবং দ্বিপক্ষীয় বাণিজ্যের কাঠামো উন্নয়নের লক্ষ্যে উভয় দেশ যৌথ কর্মপরিকল্পনা বাস্তবায়ন করছে বলে জানিয়েছে দূতাবাস।
বাণিজ্যিক সম্পর্কের পাশাপাশি বাংলাদেশে চীনা বিনিয়োগের পরিমাণও উল্লেখযোগ্য হারে বাড়ছে। ২০২৬ সালের জুন পর্যন্ত বাংলাদেশে চীনের পুঞ্জীভূত বিনিয়োগের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে প্রায় ৩.৬ বিলিয়ন মার্কিন ডলারে। এর মধ্যে ২০২৫ সালে বাংলাদেশে চীনের প্রত্যক্ষ বিনিয়োগ আগের বছরের তুলনায় প্রায় ৫০ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়েছে। এছাড়া দেশে নতুন সরকার গঠনের পর থেকে চীনের বিনিয়োগকৃত পাঁচটি প্রতিষ্ঠান বাংলাদেশে ১০০ মিলিয়ন মার্কিন ডলারেরও বেশি বিনিয়োগ করেছে, যার মাধ্যমে প্রায় ২০ হাজার মানুষের কর্মসংস্থান সৃষ্টি হয়েছে।
শিল্প খাতের উন্নয়নে ২০২৬ সালের জুলাই মাসে চট্টগ্রামে আনুষ্ঠানিকভাবে ‘চীন অর্থনৈতিক ও শিল্প অঞ্চল’ চালু করা হয়েছে। এই অঞ্চলটি ইতিমধ্যে মোট ৫০০ মিলিয়ন মার্কিন ডলার বিনিয়োগের আগ্রহ আকর্ষণ করতে সক্ষম হয়েছে। এখানে মূলত বস্ত্র ও তৈরি পোশাক, যন্ত্রপাতি উৎপাদন, ইলেকট্রনিক্স ও তথ্যপ্রযুক্তি, বায়োমেডিসিন এবং সবুজ শক্তি শিল্পের বিকাশের ওপর বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে।
অবকাঠামো খাতে সহযোগিতার ক্ষেত্রে পদ্মা সেতুকে একটি বড় মাইলফলক হিসেবে উল্লেখ করেছে চীনা দূতাবাস। চীনা কোম্পানির নির্মিত এই সেতুটি ঢাকার সঙ্গে দক্ষিণ-পশ্চিম বাংলাদেশের ২১টি জেলার সরাসরি সংযোগ স্থাপন করেছে। ধারণা করা হচ্ছে, এই সেতুটি দেশের বার্ষিক জিডিপি প্রবৃদ্ধিতে ১.২৩ শতাংশীয় পয়েন্ট অবদান রাখবে এবং দারিদ্র্যের হার ০.৮৪ শতাংশ কমিয়ে আনবে। এছাড়া চীনা কোম্পানিগুলো বাংলাদেশে কয়লাভিত্তিক, সৌর ও বায়ুবিদ্যুৎ প্রকল্প বাস্তবায়ন করেছে, যার সম্মিলিত উৎপাদন ক্ষমতা ১ হাজার মেগাওয়াটের বেশি।
বর্তমানে চীন-সহায়তাপুষ্ট বেশ কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ প্রকল্পের নির্মাণকাজ চলমান রয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের বার্ন ইউনিট এবং বাংলাদেশ-চীন মৈত্রী সেতু-৬-এর সংস্কারকাজ। এছাড়া একটি সাধারণ হাসপাতাল, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে নারীদের আবাসিক হল, বাংলাদেশ-চীন মৈত্রী সেতু-৯ এবং একটি জরুরি ব্যবস্থাপনা কেন্দ্রসহ অন্যান্য প্রকল্পের কাজও দ্রুত এগিয়ে চলেছে।
স্বাস্থ্যসেবা ও মানবিক সহায়তার ক্ষেত্রেও চীন গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে বাংলাদেশকে ৪ মিলিয়ন মার্কিন ডলারেরও বেশি মূল্যের সহায়তা দিয়েছে দেশটি। এই সহায়তার আওতায় ছিল ডেঙ্গু ও কোভিড-১৯ শনাক্তকরণ কিট, ওষুধ, বার্ন চিকিৎসার জন্য ভেন্টিলেটর, রোবোটিক পুনর্বাসন সরঞ্জাম এবং বন্যা-ত্রাণ সামগ্রী। পাশাপাশি ১ হাজার শয্যাবিশিষ্ট একটি জেনারেল হাসপাতাল নির্মাণ এবং চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের বার্ন ইউনিট প্রকল্পেও সহায়তা দিয়েছে চীন। দূতাবাস জানিয়েছে, এই উদ্যোগগুলো বাংলাদেশের প্রতি চীনের সমর্থন এবং এ দেশের জনগণের স্বাস্থ্য ও কল্যাণ সুরক্ষায় দেশটির প্রতিশ্রুতিরই প্রতিফলন।