বাংলাদেশে রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে উপাচার্য বদলের পুরোনো ধারা অব্যাহত রয়েছে। গত দুই বছরে দেশের পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে দুই থেকে তিনবার উপাচার্য পরিবর্তন হয়েছে। ৫ অক্টোবর বিশ্ব শিক্ষক দিবস পালনের প্রাক্কালে শিক্ষকদের পেশাগত মর্যাদা ও অধিকার রক্ষার চেয়ে পদপদবি ও ক্ষমতা দখলের রাজনীতিই বড় হয়ে উঠেছে বলে মনে করছেন শিক্ষাবিদেরা। বর্তমানে ২২টি পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের ৪০৪ জন শিক্ষকের বিরুদ্ধে ‘রাজনৈতিক তৎপরতার’ অভিযোগ তদন্তাধীন রয়েছে। সরকার এবার ১০০ জন গুণী শিক্ষককে সম্মাননা দিলেও শিক্ষাঙ্গনে দলীয় রাজনীতির ছায়া আগের মতোই স্পষ্ট রয়ে গেছে।

বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে দলীয় রাজনীতির এই প্রভাব এখন স্কুল-কলেজেও ছড়িয়ে পড়েছে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইমেরিটাস অধ্যাপক সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী মনে করেন, সরকার সবসময় বিশ্ববিদ্যালয়ে নিজের পছন্দের লোক বসাতে চায় এবং অল্পসংখ্যক শিক্ষকও পদের লোভে সরকারের আনুকূল্য খোঁজেন। এভাবেই তৈরি হচ্ছে দলবাজি। আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর পূর্বের উপাচার্যরা পদত্যাগ করলে প্রথমে বিএনপি ও জামায়াতপন্থী শিক্ষকেরা দায়িত্ব পান। পরবর্তীতে বিএনপি ক্ষমতায় আসার পর অন্তর্বর্তী সরকারের আমলে নিয়োগ পাওয়াদের সরিয়ে ৬১টি পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের মধ্যে ৪০টিরও বেশি বিশ্ববিদ্যালয়ে নতুন উপাচার্য নিয়োগ দেওয়া হয়েছে, যাদের প্রায় সবাই বিএনপিপন্থী রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত।

জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের পর দেশের বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে শিক্ষকদের হেনস্তা, জোরপূর্বক পদত্যাগ ও বরখাস্তের ঘটনা ঘটেছে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে গত ৩০ সেপ্টেম্বর সিন্ডিকেট সভায় সমাজবিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক জিনাত হুদাকে সাময়িক বরখাস্ত করা হয়। সহ-উপাচার্য (প্রশাসন) অধ্যাপক মোহাম্মদ আলমোজাদ্দেদী আলফেছানী জানান, আন্দোলনের বিরুদ্ধে অবস্থান নেওয়ায় তাঁর বিরুদ্ধে ট্রাইব্যুনাল গঠন করা হয়েছে। তবে জিনাত হুদা অভিযোগ অস্বীকার করে দাবি করেছেন, শিক্ষক সমিতির নিয়ন্ত্রণ নিতেই তাঁকে সরানো হয়েছে। এদিকে, আওয়ামীপন্থী নীল দলের ২৩১ শিক্ষকের বিরুদ্ধে ব্যবস্থার দাবি উঠেছে এবং ৫৮ জন শিক্ষকের ‘গোপন তৎপরতা’ শনাক্ত করেছে ঢাবি কর্তৃপক্ষ। ২০০৯ থেকে ২০২৪ সালের জুন পর্যন্ত ১৫ বছরে শিক্ষক নিয়োগের অনিয়ম খতিয়ে দেখার উদ্যোগও নেওয়া হয়েছে, যা নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছে ‘বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষক নেটওয়ার্ক’।

আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে যোগ্যতার চেয়ে রাজনৈতিক আনুগত্যকে প্রাধান্য দেওয়ার উদাহরণ হিসেবে খুলনা কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক এক উপাচার্যের স্বজনপ্রীতির কথা উঠে এসেছে, যিনি নিজের ছেলে, মেয়ে, শ্যালক-শ্যালিকার ছেলে ও ভাতিজাসহ পরিবারের ৯ জনকে নিয়োগ দিয়েছিলেন এবং নিজের স্ত্রীকেও অধ্যাপক পদে বসানোর চেষ্টা করেছিলেন।

