নাভানেথেম ‘নাভি’ পিল্লেই এমন এক ব্যক্তিত্ব, যিনি জীবনের কঠিনতম পরিস্থিতিতেও কখনো পিছু হটেননি। দক্ষিণ আফ্রিকার বর্ণবৈষম্যের ভয়াবহ দিনগুলো থেকে শুরু করে জাতিসংঘের মানবাধিকারবিষয়ক হাইকমিশনার হিসেবে দায়িত্ব পালন পর্যন্ত—তার পুরো কর্মজীবন আবর্তিত হয়েছে একটি মূল প্রশ্নকে ঘিরে: ক্ষমতাবানদের অন্যায়ের বিরুদ্ধে আইন কতটা কার্যকর হতে পারে?

জাতিসংঘের মানবাধিকারবিষয়ক হাইকমিশনার হিসেবে ছয় বছরের দীর্ঘ কর্মকালে তিনি বিশ্বের বিভিন্ন দেশের সরকারকে মানবাধিকার লঙ্ঘনের জন্য জবাবদিহির আওতায় আনার নিরন্তর চেষ্টা করেছেন। বিশেষ করে শ্রীলঙ্কার গৃহযুদ্ধের শেষ পর্যায়ে এক লাখের বেশি মানুষের মৃত্যুর ঘটনা তদন্তে ব্যর্থতার দায়ে তিনি তৎকালীন প্রেসিডেন্ট মাহিন্দা রাজাপাকসের কঠোর সমালোচনা করেছিলেন। ২০০৯ সালে সমাপ্ত ওই গৃহযুদ্ধের আগে দীর্ঘ ২৬ বছর ধরে দেশটিতে সংঘাত চলছিল।

এই সাহসী ভূমিকার জন্য তাকে বিভিন্ন সময় প্রতিকূলতার মুখে পড়তে হয়েছে। শ্রীলঙ্কা সরকার তার ভারতীয় তামিল বংশোদ্ভূত পরিচয়ের ওপর ভিত্তি করে নিরপেক্ষতা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছিল। ভারতে জাতপাতবিরোধী উদ্যোগ নেওয়ার পর এক ভারতীয় কূটনীতিক তার বিরুদ্ধে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে দেশের ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ন করার অভিযোগ এনেছিলেন। এমনকি সিরিয়ার এক রাষ্ট্রদূত তাকে ‘উন্মাদ’ বলেও অভিহিত করেছিলেন। পশ্চিমা দেশগুলোও তার সমালোচনা থেকে রেহাই পায়নি; যুক্তরাজ্যসহ কয়েকটি দেশ উন্নয়নশীল দেশগুলোর দিকে বেশি মনোযোগ দেওয়ার পরামর্শ দিয়ে তার বক্তব্যের বিরোধিতা করেছিল।

এসব অভিজ্ঞতার কথা স্মরণ করে পিল্লেই হাসেন, যেখানে অভিযোগের চেয়ে বিস্ময়ই বেশি ফুটে ওঠে। তিনি জানান, তাকে অনেক সময় খারাপ নামে ডাকা হয়েছে, এমনকি ইন্টারনেটে তার ছবিতে ওসামা বিন লাদেনের মুখ বসিয়ে বিকৃত করা হয়েছে। তিনি বলেন, মানবাধিকার সম্পর্কে অনেকেরই স্বচ্ছ ধারণা নেই। তার জীবনের শুরু থেকেই তিনি বুঝেছিলেন যে, অন্যায়ের বিরুদ্ধে দাঁড়ানো মানে শুধু আইনের জ্ঞান নয়, বরং সমাজের প্রচলিত ক্ষমতাকাঠামোকে প্রশ্ন করা।

