পাবনার রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র বিদ্যুৎ উৎপাদন শুরুর চূড়ান্ত ধাপের দিকে এগিয়ে যাচ্ছে। গত বুধবার বিদ্যুৎকেন্দ্রটির প্রথম ইউনিটের নিরাপত্তা ভালভের পরীক্ষা সফলভাবে সম্পন্ন হয়েছে। এখন আরও উচ্চ চাপে আরেকটি পরীক্ষা চালানোর প্রস্তুতি নেওয়া হচ্ছে। প্রকল্প সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে, সব কিছু ঠিক থাকলে আগামী ডিসেম্বরের শেষে পরীক্ষামূলকভাবে ৩০০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ জাতীয় গ্রিডে যুক্ত হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে।
বিদ্যুৎকেন্দ্রের দায়িত্বশীল কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, প্রথম ইউনিট চালু করার ক্ষেত্রে এই পরীক্ষা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। চুল্লির ভেতরের মূল ব্যবস্থায় চাপ নির্দিষ্ট সীমার মধ্যে রাখা এবং অতিরিক্ত চাপ তৈরি হলে তা কমিয়ে নিরাপদ অবস্থায় আনার ক্ষেত্রে নিরাপত্তা ভালভ প্রধান ভূমিকা পালন করে। গত বুধবার রাতে শুরু হওয়া ১৬ মেগাপ্যাসকেল চাপের পরীক্ষাটি সফলভাবে সম্পন্ন হয়েছে। খুব শিগগির ১৮ মেগাপ্যাসকেল চাপের আরেকটি পরীক্ষা অনুষ্ঠিত হবে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের নিউক্লিয়ার ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগের অধ্যাপক শফিকুল ইসলাম বলেন, চুল্লিপাত্রে স্বাভাবিক চাপ ১৬ মেগাপ্যাসকেল। এটি সফল হওয়ার মানে হলো বিদ্যুৎকেন্দ্রটি চালানো সম্ভব। তবে ১৮ মেগাপ্যাসকেলের পরীক্ষাটিও নিরাপত্তার জন্য গুরুত্বপূর্ণ এবং ডিসেম্বরে গ্রিডে বিদ্যুৎ দেওয়ার পরিকল্পনাটি বাস্তবায়নযোগ্য।
এর আগে সেপ্টেম্বরে চুল্লিতে নিয়ন্ত্রিত পারমাণবিক বিভাজন বিক্রিয়ার মাধ্যমে তাপ উৎপাদন প্রক্রিয়া শুরুর পরিকল্পনা থাকলেও নিরাপত্তা ভালভের পরীক্ষায় ত্রুটি ধরা পড়ায় তা পিছিয়ে গিয়েছিল। এবার অগ্নিনিরাপত্তা ও তেজস্ক্রিয়তা-সংক্রান্ত নিরাপত্তাব্যবস্থা যাচাইয়ের পর পরীক্ষাটি সফল হয়েছে। কেন্দ্রটির প্রধান নিয়ন্ত্রণকক্ষ ও জরুরি নিয়ন্ত্রণকক্ষ—উভয় জায়গা থেকেই ভালভ খোলা-বন্ধ হওয়ার গতি, সাড়া দেওয়ার গতি, সতর্কসংকেত এবং বিভিন্ন কার্যক্রমের প্রয়োজনীয় চাপ ও তাপমাত্রার তথ্য পর্যবেক্ষণ করা হয়েছে।
বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, জ্বালানি নিয়ে কোনো অনিশ্চয়তা নেই। প্রথম ইউনিটের সব জ্বালানি ২০২৩ সালেই রূপপুরে পৌঁছেছে এবং গত মে মাসে চুল্লিপাত্রে জ্বালানি প্রবেশ করানো শেষ হয়েছে। শুক্রবার রাতে প্রথম ইউনিটের জন্য একটি অতিরিক্ত চালান সেনাবাহিনীর বিশেষ নিরাপত্তায় রূপপুরে পৌঁছায়। দ্বিতীয় ইউনিটের জ্বালানির প্রথম চালান আগামী বৃহস্পতিবার দেশে পৌঁছাতে পারে। সব মিলিয়ে এই দফায় মোট ৯টি চালান আসার কথা রয়েছে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, পারমাণবিক জ্বালানি আগে থেকে মজুত রাখা জরুরি, তাই অতিরিক্ত জ্বালানি আনা হয়েছে এবং ডিসেম্বরের আগে দ্বিতীয় ইউনিটের সব জ্বালানি রূপপুরে রাখার পরিকল্পনা রয়েছে।
দেশের ইতিহাসে সবচেয়ে বড় একক এই প্রকল্পটি বাস্তবায়ন করছে বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি মন্ত্রণালয়ের আওতাধীন পরমাণু শক্তি কমিশন, আর পরিচালনার দায়িত্বে রয়েছে নিউক্লিয়ার পাওয়ার প্ল্যান্ট কোম্পানি বাংলাদেশ লিমিটেড (এনপিসিবিএল)। রাশিয়ার ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান অ্যাটমস্ট্রয়এক্সপোর্ট ১ হাজার ২০০ মেগাওয়াটের দুটি ইউনিট নির্মাণ করছে। বিজ্ঞান ও প্রযুক্তিমন্ত্রী ফকির মাহবুব আনাম জানান, ত্রুটির কারণে দুই মাস পিছিয়ে গেলেও এখন সব কাজ ঠিকঠাক এগোচ্ছে। জ্বালানি নিয়েও কোনো অনিশ্চয়তা নেই এবং প্রতি সপ্তাহে একটি করে জ্বালানির চালান আসার কথা রয়েছে।
পরীক্ষামূলক বিদ্যুৎ উৎপাদন শুরুর পর টানা ৭-৮ মাস তা চলতে পারে। গ্রিডে বিদ্যুৎ সরবরাহ শুরু হলে বাংলাদেশ বিশ্বের ৩৩তম পারমাণবিক বিদ্যুৎ উৎপাদনকারী দেশ হিসেবে স্বীকৃতি পাবে। ২০২৩ সালের অক্টোবরে প্রকল্প এলাকায় পারমাণবিক জ্বালানি আসার পরই রূপপুর পারমাণবিক স্থাপনা হিসেবে স্বীকৃতি পায়। প্রকল্পটির মেয়াদ দুই দফায় বাড়িয়ে ২০২৮ সালের জুন পর্যন্ত করা হয়েছে। ঠিকাদারের সঙ্গে চুক্তি অনুসারে মেয়াদ বাড়লেও প্রকল্পের খরচ বাড়ানোর সুযোগ নেই, তবে ডলারের দাম বাড়ার কারণে প্রকল্পের ব্যয় ২৬ হাজার কোটি টাকা বেড়ে ১ লাখ ৩৮ হাজার ৬৮৬ কোটি টাকায় দাঁড়িয়েছে।
বিদ্যুৎকেন্দ্র সূত্র বলছে, চুল্লিপাত্রে শক্তি উৎপাদন শুরু হতে পারে এ মাসের শেষ দিকে। শক্তি উৎপাদন ক্ষমতা ৩ থেকে ধাপে ধাপে বেড়ে ৩০ শতাংশে উন্নীত হলেই জাতীয় গ্রিডে বিদ্যুৎ সংযোগ করা সম্ভব হবে। এরপর ৩০০ মেগাওয়াট করে বিদ্যুৎ পাওয়া যাবে।
জ্বালানি বুঝে নেওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই পারমাণবিক শক্তির অধিকারী দেশের তালিকায় নাম ওঠে বাংলাদেশের।২০২৫ সালের ডিসেম্বর পর্যন্ত ছিল রূপপুর প্রকল্পের মেয়াদ।