গাজীপুরের টঙ্গীতে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে পুলিশের পাশাপাশি সক্রিয় হয়ে উঠেছে তরুণদের একটি বেসরকারি দল। ‘বাংলাদেশ ইয়ুথ রেভল্যুশন’ নামের এই সংগঠনের সদস্যরা নিজস্ব পোশাক পরে লাঠিসোঁটা হাতে টহল দিচ্ছেন এবং ছিনতাইকারী ও মাদক কারবারিদের ধরে পুলিশের হাতে তুলে দিচ্ছেন। তবে সাধারণ মানুষের হাতে এভাবে অপরাধী ধরার কাজ ছেড়ে দেওয়া নিয়ে বিভিন্ন মহলে বিতর্ক ও উদ্বেগ তৈরি হয়েছে।

সম্প্রতি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ফেসবুকে একটি ভিডিও ছড়িয়ে পড়ে, যেখানে দেখা যায় কয়েকজন তরুণ এক সন্দেহভাজন ছিনতাইকারীকে আটকে রেখেছেন। ওই ব্যক্তি নিজের নাম আনোয়ার ওরফে ‘ব্লেড আনোয়ার’ বলে জানান। ভিডিওতে তরুণদের কথামতো টঙ্গীর অন্য ছিনতাইকারীদের উদ্দেশে আনোয়ারকে বলতে শোনা যায়, ‘টঙ্গীতে কেউ ছিনতাই করতে আইবেন না। মাইর‍্যা হাড্ডি ভাইঙ্যা ফ্যালাইবো।’ ক্যামেরার পেছন থেকে প্রশ্ন করা হলে আনোয়ার জানান যে ‘পাবলিক’ এই মারধর করবে। এরপর তাকে ‘বাংলাদেশ ইয়ুথ রেভল্যুশন’ সংগঠনের নাম বলতে বলা হয়। গত ১৬ আগস্টের এই ঘটনাটি গাজীপুরের টঙ্গী এলাকার।

সংগঠনটির উদ্যোক্তারা জানিয়েছেন, ২০২৫ সালের ১৬ ডিসেম্বর এটি আত্মপ্রকাশ করে। টঙ্গী এলাকায় বর্তমানে তাদের ২৫০ জন সদস্য কাজ করছেন এবং সদস্য হতে আরও প্রায় ৭০০টি জীবনবৃত্তান্ত (সিভি) জমা পড়েছে। সংগঠনটির ফেসবুক পেজে ৫৪ হাজার অনুসারী রয়েছে, যেখানে নিয়মিত অপরাধী ধরার ভিডিও পোস্ট করা হয়। ভিডিওগুলো হাজার হাজার মানুষ দেখেন। বাংলাদেশ ইয়ুথ রেভল্যুশনের কেন্দ্রীয় আহ্বায়ক ফাহাদ ইসলাম, যিনি টঙ্গী সরকারি কলেজের স্নাতক তৃতীয় বর্ষের শিক্ষার্থী, জানান যে তাঁরা মূলত ছিনতাই ও মাদকসহ বিভিন্ন অপরাধে জড়িতদের হাতেনাতে ধরে পুলিশের কাছে সোপর্দ করেন।

সংগঠনটির কেন্দ্রীয় মুখ্য সংগঠক সবুজ উদ্দিন ইকবাল বলেন, তাঁদের সোর্সরা তথ্য দিলে তাঁরা সাথে সাথে অভিযান চালান। এমনকি পুলিশও অনেক সময় তাঁদের নির্দিষ্ট এলাকায় টহল দেওয়ার বার্তা দেয়। অপরাধী ধরার কাজ কেন করছেন—এমন প্রশ্নে তিনি বলেন, ‘আমার মা-বোনদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতেই আমরা এ কাজটি করে থাকি।’ সবুজ উদ্দিনের দাবি, তাঁদের একটি হোয়াটসঅ্যাপ গ্রুপ রয়েছে যেখানে গাজীপুর মহানগর পুলিশের (জিএমপি) কয়েকজন কর্মকর্তাও যুক্ত আছেন। এ পর্যন্ত তাঁরা প্রায় ২৫০ জন ছিনতাইকারী ও মাদক ব্যবসায়ীকে ধরে পুলিশে দিয়েছেন।

