বাংলাদেশের দক্ষিণ-পশ্চিম উপকূলীয় এলাকায় সুপেয় পানির তীব্র সংকট কেবল লবণাক্ততার মধ্যেই সীমাবদ্ধ নেই। সাম্প্রতিক বিভিন্ন সরকারি জরিপ ও আন্তর্জাতিক গবেষণা বলছে, এখানকার নলকূপ ও বিকল্প উৎস হিসেবে সংরক্ষিত বৃষ্টির পানিতেও রয়েছে ক্ষতিকর আর্সেনিক, সিসা এবং মলজাতীয় জীবাণুর বিপজ্জনক উপস্থিতি। পানি দেখতে পরিষ্কার হলেও তা পানের জন্য কতটা অনিরাপদ, তা উঠে এসেছে বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরো (বিবিএস) ও ইউনিসেফের যৌথ জরিপ এবং একাধিক গবেষণায়।
বিবিএস ও ইউনিসেফের ‘বাংলাদেশ মাল্টিপল ইন্ডিকেটর ক্লাস্টার সার্ভে (এমআইসিএস) ২০২৫’-এর চূড়ান্ত প্রতিবেদন অনুযায়ী, খুলনা বিভাগের ৬৩ দশমিক ২ শতাংশ মানুষের ব্যবহৃত উৎসের পানিতে ক্ষতিকর ই কোলাই ব্যাকটেরিয়া পাওয়া গেছে। আরও উদ্বেগের বিষয় হলো, পানি যখন ঘরে এনে পান করা হয়, তখন এই জীবাণুর উপস্থিতি দাঁড়িয়েছে ৯২ দশমিক ৯ শতাংশ মানুষের পানিতে। গবেষকদের মতে, উৎস থেকে পানি সংগ্রহ, পরিবহন ও সংরক্ষণের বিভিন্ন ধাপে এই দূষণ ঘটছে। এই জরিপটি ২০২৫ সালের ২৪ ফেব্রুয়ারি থেকে ৩০ জুন পর্যন্ত ৬১ হাজার ২০৭টি পরিবারের সাক্ষাৎকার এবং ৬ হাজার ১০৬টি পরিবারের পানির মান পরীক্ষার মাধ্যমে সম্পন্ন হয়।
জরিপে আরও দেখা গেছে, খুলনা বিভাগের ১৭ দশমিক ৮ শতাংশ মানুষের উৎসের পানিতে আর্সেনিকের মাত্রা বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার (ডব্লিউএইচও) নির্ধারিত নিরাপদ সীমা (প্রতি লিটারে ১০ মাইক্রোগ্রাম বা ১০ পিপিবি) অতিক্রম করেছে। এমনকি বাংলাদেশের জাতীয় মানদণ্ড (প্রতি লিটারে ৫০ মাইক্রোগ্রাম) বিবেচনায় নিলেও ১০ দশমিক ৭ শতাংশ মানুষের উৎসের পানি আর্সেনিকযুক্ত। এছাড়া বিভাগের ১০ দশমিক ৭ শতাংশ মানুষের উৎসে মাঝারি এবং ৩ দশমিক ৮ শতাংশের উৎসে উচ্চমাত্রার লবণাক্ততা পাওয়া গেছে। সব মিলিয়ে উন্নত উৎস, সময়মতো প্রাপ্যতা, ই কোলাই ও আর্সেনিকমুক্ত হওয়ার সব শর্ত পূরণ করে খুলনা বিভাগের মাত্র ১৮ দশমিক ২ শতাংশ মানুষ নিরাপদ ব্যবস্থাপনার খাওয়ার পানি পাচ্ছেন।
সাতক্ষীরার তালা উপজেলার বাসিন্দা শফিকুল ইসলাম মোড়ল আর্সেনিক দূষণের এক জীবন্ত ভুক্তভোগী। আর্সেনিকজনিত অসুস্থতায় তাঁর বাবা, মা, স্ত্রী, দাদি ও চাচাসহ পরিবারের অনেক সদস্য মারা গেছেন। তাঁর নিজের হাতের তালুও শক্ত হয়ে গেছে। শফিকুল জানান, আর্সেনিক ধরা পড়ার পর গ্রামের মানুষ দূষিত নলকূপ ভেঙে ফেললেও নিরাপদ পানির বিকল্প মেলেনি। কোথাও পানি লবণাক্ত, আবার কোথাও নিরাপদ পানির জন্য যেতে হয় মাইলের পর মাইল দূরে। বাধ্য হয়ে দরিদ্র মানুষ পুকুর বা অনিরাপদ নলকূপের পানিই ব্যবহার করছেন।
