দেশে ডেঙ্গুর প্রকোপ ভয়াবহ রূপ নিলেও মশা নিধনে গঠিত সাড়ে ৪৮ হাজারের বেশি কমিটির কার্যক্রম কেবল কাগজেই সীমাবদ্ধ রয়েছে। মাঠপর্যায়ের এসব কমিটি বাস্তবে নিষ্ক্রিয় থাকায় এডিস মশা নিয়ন্ত্রণ ও ডেঙ্গু প্রতিরোধ কঠিন হয়ে পড়েছে বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা। এদিকে সারা দেশে ডেঙ্গু আক্রান্ত হয়ে মৃত্যুর সংখ্যা বেড়েই চলেছে। গত ২৪ ঘণ্টায় আরও ১০ জন এবং তার আগের দিন ৯ জনের মৃত্যুর মধ্য দিয়ে চলতি বছর মৃতের সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ২৮১ জনে। ডেঙ্গু এখন দেশের সব জেলায় ছড়িয়ে পড়েছে।

২০১৯ সালে স্থানীয় সরকার বিভাগ প্রকাশিত ‘ডেঙ্গুসহ মশাবাহিত অন্যান্য রোগ প্রতিরোধ জাতীয় নির্দেশিকা’ অনুযায়ী ইউনিয়ন থেকে শুরু করে জাতীয় পর্যায় পর্যন্ত বিভিন্ন স্তরে কমিটি গঠনের কথা বলা হয়েছে। এই নির্দেশিকা অনুযায়ী দেশজুড়ে মোট ৪৮ হাজার ৫৫৯টি কমিটি থাকার কথা। দেখা যাচ্ছে ইউনিয়নের ওয়ার্ড পর্যায় থেকে জাতীয় পর্যায় পর্যন্ত কমিটির সংখ্যা ৪৮ হাজার ৫৫৯ (৫৫৯ / 559)। তবে বড় বড় নীতিনির্ধারণী সভাতেও এ কথা শোনা যায়নি। জাতীয় কমিটি ও সিটি করপোরেশনের কয়েকটি কমিটি ছাড়া বাকি প্রায় সব কমিটিই বর্তমানে অকার্যকর। জনস্বাস্থ্যবিদ আবু জামিল ফয়সাল এ বিষয়ে বলেন, এত কমিটির কথা অনেকেই জানেন না। সাধারণ মানুষকে সম্পৃক্ত করে ডেঙ্গু প্রতিরোধে বড় আন্দোলন গড়ে তুলতে মাঠপর্যায় থেকে জাতীয় পর্যায় পর্যন্ত সব কমিটিকে সক্রিয় করা জরুরি হয়ে পড়েছে।

নির্দেশিকা অনুযায়ী, সবচেয়ে তৃণমূল স্তরে অর্থাৎ ৪ হাজার ৫৯৯টি Unions-এর প্রতিটি ওয়ার্ডে (মোট ৪১ হাজার ৩৯১টি ওয়ার্ড) ১১ সদস্যের ‘ডেঙ্গুসহ মশাবাহিত অন্যান্য রোগ প্রতিরোধ কমিটি’ থাকার কথা, যার সভাপতি সংশ্লিষ্ট ওয়ার্ড মেম্বার। এ ছাড়া ইউনিয়ন পর্যায়ে ইউপি চেয়ারম্যান, ৩৩০টি পৌরসভায় পৌর মেয়র এবং ৫০৩টি উপজেলায় উপজেলা চেয়ারম্যানকে সভাপতি করে কমিটি গঠনের নির্দেশনা রয়েছে। পাশাপাশি ৬৪টি জেলা ও ১৩টি সিটি করপোরেশনেও কমিটি থাকার কথা। সিটি করপোরেশনগুলোতে ওয়ার্ড আছে ৬৬৮টি (৬৬৮ট, 668) এবং পৌরসভাগুলোতে ওয়ার্ড আছে কমপক্ষে ৯৯০টি (৯৯০ট, 990)। কেন্দ্রীয়ভাবে সবার ওপরে আছে ডেঙ্গুসহ মশাবাহিত অন্যান্য রোগ প্রতিরোধবিষয়ক জাতীয় কমিটি। কেন্দ্রীয়ভাবে ২৪ সদস্যের এই জাতীয় কমিটি রয়েছে, যার মধ্যে ঢাকার দুই মেয়র, মন্ত্রিপরিষদ সচিব ও বিভিন্ন মন্ত্রণালয়ের সচিবরা অন্তর্ভুক্ত।

