সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ফেসবুকে দত্তক নেওয়ার আড়ালে গড়ে উঠেছে শিশু কেনাবেচার এক বিশাল অবৈধ বাজার। বিভিন্ন গ্রুপে প্রকাশ্যেই দর-কষাকষি করে বিক্রি করা হচ্ছে নবজাতক। 'ইমার্জেন্সি একটা ছেলে বাচ্চা দেওয়া হবে, বয়স ৬ মাস, ডিমান্ড ২ লাখ টাকা, লোকেশন চট্টগ্রাম'—এমনই এক বিজ্ঞপ্তির দেখা মেলে ফেসবুকে 'সন্তান দত্তক দেওয়া-নেওয়া হয়' নামের একটি গ্রুপে। প্রতারকদের দূরে থাকার সতর্কবার্তা দিয়ে পোস্টদাতা লিখেছেন, ৫০ হাজার বা ১ লাখ টাকা যাঁরা চাইছেন, তাঁরা আসলে বাচ্চা দেবেন না। এই যুক্তি খাড়া করে গত ১৩ সেপ্টেম্বর তিনি সম্ভাব্য ক্রেতাদের উদ্দেশে লিখেছেন, ‘এটা ১০০% (100%) রিয়েল পোস্ট, সবকিছু বুঝেশুনে তারপর নক দিবেন।’

ফেসবুকে এমন বহু গ্রুপ সক্রিয় রয়েছে। যেমন ‘বাচ্চা দত্তক নেওয়া এবং দেওয়ার গ্রুপ’-এর সদস্যসংখ্যা পাঁচ হাজারের বেশি। গত জুনে ‘দত্তক দেওয়া ও নেওয়া/চাইল্ড অ্যাডপশন’ নামের আরেকটি গ্রুপে এক বিক্রেতা 'বিশেষ অফারে' ছেলে শিশু দত্তক দেওয়ার বিজ্ঞাপন দেন। এমনকি শিশু মায়ের গর্ভে থাকা অবস্থাতেই অনলাইনে কেনাবেচার চুক্তি সম্পন্ন করার প্রক্রিয়া চলে। গত ১২ আগস্ট থেকে ১৬ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত প্রথম আলোর ফ্যাক্টচেকার মো. সোহাগ মিয়ার সহায়তায় ৩৯টি পাবলিক গ্রুপ পর্যালোচনা করে দেখা গেছে, কোনো কোনো গ্রুপের সদস্যসংখ্যা প্রায় ২০ হাজার। বেশির ভাগের সদস্যসংখ্যা কয়েক শ, তবে প্রায় ২০ হাজার সদস্যের গ্রুপও আছে। আমরা এক ডজন গ্রুপের ২৮৮টি (288) পোস্ট খুঁটিয়ে পর্যালোচনা করেছি।

অনুসন্ধানের স্বার্থে ছদ্মবেশে ও সরাসরি পরিচয় দিয়ে কয়েকটি গ্রুপে যুক্ত হয়ে তথ্য সংগ্রহ করা হয়। দেখা গেছে, মেয়েশিশুর চেয়ে ছেলেশিশুর চাহিদা ও দাম অনেক বেশি। এই প্রক্রিয়ায় প্রতারণার ঘটনাও ঘটছে অহরহ। কুষ্টিয়ার আবদুল আলিম নামের এক ভুক্তভোগী জানান, তিনি একটি নবজাতক নেওয়ার জন্য হোয়াটসঅ্যাপে ভিডিও কলে বাচ্চা দেখে অগ্রিম ১০ হাজার টাকা বিকাশ করার পর গ্রুপ ও নম্বর সবই ব্লক করে দেওয়া হয়। তিনি তিনবার এভাবে প্রতারিত হয়েছেন।

এই চক্রের সঙ্গে জড়িত এক নারী দালালের সন্ধান পাওয়া গেছে। তিনি জানান, বিভিন্ন হাসপাতাল থেকে সন্তান লালন-পালনে অনিচ্ছুক গর্ভবতী নারীদের খোঁজ পান তারা। প্রসব পর্যন্ত ওই নারীর সব খরচ বহন করে চক্রটি। এরপর ছেলে নবজাতক তিন লাখ এবং মেয়ে নবজাতক দুই লাখ টাকায় বিক্রি করা হয়, যেখান থেকে দালালেরা কমিশন পান। এছাড়া কিছু গ্রুপে শুক্রাণু দান, সারোগেসি বা গর্ভদান এবং যৌনসেবা দেওয়ার প্রস্তাবও দেখা গেছে।

