৫ আগস্টের রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর চট্টগ্রামে কিশোর গ্যাংয়ের পৃষ্ঠপোষকতায় বড় ধরনের বদল এসেছে। আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর আত্মগোপনে গেছেন অনেক ‘বড় ভাই’। তবে তাদের আশ্রয়ে থাকা কিশোর গ্যাংয়ের সদস্যরা এখন বিএনপি ও এর অঙ্গসংগঠনের নেতাদের ছত্রছায়ায় যাওয়ার চেষ্টা করছে। ফলে রাজনৈতিক আশ্রয় বদলালেও কমেনি কিশোর গ্যাংয়ের উৎপাত।
এর একটি বড় উদাহরণ ১৬টি মামলার আসামি মো. মুরাদ। আওয়ামী লীগের আমলে তিনি নগর যুবলীগের আহ্বায়ক ও সাবেক সংসদ সদস্য মহিউদ্দিন বাচ্চুর আশ্রয়ে বাকলিয়ায় কিশোর গ্যাং চালাতেন। তবে ক্ষমতার পরিবর্তনের পর তাঁকে নগর যুবদলের সাংগঠনিক সম্পাদক এমদাদুল হক ওরফে বাদশার সঙ্গে মিছিল-সমাবেশে অংশ নিতে দেখা গেছে। নিজের ফেসবুক আইডিতে মুরাদ নিজেকে চান্দগাঁও থানা যুবদলের সংগঠক হিসেবেও পরিচয় দিচ্ছেন। তাঁর বিরুদ্ধে কিশোর গ্যাং দিয়ে অস্ত্রবাজি, জায়গা দখল ও মাদক ব্যবসা নিয়ন্ত্রণের অভিযোগ রয়েছে। গত রোববার বাকলিয়ায় মাদক ব্যবসার নিয়ন্ত্রণ নিয়ে তাঁর লোকজনের সঙ্গে প্রতিপক্ষের সংঘর্ষ ও গোলাগুলি হয়। অবশ্য পরদিন এক বিবৃতিতে নগর যুবদল এবং এমদাদুল হক দুজনেই মুরাদকে নিজেদের দলের লোক হিসেবে অস্বীকার করেছেন।
পুলিশ ও স্থানীয় বাসিন্দাদের মতে, মুরাদ একা নন; সাবেক সরকারি দলের বিভিন্ন নেতার আশ্রয়ে থাকা কিশোর গ্যাংয়ের অনেক সদস্যই এখন বিএনপি ও এর অঙ্গসংগঠনের নেতাকর্মীদের সঙ্গে যোগাযোগ গড়ে তুলেছে। নগর বিএনপির সদস্যসচিব নাজিমুর রহমান বিষয়টি স্বীকার করে বলেন, আওয়ামী লীগ আমলের কিছু কিশোর গ্যাং সদস্য এখন বিএনপির অঙ্গসংগঠনের কিছু নেতাকর্মীর সঙ্গে থাকছে, যা দলের ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ন করছে। যারা তাদের আশ্রয় দিচ্ছে, তাদের সতর্ক করা হচ্ছে বলেও তিনি জানান।
পুলিশের তথ্য অনুযায়ী, চট্টগ্রাম নগরের অন্তত ৪৫টি এলাকায় কিশোর গ্যাংয়ের দৌরাত্ম্য রয়েছে। এর মধ্যে সম্প্রতি ১১টি গ্যাংয়ের নাম সবচেয়ে বেশি আলোচনায় এসেছে। এগুলো হলো—মুরাদপুর এলাকার এমবিএস (মোহাম্মদপুর বয়েজ সিন্ডিকেট), পাঁচলাইশের কেবি (খতিবের হাট), এনএস (নাজিরপাড়া), ৯৯৯, এক্স-মার্ক, ব্যাকহোল, ডট গ্যাং, বিঙ্গু, পাইথন, সেভেন স্টার ও ফাইভ স্টার। গত সাড়ে সাত বছরে চট্টগ্রাম নগরে কিশোর গ্যাংয়ের সম্পৃক্ততায় অন্তত ৬৩৫টি অপরাধের ঘটনা ঘটেছে, যার মধ্যে ৩৯টিই খুনের মামলা।
সম্প্রতি মাত্র দুই দিনের ব্যবধানে নগরের দুটি এলাকায় কিশোর গ্যাংয়ের গোলাগুলি ও হত্যার ঘটনা ঘটেছে। গত মঙ্গলবার খুলশীর পাহাড়তলী ওয়্যারলেস কলোনিতে ‘ফাইভ স্টার’ ও ‘সেভেন স্টার’ গ্যাংয়ের দ্বন্দ্বে খুন হয় ১৬ বছর বয়সী কিশোর মো. হৃদয়, যে তার দৃষ্টিপ্রতিবন্ধী বাবার সঙ্গে ফুটপাতে সবজি বিক্রি করত। চট্টগ্রাম মহানগর পুলিশ (সিএমপি) কমিশনার হাসান মো. শওকত আলী এ প্রসঙ্গে বলেন, পুলিশের একার পক্ষে কিশোর গ্যাং নিয়ন্ত্রণ সম্ভব নয়। political নেতাদেরও কিশোর গ্যাং সদস্যদের কাছে ভিড়তে দেওয়া উচিত নয়।