তবে স্থানীয় সরকার বিভাগের যুগ্ম সচিব মো. রবিউল ইসলাম দাবি করেছেন, জাতীয় কমিটি, ১৩টি সিটি করপোরেশন এবং ৩৩০টি পৌরসভার কমিটিগুলো মশা নিয়ন্ত্রণে কাজ করছে এবং অন্য কমিটিগুলোও সক্রিয় রয়েছে। কিন্তু মাঠপর্যায়ের বাস্তবতা ভিন্ন। পাবনার বেড়া উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা ও পৌরসভার প্রশাসক রুনাল্ট চাকমা জানান, কমিটি গঠনের কোনো নির্দেশনা তারা পাননি, ফলে কোনো কমিটিও হয়নি। নেত্রকোনা পৌরসভার নির্বাহী কর্মকর্তা নূরুল আমিন জানান, তাদের ৯টি ওয়ার্ডের কোনোটিতেই ডেঙ্গু প্রতিরোধ কমিটি নেই। সিলেট সিটি করপোরেশনের পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, সেখানে ডেঙ্গু প্রতিরোধে কোনো ওয়ার্ড কমিটি নেই। চট্টগ্রামের সন্দ্বীপ উপজেলা ও পৌরসভা এবং কোনো ইউনিয়নে ডেঙ্গু প্রতিরোধে কোনো ধরনের কমিটি নেই। তবে মশা নিধন বিষয়ে কোনো কমিটি এখনো হয়নি। ডেঙ্গুর সমস্যাটি ছিল মূলত ঢাকা শহরকেন্দ্রিক। সেপ্টেম্বরে ডেঙ্গুতে ১০৪ (104) জনের মৃত্যু হয়েছে, যা আগের ৮ মাসের মোট মৃত্যুকেও ছাড়াল। ময়মনসিংহ সিটি করপোরেশন জানিয়েছেন, আগে ওয়ার্ড পর্যায়ে কমিটি থাকলেও এখন তা কার্যকর নেই।

অ্যান্যদিকে, কিছু এলাকায় আংশিক তৎপরতা দেখা গেছে। কুমিল্লার জেলা প্রশাসন জানিয়েছে, সেখানে জেলা, উপজেলা, ইউনিয়ন ও সিটি করপোরেশনের ওয়ার্ডগুলোতে কমিটি গঠন করা হয়েছে। যশোরের কেশবপুরের মজিদপুর ইউনিয়নের চেয়ারম্যান হুমায়ুর কবির জানান, তাদের কমিটির সভা হয়েছে। তবে একই উপজেলার কেশবপুর ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান মো. আলাউদ্দিন জানান, তাদের কমিটির কোনো সভা হয়নি। রংপুরের তারাগঞ্জ উপজেলার কুর্শা ইউনিয়নের চেয়ারম্যান আফজালুল হক জানান, কমিটি না হলেও ইউএনওর নির্দেশে ফগার মেশিন ও ওষুধ কিনে গ্রাম পুলিশ দিয়ে মশা নিধনের কাজ চালানো হচ্ছে।

ডেঙ্গুর প্রকোপ নিয়ন্ত্রণে প্রধানমন্ত্রীর উদ্যোগে কিছু তৎপরতা শুরু হয়েছে। চলতি বছরের ১১ মার্চ ও পরবর্তীতে ১২ সেপ্টেম্বর প্রধানমন্ত্রী দেশব্যাপী পরিচ্ছন্নতা কর্মসূচির উদ্বোধন করেন, যা আগামী ১২ ডিসেম্বর পর্যন্ত প্রতি শনিবার পালিত হচ্ছে। কিন্তু স্থানীয় সরকার বিভাগের সমন্বিত উদ্যোগের অভাবে মশা নিধন কার্যক্রম গতি পাচ্ছে না। স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, গত ২৪ ঘণ্টায় সারা দেশে নতুন করে ১ হাজার ৯৯৬ জন ডেঙ্গু রোগী হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন। সম্প্রতি ডেঙ্গুতে একদিনে সর্বোচ্চ মৃত্যু ও হাসপাতালে ভর্তি ১৯০২ (1902) জন হওয়ার মতো ভয়াবহ পরিস্থিতিও দেখা গেছে। এ বছর মোট আক্রান্তের সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ৯০,৩৫৬ জনে, যার মধ্যে বর্তমানে ৫,৭৭৬ জন হাসপাতালে চিকিৎসাধীন।