লবণাক্ত এলাকায় বৃষ্টির পানি সংরক্ষণকে একটি বড় সমাধান মনে করা হলেও সঠিক রক্ষণাবেক্ষণের অভাবে তা-ও ঝুঁকিমুক্ত থাকছে না। খুলনার দাকোপ উপজেলার সুতারখালী ইউনিয়নে করা এবং ‘এনভায়রনমেন্ট, Development অ্যান্ড সাসটেইনেবিলিটি’ সাময়িকীতে প্রকাশিত এক গবেষণায় দেখা গেছে, সংরক্ষিত বৃষ্টির পানিতে মলজাতীয় কলিফর্ম ও মোট কলিফর্মের পরিমাণ গ্রহণযোগ্য সীমার চেয়ে অনেক বেশি। এতে ১১৬টি পরিবারের ওপর জরিপ করা হয়েছে। নমুনা নেওয়া হয়েছিল ২০২৪ সালের নভেম্বর, পানি দুই থেকে তিন মাস সংরক্ষণের পর। গবেষকদের মতে, এই সংরক্ষিত পানির মান তো খারাপই। এছাড়া ড্রাম, ব্যক্তিগত ট্যাংক ও আরসিসি ট্যাংকে সংরক্ষিত পানিতে প্রতি লিটারে শূন্য দশমিক শূন্য ৩ থেকে শূন্য দশমিক ৩৩ মিলিগ্রাম পর্যন্ত সিসা পাওয়া গেছে, যা অনুমোদিত সীমার চেয়ে বেশি। বিশেষ করে আরসিসি ট্যাংকে সিসা, লোহা ও কলিফর্মের উপস্থিতি সবচেয়ে বেশি মিলেছে। গবেষকদের ধারণা, ছাদের সিসাযুক্ত রং, পুরোনো পাইপ, ধুলাবালি এবং পাখি বা প্রাণীর মল থেকে এই দূষণ ছড়াচ্ছে। এই গবেষণায় অংশ নেওয়া ৫৯ শতাংশ পরিবার পানি না ফুটিয়েই পান করে, যার ফলে তাদের ডায়রিয়া ও পেটের পীড়ায় আক্রান্ত হওয়ার ঝুঁকি দুই গুণেরও বেশি বেড়ে গেছে।
কয়রা উপজেলার গোবরা গ্রামের বাসিন্দা কামরুল ইসলাম জানান, বর্ষাকালে ছাদের পানি পাইপ দিয়ে ট্যাংকে জমিয়ে তারা পাঁচ-ছয় মাস পর্যন্ত ব্যবহার করেন। পানি পরিষ্কার দেখলে তারা নিরাপদ ভেবে সরাসরি খেয়ে নেন, কারণ জীবাণু তো খালি চোখে দেখা যায় না। কিন্তু নিয়ম করে ট্যাংক পরিষ্কার না করায় পরিবারের সদস্যরা প্রায়ই পেটের সমস্যা, পাতলা পায়খানা বা বমিতে আক্রান্ত হন। শ্যামনগরের বুড়িগোয়ালিনী এলাকার সরস্বতী মুন্ডাও জানান, আগে দূর থেকে পানি আনতে হলেও এখন বৃষ্টির পানি জমিয়ে রাখায় কষ্ট কমেছে, তবে পানির মান পরীক্ষার কোনো সুযোগ তাদের নেই।