১৯৪১ সালে দক্ষিণ আফ্রিকার ডারবানে এক দরিদ্র পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন নাভি পিল্লেই। তার দাদা ভারত থেকে এসে দক্ষিণ আফ্রিকার চিনিকল ও আখের খামারে প্রায় দাসত্বের পরিবেশে কাজ করতে বাধ্য হয়েছিলেন। নারী, ভারতীয় বংশোদ্ভূত এবং শ্রমজীবী পরিবারের সন্তান হিসেবে বর্ণবৈষম্যের শাসনে তিনি পদে পদে বাধার সম্মুখীন হয়েছেন। তার অনেক বান্ধবী প্রাথমিক বিদ্যালয়ের পর পড়াশোনা ছেড়ে দিতে বাধ্য হলেও তার বাবা-মা তাকে পড়াশোনা চালিয়ে যেতে উৎসাহিত করেছিলেন। ক্লেয়ারউডের দরিদ্র সম্প্রদায়ের মানুষের চাঁদায় তার বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষার পথ সুগম হয়। নাটাল বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ার সময়ও তাকে বৈষম্যের শিকার হতে হয়; শ্বেতাঙ্গ শিক্ষার্থীদের সুবিধার জন্য ক্লাসের সময়সূচি এমনভাবে করা হতো যে, তাকে ভোর ও রাতে ক্লাস করতে হতো। তখন লাইব্রেরিতে বসে তিনি নুরেমবর্গ বিচারের নথিপত্র পড়তেন।

আইনজীবী হওয়ার স্বপ্ন ১০-১১ বছর বয়সেই দেখেছিলেন তিনি, যদিও তখন তার শিক্ষক বলেছিলেন আইন পড়া কেবল ধনীদের কাজ। কর্মজীবনে প্রবেশের সময়ও অধিকাংশ শ্বেতাঙ্গ প্রতিষ্ঠান তাকে নিয়োগ দিতে অস্বীকার করেছিল। কোথাও প্রশ্ন তোলা হয়েছিল তিনি কী ধরনের মক্কেল আনবেন, আবার কোথাও তার সন্তানসম্ভবা হওয়ার সম্ভাবনা নিয়ে অসংবেদনশীল প্রশ্ন করা হতো। সব বাধা পেরিয়ে তিনি নিজের আইনজীবী প্রতিষ্ঠান গড়ে তোলেন, যা পুরুষ সহকর্মীদের কাছে ঔদ্ধত্য মনে হয়েছিল। পারিবারিক সহিংসতা ও বর্ণবৈষম্যবিরোধী আন্দোলনকারীদের পক্ষে লড়ে তিনি নিজের দক্ষতা প্রমাণ করেন। নিজের স্বামী গ্যাবি পিল্লেইকেও তিনি আইনি সহায়তা দিয়েছিলেন এবং রবেন দ্বীপের কারাবন্দীদের অধিকার রক্ষায় কাজ করেছিলেন।

বর্ণবৈষম্যের যুগে বিচারকের কক্ষে প্রবেশের অধিকার না থাকলেও ১৯৯৫ সালে নেলসন ম্যান্ডেলা তাকে দক্ষিণ আফ্রিকার সুপ্রিম কোর্টের বিচারক হিসেবে নিয়োগ দেন। তিনি দেশটির প্রথম অশ্বেতাঙ্গ নারী বিচারক হিসেবে ইতিহাস গড়েন। পিল্লেই বলেন, জীবনে অনেক কিছুই প্রথমবারের মতো করতে হয়েছে তাকে, আর দক্ষিণ আফ্রিকার নতুন গণতান্ত্রিক ব্যবস্থায় পরিবর্তনের সুযোগ ছিল অবারিত।

যুক্তরাজ্যের ওয়ারউইক বিশ্ববিদ্যালয়ের মানবাধিকারবিষয়ক কার্যক্রমের সঙ্গে যুক্ত ‘লাকুনা ম্যাগাজিন’ একটি অনলাইন সাময়িকী। লাকুনা ম্যাগাজিনের জন্য নাভি পিল্লেইর সাক্ষাৎকারসহ লেখাটি লিখেছেন অনুসন্ধানী সাংবাদিক ও লেখক রেবেকা ওমোনিরা-ওয়েকানমি। লেখাটি ১ নভেম্বর ২০১৬ সালে প্রকাশিত।