বিপুল ম্যান্ডেট নিয়ে দায়িত্ব পাওয়া নতুন সরকার আগামী পাঁচ বছরে জনগণকে দেওয়া প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়নে সুস্পষ্ট কর্মপরিকল্পনা নিয়ে এগিয়ে যাচ্ছে বলে জানিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। শনিবার রাজধানীর প্যান প্যাসিফিক সোনারগাঁও হোটেলে সেন্টার ফর গভর্ন্যান্স স্টাডিজ (সিজিএস) আয়োজিত তিন দিনব্যাপী আন্তর্জাতিক সম্মেলন ‘বে অব বেঙ্গল কনভারসেশন (বিওবিসি) ২০২৬’-এর উদ্বোধনী অধিবেশনে তিনি এ কথা বলেন। প্রধানমন্ত্রী বলেন, জাতীয় স্বার্থ সুরক্ষা, নীতিমালার ধারাবাহিকতা বজায় রাখা, অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা নিশ্চিত করা এবং প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কার সরকারের মূল অগ্রাধিকার। আমরা এখন প্রতিশ্রুতি থেকে সরাসরি বাস্তবায়নের দিকে এগিয়ে যাচ্ছি।
সম্মেলনের প্রতিপাদ্য ‘ফ্র্যাগমেন্টস, ফ্রন্টিয়ার্স অ্যান্ড ফিউচারস: নেভিগেটিং পাওয়ার, টেকনোলজি অ্যান্ড ট্রাস্ট ইন আ ওয়ার্ল্ড রিরিটেন’। ৩ থেকে ৫ অক্টোবর পর্যন্ত চলা এই সম্মেলনে শতাধিক দেশের প্রায় দুইশ বক্তা, তিনশ’র বেশি প্রতিনিধি এবং এক হাজারের বেশি অংশগ্রহণকারী যোগ দিচ্ছেন। এতে সার্বিয়ার সাবেক প্রেসিডেন্ট বরিস তাদিচ, মালদ্বীপের সাবেক প্রেসিডেন্ট মোহাম্মদ নাশিদ এবং মালির সাবেক প্রধানমন্ত্রী মুসা মারাসহ বিভিন্ন দেশের সাবেক ও বর্তমান রাষ্ট্রীয় কর্মকর্তা, কূটনীতিক, নীতিনির্ধারক, গবেষক ও প্রযুক্তিবিদরা অংশ নিচ্ছেন।
প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান বাংলাদেশকে বিনিয়োগের একটি আকর্ষণীয় গন্তব্য এবং শক্তিশালী উৎপাদন ও বিনিয়োগের কেন্দ্রে রূপান্তরের উদ্যোগের কথা জানান। তিনি বলেন, উৎপাদন, সেবা ও রপ্তানিসহ সকল খাতে ব্যাপক কর্মসংস্থান সৃষ্টি করাই সরকারের লক্ষ্য। বিনিয়োগকারীদের দীর্ঘমেয়াদী নীতিগত নিশ্চয়তা দেওয়ার ওপর তিনি জোর দেন। সামাজিক সুরক্ষা কর্মসূচির বিষয়ে তিনি বলেন, ‘ফ্যামিলি কার্ড’-এর মাধ্যমে দরিদ্র ও প্রান্তিক পরিবারের মায়ের হাতে আর্থিক সহায়তা, ‘কৃষক কার্ড’-এর মাধ্যমে প্রণোদনা ও কৃষিসেবা এবং ‘হেলথ কার্ড’-এর মাধ্যমে চিকিৎসাসেবা নিশ্চিত করা হবে। এছাড়া ‘ইউনিভার্সেল কার্ড’-এর মাধ্যমে নাগরিকরা এক ছাতার নিচে সমন্বিত সরকারি সেবা পাবেন।