দূষিত ও লবণাক্ত পানির এই সংকট স্থানীয় বাসিন্দাদের স্বাস্থ্যের ওপর মারাত্মক প্রভাব ফেলছে। দাকোপ উপজেলা স্বাস্থ্য কর্মকর্তা সুদীপ বালা জানান, মার্চ থেকে মে মাসে হাসপাতালে পানিবাহিত রোগীর সংখ্যা বাড়ে। পাশাপাশি উপকূলীয় নারীদের মধ্যে শ্বেতপ্রদরের (সাদা স্রাব) নিয়মিত অভিযোগ পাওয়া যায়, যার পেছনে লবণাক্ত পানির দীর্ঘমেয়াদি সংস্পর্শ দায়ী হতে পারে। এছাড়া আইসিডিডিআরবি ও ইম্পেরিয়াল কলেজ লন্ডনের যৌথ গবেষণায় দেখা গেছে, কয়রা ও আশাশুনির ৪০ বছর বা তার বেশি বয়সী ১৫ হাজার ৪৭১ জন মানুষের মধ্যে ২১ দশমিক ৬ শতাংশেরই আগামী ১০ বছরে হৃদ্রোগ বা স্ট্রোকে আক্রান্ত হওয়ার মাঝারি থেকে উচ্চ ঝুঁকি রয়েছে। আইসিডিডিআরবির জ্যেষ্ঠ বিজ্ঞানী আলিয়া নাহিদ জানান, খাওয়ার পানিতে লবণাক্ততা এবং হৃদরোগের উচ্চ ঝুঁকির মধ্যে সরাসরি সম্পর্ক প্রমাণের জন্য আরও দীর্ঘমেয়াদি গবেষণার প্রয়োজন রয়েছে।
উপকূলের ৫টি উপজেলায় পানির তীব্রতা নিয়ে ‘ইউটিলিটিজ পলিসি’ সাময়িকীতে প্রকাশিত আরেকটি গবেষণায় উঠে এসেছে, বছরে গড়ে ৪ দশমিক ৬৫ মাস এসব এলাকায় নির্ভরযোগ্য পানি পাওয়া যায় না। পাইকগাছায় এই সংকট চলে ৭ দশমিক ১৫ মাস এবং কয়রায় ২ দশমিক ৮৪ মাস। মাত্র ১৬ শতাংশ পরিবারের নিজস্ব খাওয়ার পানির উৎস আছে। প্রায় ৮০ শতাংশ পরিবারে দূর থেকে পানি আনার কষ্টকর দায়িত্বটি পালন করেন নারী ও কিশোরীরা। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইনস্টিটিউট অব ডিজাস্টার ম্যানেজমেন্ট অ্যান্ড ভালনারেবিলিটি স্টাডিজের প্রভাষক তাসনিম চৌধুরী ফাহিম বলেন, উপকূলের নারীদের এক কলসি পানি আনতে গড়ে দেড় ঘণ্টা সময় চলে যায়। দীর্ঘ পাঁচ বছর কাজ করেও এই পরিস্থিতির কোনো পরিবর্তন তিনি দেখছেন না।
জনস্বাস্থ্য প্রকৌশল অধিদপ্তরের খুলনা সার্কেলের তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী এস এম শামীম আহমেদ বলেন, উপকূলীয় এলাকায় লবণাক্ততা ও আর্সেনিক—দুই-ই অত্যন্ত জটিল সমস্যা। বিশেষ করে খুলনার দাকোপ, কয়রা, পাইকগাছা; বাগেরহাটের মোংলা, রামপাল, মোরেলগঞ্জ এবং সাতক্ষীরার শ্যামনগর ও আশাশুনিতে সুপেয় পানির সংকট সবচেয়ে তীব্র। এই প্রতিকূল প্রাকৃতিক পরিবেশের মধ্যেও সরকারের পক্ষ থেকে নিরাপদ পানি সরবরাহের বিভিন্ন উদ্যোগ অব্যাহত রয়েছে।
ইউটিলিটিজ পলিসি সাময়িকীতে ২০২৬ সালে প্রকাশিত গবেষণাটির জন্য ২০২১ সালের ফেব্রুয়ারিতে ৬৬ হাজার ২৩৪টি পরিবারের তথ্য নেওয়া হয়।
গবেষকেরা ৬৬৬টি কমিউনিটি নলকূপ ও ২২৪টি পুকুরের পানির লবণাক্ততাও পরীক্ষা করেন।নলকূপের পানিতে গড় মোট টিডিএস (দ্রবীভূত কঠিন পদার্থ) ছিল প্রতি লিটারে ১ হাজার ৭৩৩ মিলিগ্রাম; পুকুরে ছিল ১ হাজার ৩৩০ মিলিগ্রাম।