চট্টগ্রামে দুই লাখ টাকায় ৬ মাসের ছেলে শিশু বিক্রির পোস্টটির সূত্র ধরে যোগাযোগ করা হলে এক নারী নিজেকে নরসিংদীর বাসিন্দা দাবি করে এক লাখ টাকা চান। তিনি জানান, তার স্বামী চলে গেছেন এবং আরেকটি সন্তান থাকায় তিনি এই শিশুটি রাখতে পারছেন না। তিনি শিশুর ছবি ও টিকার কার্ড পাঠান, যেখানে বাবার নাম লেখা ছিল রাকিব হাসান এবং ঠিকানা গাজীপুরের কাপাসিয়া। অন্যদিকে, 'কাদের কাদের' নামের একজন নিজের দেড়-দুই বছর বয়সী সন্তানের ছবি দিয়ে স্ত্রীর দেনমোহর পরিশোধের জন্য সাড়ে তিন লাখ টাকায় তাকে বিক্রির বিজ্ঞাপন দিয়েছেন।

ফেসবুকের বাইরেও প্রাতিষ্ঠানিক উপায়ে এই ব্যবসা চলছে। ঢাকার যাত্রাবাড়ীতে অবস্থিত 'আল-বোখারি কেয়ারগিভিং সার্ভিসেস লিমিটেড' নামের একটি অফিসে গিয়ে দেখা যায়, তারা আইইউআই, আইভিএফ ও সারোগেসির পাশাপাশি 'আইনগত অভিভাবকত্ব' পাইয়ে দেওয়ার কাজ করছে। প্রতিষ্ঠানের ব্যবস্থাপনা পরিচালক মো. আবদুল আহাদ জানান, তারা দুই পক্ষের মধ্যে সমঝোতা চুক্তি করিয়ে দেন এবং ৩৫ থেকে ৫০ হাজার টাকা ফি নেন। সিজারিয়ান খরচসহ সব মিলিয়ে ক্রেতার প্রায় দুই লাখ টাকা খরচ হয়। এরপর কম্পিউটারের দোকান থেকে নোটারি করিয়ে শিশু হস্তান্তর করা হয়।

বাংলাদেশে সবার জন্য প্রযোজ্য কোনো সাধারণ দত্তক আইন নেই। মুসলিম পারিবারিক আইনে দত্তকের বিধান নেই, তবে পারিবারিক আদালতের মাধ্যমে অভিভাবকত্ব নেওয়া যায়। হিন্দু, বৌদ্ধ ও খ্রিস্টানরা ধর্মীয় নিয়মে দত্তক নিতে পারেন। ২০১৩ সালের শিশু আইন অনুযায়ী কেবল সমাজসেবা অধিদপ্তরের ছোটমণি নিবাসের শিশুদের আদালতের মাধ্যমে অভিভাবকত্ব দেওয়ার বৈধ সুযোগ রয়েছে। আজিমপুর ছোটমণি নিবাসের সাবেক উপতত্ত্বাবধায়ক জুবলি বেগম জানান, নিঃসন্তান দম্পতিদের যেকোনো উপায়ে সন্তান পাওয়ার ব্যাকুলতাকে পুঁজি করেই এই চক্রগুলো সক্রিয় হচ্ছে।

অবসরপ্রাপ্ত সিনিয়র জেলা ও দায়রা জজ ফউজুল আজিম বলেন, এসব বিজ্ঞাপন মূলত শিশু পাচার ও শোষণের ঝুঁকি তৈরি করছে। ১৮৬০ সালের দণ্ডবিধির ৩৭২ ও ৩৭৩ ধারা এবং ২০২৬ সালের মানব পাচার ও অভিবাসী চোরাচালান প্রতিরোধ ও দমন আইনে অসৎ উদ্দেশ্যে দত্তক নেওয়াকে কঠোর শাস্তিমূলক অপরাধ হিসেবে গণ্য করা হয়েছে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আইন বিভাগের অধ্যাপক শাহনাজ হুদা বলেন, এভাবে কেনা শিশুরা কোথায় যাচ্ছে তার কোনো নজরদারি নেই। অনেকে হয়তো ব্যবসার উদ্দেশ্যেই সন্তান জন্ম দিচ্ছেন। তাই অবিলম্বে সর্বজনীন দত্তক আইন ও সরকারি নজরদারি প্রয়োজন। ঢাকা মহানগর পুলিশের গোয়েন্দা বিভাগের (ডিবি) যুগ্ম কমিশনার সৈয়দ হারুন অর রশীদ জানান, ফেসবুকে এমন তৎপরতা চালানো অপরাধ হলেও এখন পর্যন্ত সুনির্দিষ্ট অভিযোগ না পাওয়ায় কাউকে আইনের আওতায় আনা সম্ভব হয়নি।