স্বাস্থ্যসেবা তৃণমূল পর্যায়ে পৌঁছে দিতে সরকার এক লাখ স্বাস্থ্যসেবাকর্মী নিয়োগের কাজ করছে, যাদের ৮০ শতাংশই নারী। মা ও শিশুর স্বাস্থ্য সুরক্ষায় বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। শিক্ষাব্যবস্থা সংস্কারের বিষয়ে প্রধানমন্ত্রী বলেন, শিক্ষা শুধু সনদ অর্জনের জন্য নয়, শিক্ষার্থীদের বাস্তব জীবনের জন্য প্রস্তুত করার মাধ্যম হতে হবে। আনন্দময় শিক্ষার পরিবেশ নিশ্চিত করার পাশাপাশি শিশুদের পাঠ্যক্রমে সংস্কৃতি, খেলাধুলা, মূল্যবোধ ও নৈতিকতা যুক্ত করা হবে। কারিগরি ও বৃত্তিমূলক শিক্ষার প্রসারের পাশাপাশি প্রথম শ্রেণি থেকেই বিনামূল্যে ইউনিফর্ম, স্কুলব্যাগ ও মিড-ডে মিলের ব্যবস্থা করা হচ্ছে।
তরুণ প্রজন্মকে জাতীয় অগ্রগতির চালিকাশক্তি হিসেবে অভিহিত করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, ব্রেইন ড্রেনকে ব্রেইন সার্কুলেশনে রূপান্তর করতে সরকার দক্ষতা উন্নয়ন, প্রযুক্তিগত রূপান্তর ও কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার ব্যবহার বাড়ানোর ওপর গুরুত্ব দিচ্ছে। কৃষি খাতের উন্নয়নে প্রযুক্তি ও বাজারসংযোগ সহজলভ্য করা হচ্ছে। তিনি বলেন, আগামী পাঁচ বছরে ২০ হাজার কিলোমিটার খাল ও জলপথ খননের পরিকল্পনা রয়েছে। পদ্মা ব্যারাজ প্রকল্প ও তিস্তা মহাপরিকল্পনা কৃষিখাত ও জলবায়ু সহনশীলতা বাড়াতে ভূমিকা রাখবে। পরিবেশ সুরক্ষায় আগামী পাঁচ বছরে ২৫ কোটি বৃক্ষরোপণ, সৌরবিদ্যুতের ব্যবহার বৃদ্ধি এবং গ্রিন ফ্যাক্টরি স্থাপনে বাংলাদেশ অগ্রণী ভূমিকা পালন করছে। বিশ্বের শীর্ষ ১০০টি লিড সার্টিফায়েড ফ্যাক্টরির মধ্যে ৫৩টিই এখন বাংলাদেশে রয়েছে।
প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কার ও সুশাসনের ওপর গুরুত্ব দিয়ে প্রধানমন্ত্রী বলেন, মানবাধিকার, গণতান্ত্রিক মূল্যবোধ ও মতপ্রকাশের স্বাধীনতা সুরক্ষিত রাখতে হবে। আইনের শাসন প্রতিটি নাগরিকের জন্য সমানভাবে প্রযোজ্য হবে। এমন প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কৃতি গড়ে তোলা হবে যেখানে রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলো জনগণের সেবায় নিয়োজিত থাকবে। রোহিঙ্গা সংকটের বিষয়ে তিনি বলেন, প্রায় ১২ লাখ রোহিঙ্গা শরণার্থীকে আশ্রয় দেওয়া হয়েছে। মিয়ানমারে তাদের দ্রুত, স্বেচ্ছায়, নিরাপদ, মর্যাদাপূর্ণ ও টেকসই প্রত্যাবাসনই মূল লক্ষ্য। বঙ্গোপসাগরকে অর্থনৈতিক সম্ভাবনার ভিত্তি উল্লেখ করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, আঞ্চলিক অভিন্ন ভৌগোলিক অবস্থানকে সমৃদ্ধিতে রূপান্তর করতে গভীর দ্বিপাক্ষিক ও বহুপাক্ষিক সম্পৃক্ততা প্রয়োজন। বাংলাদেশ সংলাপ ও পারস্পরিক শ্রদ্ধাবোধে বিশ্বাসী এবং শান্তি ও সম্প্রীতির মাধ্যমে যৌথ সমৃদ্ধি অর্জনে প্রস্তুত।