দেশের বৃহত্তম সরকারি চিকিৎসাকেন্দ্র ঢাকা মেডিকেল কলেজ (ঢামেক) হাসপাতালে হৃদরোগীদের চিকিৎসা ও এনজিওগ্রাম সেবা চরম সংকটে পড়েছে। কার্ডিওলজি বিভাগের দুটি ক্যাথল্যাবের একটিও সচল না থাকায় রোগীরা চরম ভোগান্তির শিকার হচ্ছেন। এর মধ্যে একটি ক্যাথল্যাব দীর্ঘদিন ধরে অকেজো এবং অন্যটি মেরামত করে চালানো হলেও গত প্রায় তিন মাস ধরে সেটিও পুরোপুরি বন্ধ রয়েছে।
বিকল্প ব্যবস্থা হিসেবে বর্তমানে হাসপাতালের পুরোনো ভবনের নিউরোমেডিসিন বিভাগের ‘নিউরো ক্যাথল্যাব’ ব্যবহার করা হচ্ছে। সেখানে সপ্তাহে কেবল বুধবার হৃদরোগীদের এনজিওগ্রাম করা হয়। ওই একদিনে মাত্র ২০ থেকে ২৫টি পরীক্ষা করা সম্ভব হয়, যা রোগীর বিপুল চাপের তুলনায় অত্যন্ত অপ্রতুল। ফলে এনজিওগ্রামের সিরিয়াল পেতে রোগীদের দিনের পর দিন অপেক্ষা করতে হচ্ছে। অনেকেই নিরুপায় হয়ে হাসপাতালের বাইরে বা বেসরকারি হাসপাতালে গিয়ে অতিরিক্ত খরচে পরীক্ষা করাতে বাধ্য হচ্ছেন। ঢামেকে এনজিওগ্রামের খরচ যেখানে মাত্র ২ হাজার টাকা, সেখানে বাইরে পরীক্ষা করাতে রোগীদের কয়েকগুণ বেশি অর্থ ব্যয় করতে হচ্ছে।
কার্ডিওলজি বিভাগের চিকিৎসকরা জানান, সংকট কেবল এনজিওগ্রামেই সীমাবদ্ধ নয়। পরীক্ষা-নিরীক্ষার পর রোগীর হার্টে রিং বা স্টেন্ট বসানোর ক্ষেত্রেও বড় ধরনের ঘাটতি রয়েছে। চিকিৎসায় ব্যবহৃত রিং, প্রয়োজনীয় ওষুধপত্র, অ্যাক্সেসরিজ, মেশিনপত্র এবং দক্ষ জনবলের তীব্র সংকট চলছে। শুরু থেকেই এখানে রিং বা স্টেন্টের কোনো সরকারি সরবরাহ ছিল না, রোগীদের তা বাইরে থেকেই কিনে আনতে হতো। বর্তমানে হাসপাতাল থেকে শুধু ‘কন্ট্রাস্ট ডাই’ (রক্তনালি দৃশ্যমান করার তরল পদার্থ) সরবরাহ করা হচ্ছে, বাকি সব উপকরণেরই ঘাটতি রয়েছে।
হাজারীবাগ থেকে আসা রোগী নিরঞ্জন জানান, তিনি এনজিওগ্রাম করানোর জন্য ১৫ দিন ধরে হাসপাতালে ভর্তি আছেন, কিন্তু এখনও সিরিয়াল পাননি। পুরোনো ভবনের ক্যাথল্যাবে সিরিয়াল দিয়ে তিনি অপেক্ষা করছেন। একই ধরনের ক্ষোভ প্রকাশ করেন লাকসাম থেকে আসা মো. ইউনুস। তিন সপ্তাহ ধরে চিকিৎসাধীন এই রোগী এখনও সিরিয়াল পাননি। তিনি প্রশ্ন তোলেন, দ্রুত চিকিৎসা না পাওয়ার কারণে যদি কোনো বড় ধরনের দুর্ঘটনা ঘটে, তবে তার দায়ভার কে নেবে?