টঙ্গী এলাকাটি টঙ্গী পূর্ব ও টঙ্গী পশ্চিম—এই দুই থানার আওতাভুক্ত, যাদের দূরত্ব প্রায় চার কিলোমিটার। স্থানীয় বাসিন্দাদের অভিযোগ, দুটি থানা থাকার পরও পুলিশ অপরাধ দমনে পুরোপুরি সফল হতে পারছে না। পুলিশ সূত্র জানায়, গত বছরের জুন থেকে গত সেপ্টেম্বর পর্যন্ত টঙ্গী পূর্ব থানায় ছিনতাই ও ডাকাতির ৭১টি মামলায় ৭০২ জনকে এবং টঙ্গী পশ্চিম থানায় ৭২টি মামলায় ৪২৫ জনকে আটক করা হয়েছে। তবে ভুক্তভোগীরা অনেক সময় মামলা না করে কেবল জিডি করায় এই পরিসংখ্যান দিয়ে প্রকৃত চিত্র পাওয়া যায় না। টঙ্গী পূর্ব থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মো. মাকছুদুল আলম অবশ্য দাবি করেন, এলাকায় অপরাধ কমে এসেছে এবং তাঁদের নিয়মিত অভিযান অব্যাহত রয়েছে।

স্থানীয় বাসিন্দা ও পুলিশের সাথে কথা বলে জানা যায়, টঙ্গীর স্টেশন রোড, হোসেন মার্কেট, college গেট, আবদুল্লাহপুর বাসস্ট্যান্ড, সাতাইশ, কেরানীরটেক ও হাজী মাজার বস্তি এলাকায় সন্ধ্যা ও রাতে ছিনতাইকারীরা বেশি সক্রিয় থাকে। গত ২৬ আগস্ট রাত সাড়ে তিনটার দিকে সাতাইশ এলাকার বাসিন্দা শেখ মোহাম্মদ রুসেল তাঁর পরিবার নিয়ে রংপুরের উদ্দেশে রওনা হওয়ার সময় তিন মুখোশধারী ছিনতাইকারীর কবলে পড়েন। ধারালো অস্ত্র ঠেকিয়ে তাঁর দুটি ফোন, স্বর্ণালংকার ও নগদ টাকা ছিনিয়ে নেওয়া হয়। রুসেল টঙ্গী পশ্চিম থানায় মামলা করলেও কোনো মালামাল উদ্ধার বা আসামি গ্রেপ্তার হয়নি।

বেসরকারি উদ্যোগে এভাবে দল গঠন করে অপরাধ দমনের চেষ্টা নিয়ে তীব্র আপত্তি জানিয়েছেন বিশেষজ্ঞরা। মাওলানা ভাসানী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্রিমিনোলজি ও police সায়েন্স বিভাগের অধ্যাপক ওমর ফারুক বলেন, ‘বেসরকারি উদ্যোগে দল গঠন করে অপরাধ দমন গ্রহণযোগ্য নয়। এ ধরনের চেষ্টা বহুমুখী অপরাধের জন্ম দিতে পারে।’ তিনি আশঙ্কা প্রকাশ করে বলেন, দলের কেউ ব্যক্তিস্বার্থ হাসিল করতে বা চাঁদা না পেয়ে কাউকে মাদক ব্যবসায়ী তকমা দিয়ে মারধর করে পুলিশে দিলে তা কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য হবে না। এদিকে গাজীপুর মহানগর পুলিশের (জিএমপি) দক্ষিণ বিভাগের উপপুলিশ কমিশনার (ডিসি) এস এম শফিকুল ইসলাম বলেন, আইনশৃঙ্খলা রক্ষা করা পুলিশের কাজ হলেও জনগণের সহায়তা ও সচেতনতা ছাড়া পরিস্থিতি পুরোপুরি নিয়ন্ত্রণে রাখা কঠিন।