অন্যান্য পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়েও অস্থিরতা বিরাজ করছে। রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে ৩৮ জন শিক্ষক-কর্মকর্তার বিরুদ্ধে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে, যার মধ্যে ২ জন বরখাস্ত, ১৭ জন সাময়িক বরখাস্ত এবং ১১ জন সাময়িক অব্যাহতি পেয়েছেন। এছাড়া প্রায় ৩০০ শিক্ষকের তালিকা উপাচার্যের কাছে দেওয়া হয়েছে। জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ে আন্দোলনকারীদের ওপর হামলায় জড়িত থাকার অভিযোগে ১০ জন আওয়ামীপন্থী শিক্ষকের বিরুদ্ধে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেওয়া হলেও শিক্ষার্থীরা এতে সন্তুষ্ট নয়। চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ে গত দুই বছরে শিক্ষকদের কেন্দ্র করে অন্তত ছয়টি উত্তেজনাকর ঘটনা ঘটেছে। তবে ২২টি বিশ্ববিদ্যালয়ের ৪০৪ জন শিক্ষকের বিরুদ্ধে তদন্ত কমিটির আইনি বৈধতা নিয়ে রুল জারি করেছেন হাইকোর্ট। ২১ সেপ্টেম্বর একটি রিটের প্রাথমিক শুনানি নিয়ে এ রুল দেওয়া হয়।

বিশ্ববিদ্যালয়ের বাইরে বেসরকারি স্কুল-কলেজেও ‘মব’ বা জোরপূর্বক পদত্যাগের ঘটনা ঘটছে। ‘পদবঞ্চিত প্রতিষ্ঠানপ্রধান ও শিক্ষক জোট’-এর আহ্বায়ক আনোয়ারুল ইসলাম তালুকদার জানান, তাঁর সংগঠনে প্রায় ৩০০ ভুক্তভোগী শিক্ষক রয়েছেন। তবে মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, প্রায় ৯৫০ জন শিক্ষকের এমপিও এবং সাড়ে চার হাজার শিক্ষকের বেতন বন্ধ রয়েছে। ভিকারুননিসা নূন স্কুল অ্যান্ড কলেজের অধ্যক্ষ কেকা রায় চৌধুরী ও সহকারী অধ্যাপক ফারহানা খানম ২০২৪ সালের ১১ আগস্ট জোরপূর্বক পদত্যাগের শিকার হয়ে আদালতের শরণাপন্ন হয়েছেন। ঢাকা সিটি কলেজের অধ্যক্ষ বেদারউদ্দিন আহমেদকে জোর করে পদত্যাগ করানো হয়েছিল এবং ২০২৫ সালের মার্চে জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের পরিদর্শন প্রতিবেদনে বলা হয়, তাঁর পদত্যাগ সরকারি প্রজ্ঞাপন অনুযায়ী সঠিক হয়নি। এছাড়া বহিষ্কৃত অন্য শিক্ষকদের পুনর্বহালের নির্দেশও মানা হচ্ছে না।

বেসরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের পরিচালনা কমিটিতে স্থানীয় সংসদ সদস্যদের স্বজন ও দলীয় নেতাকর্মীদের আধিপত্য এবং শিক্ষকদের রাজনীতিতে অতিসক্রিয়তা শিক্ষার মান ব্যাহত করছে। এ বিষয়ে মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা বিভাগের সচিব আবদুল খালেক জানান, এমপিওভুক্ত শিক্ষকদের রাজনীতি বন্ধে আচরণবিধি করার চিন্তা চলছে। বাংলাদেশ অধ্যক্ষ পরিষদের সভাপতি মোহাম্মদ মাজহারুল হান্নান মনে করেন, যেহেতু শিক্ষকেরা শতভাগ সরকারি বেতন পান, তাই বেসরকারি পরিচালনা পর্ষদের আর প্রয়োজন নেই। ইমেরিটাস অধ্যাপক সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী বলেন, দলবাজি বন্ধের মূল দায়িত্ব সরকারের। বিশ্ববিদ্যালয়ের স্বায়ত্তশাসন ও গণতান্ত্রিক মডেল ধ্বংস হয়ে যাওয়ায় এবং শিক্ষকদের বেতন কম থাকায় তারা কোচিং বা প্রাইভেটের দিকে ঝুঁকছেন।