ঢামেকের কার্ডিওলজি বিভাগের সহকারী অধ্যাপক ডা. মো. মাহমুদুর রহমান নোমান জানান, দুটি ক্যাথল্যাব যখন সচল ছিল, তখন প্রতি মাসে ১৫০ থেকে ২০০টি এনজিওগ্রাম করা সম্ভব হতো। বর্তমানে তা কমে ৭০ থেকে ৮০টিতে নেমে এসেছে। সপ্তাহে মাত্র একদিন নিউরোমেডিসিনের ল্যাব ব্যবহার করে রোগীদের সামাল দেওয়া যাচ্ছে না। তিনি বলেন, শুধু ক্যাথল্যাব মেরামত করলেই সমস্যার স্থায়ী সমাধান হবে না, বরং পূর্ণাঙ্গ চিকিৎসার জন্য প্রয়োজনীয় সব সরঞ্জাম ও জনবল নিশ্চিত করা অত্যন্ত জরুরি।
এদিকে কার্ডিওলজি বিভাগের সিসিইউতেও শয্যা ও সরঞ্জামের সংকট প্রকট। সিসিইউর মোট ৩৪টি শয্যার মধ্যে ৩৩টিতেই রোগী ভর্তি থাকেন এবং একটি শয্যা জরুরি রোগীর জন্য খালি রাখা হয়। আগে সিসিইউতে ১৭টি শয্যা ছিল, পরে আরও ১৭টি যুক্ত করা হলেও নতুন শয্যাগুলোর মধ্যে মাত্র ৫টিতে মনিটর রয়েছে। বাকি ১২টি শয্যাতেই কোনো মনিটর নেই। এই বিভাগে ২৪ ঘণ্টায় ইনডোরে প্রায় ৫০ থেকে ৬০ জন এবং আউটডোরে প্রতিদিন গড়ে ৮০ থেকে ৯০ জন রোগী চিকিৎসা নিতে আসেন। হাসপাতালে ইসিজি সেবা ২৪ ঘণ্টা চালু থাকলেও হৃৎপেশীর বিশেষ প্রোটিন পরীক্ষা ‘ট্রপোনিন-আই’ কেবল সকাল ৮টা থেকে দুপুর ২টা পর্যন্ত করা যায়।
রোগীর এই বিপুল চাপ সামলাতে কার্ডিওলজি বিভাগ থেকে আরও ২২০টি শয্যার চাহিদা পাঠানো হয়েছে। এর মধ্যে ৫০টি সিসিইউ, ৫০টি পোস্ট-সিসিইউ, ২০টি এইচডিইউ, ৫০টি পুরুষ ওয়ার্ড, ৪০টি নারী ওয়ার্ড এবং ১০টি শিশু কার্ডিওলজি শয্যা রয়েছে। বর্তমানে হাসপাতালে আলাদা কোনো শিশু কার্ডিওলজি চিকিৎসা সুবিধা নেই।
অন্য বিভাগের ক্যাথল্যাব ব্যবহারের ফলে সেখানেও চাপ তৈরি হচ্ছে। নিউরোসার্জারি বিভাগের চিকিৎসক ডা. ফরহাদ জানান, তাদের নিজস্ব ল্যাবে এমনিতেই প্রচুর রোগীর চাপ থাকে। এর ওপর প্রতি বুধবার কার্ডিওলজি বিভাগের ২০ থেকে ২৫ জন রোগীর এনজিওগ্রাম করতে গিয়ে তাদের নিয়মিত চিকিৎসাসেবা ব্যাহত হচ্ছে।
এসব সমস্যার বিষয়ে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের পরিচালক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল একেএম ফরহাদ হোসেন জানান, ক্যাথল্যাবের প্রয়োজনীয় যন্ত্রাংশ ইতোমধ্যে ঢাকায় এসে পৌঁছেছে। আগামী ৭ থেকে ১০ দিনের মধ্যে সংস্কারকাজ শুরু হওয়ার কথা রয়েছে। দ্রুত এই সংস্কার শেষ করে ল্যাবটি রোগীদের জন্য উন্মুক্ত করার চেষ্টা চলছে। তিনি আরও জানান, দ্রুত কাজ শেষ করার জন্য তিনি প্রকৌশলীদের শক্ত নির্দেশনা দেবেন এবং এ বিষয়ে রবিবারও তাদের সাথে কথা বলবেন।