চট্টগ্রামে কিশোর গ্যাংয়ের পৃষ্ঠপোষকতায় আরেক আলোচিত নাম ওয়াকিল হোসেন ওরফে বগা। অস্ত্র, মাদক ও চাঁদাবাজিসহ ২৩টি মামলার আসামি বগাকে গত ৮ জুন নগর স্বেচ্ছাসেবক দলের যুগ্ম আহ্বায়কের পদ থেকে বহিষ্কার করা হয়। স্থানীয়দের অভিযোগ, মঙ্গলবার রাতে হৃদয় হত্যার ঘটনায় অভিযুক্ত ‘সেভেন স্টার’ গ্যাংয়ের সঙ্গে ওয়াকিলের যোগাযোগ রয়েছে। ওয়াকিলের কিশোর গ্যাং বাহিনীর ভয়ে এলাকার মানুষ আতঙ্কিত। গত ২৯ আগস্ট ওয়াকিলের বাহিনীর হাতে মারধরের শিকার হন পাহাড়তলী ডিগ্রি কলেজের শিক্ষক মিজানুর রহমান। তিনি ওয়াকিল ও তাঁর সহযোগীদের বিরুদ্ধে মামলা করেছেন। বর্তমানে পলাতক থাকায় ওয়াকিলের বক্তব্য পাওয়া যায়নি, তবে তাঁর ভাই রকি হোসেন সব অভিযোগ অস্বীকার করেছেন।
কিশোর গ্যাংয়ের সঙ্গে মাদক ব্যবসার যোগসূত্র ক্রমশ বাড়ছে। নগরের শতাধিক মাদক বিক্রির স্পটে কিশোরদের ব্যবহার করা হচ্ছে। এমনকি পুলিশের অভিযানে বাধা দিতেও তাদের ব্যবহার করা হয়। গত আট মাসে মাদকবিরোধী অভিযানে পুলিশের ওপর হামলার অন্তত পাঁচটি ঘটনা ঘটেছে। এর মধ্যে গত ২৫ জুলাই ডবলমুরিংয়ের আমবাগানে মাদক মামলার আসামিকে ধরতে গিয়ে ছুরিকাঘাতে গুরুতর আহত হন এসআই মবিনুল ইসলাম এবং তাঁর ওয়াকিটকিসহ সরঞ্জাম ছিনিয়ে নেওয়া হয়। স্পেশাল রেসপন্স ব্যাটালিয়নের (এসআরবি-৭) চট্টগ্রামের অধিনায়ক লেফটেন্যান্ট কর্নেল মোস্তাফিজুর রহমান জানান, মাদকের সঙ্গে কিশোর গ্যাংয়ের গভীর সংযোগ রয়েছে। মাদকাসক্ত হয়ে অনেকেই প্রথমে চুরি-ছিনতাই এবং পরে গ্যাংয়ের অপরাধে জড়িয়ে পড়ছে।
চট্টগ্রামে কিশোর গ্যাং নিয়ে বড় পরিসরে আলোচনা শুরু হয় ২০১৮ সালে স্কুলছাত্র আদনান ইসফার হত্যার পর। ২০১৯ সালে পুলিশ ৪৮ জন পৃষ্ঠপোষক বা ‘বড় ভাই’-এর তালিকা করে। ২০২৪ সালের মার্চে তালিকায় আরও ১৬ জনের নাম যুক্ত হয়। এসব পৃষ্ঠপোষকের আশ্রয়ে প্রায় ২০০টি গ্যাংয়ে অন্তত ১ হাজার ৪০০ সদস্য সক্রিয় ছিল। এরপর তালিকা আর হালনাগাদ না হলেও বর্তমানে গ্যাং ও সদস্য সংখ্যা আরও বেড়েছে বলে ধারণা পুলিশের।
এদিকে কিশোর অপরাধের মামলাগুলোর বিচারেও রয়েছে দীর্ঘসূত্রতা। বর্তমানে চট্টগ্রামে ১ হাজার ৬২৩টি কিশোর অপরাধের মামলা বিচারাধীন। সাক্ষী হাজির না হওয়ায় অনেক মামলার বিচার শেষ হচ্ছে না। ২০১৮ সালের আদনান ইসফার হত্যা মামলাটি এখনো দ্রুত বিচার ট্রাইব্যুনালে চলছে; এর ২৬ সাক্ষীর মধ্যে মাত্র ১৭ জনের সাক্ষ্য নেওয়া হয়েছে এবং সাত আসামিই জামিনে আছেন। এছাড়া গত বছরের হালিশহরে কলেজছাত্র ওয়াহিদুল হক ওরফে সাব্বির হত্যা এবং গত এপ্রিলের চকবাজারে কলেজছাত্র আশফাক কবির সাজিদ হত্যা মামলা এখনো তদন্তাধীন। সুজন চট্টগ্রামের সম্পাদক আখতার কবির চৌধুরী বলেন, শুধু গ্যাং সদস্যদের গ্রেপ্তার করে সমাধান হবে না। যারা তাদের আশ্রয় দিয়ে নিজেদের স্বার্থে ব্যবহার করে, সেই ‘বড় ভাই’দেরও আইনের আওতায় আনতে হবে। তা না হলে কেবল ‘বড় ভাই’ বদলাবে, কিন্তু কিশোর গ্যাংয়ের অবসান হবে না।