যুগের পরিবর্তনের সঙ্গে মানুষের চাহিদার ক্ষেত্র বদলেছে এবং জনসংখ্যা বাড়ার কারণে প্রকৃতির ওপর চাপ বহুগুণ বৃদ্ধি পেয়েছে। প্রত্যক্ষ কিংবা পরোক্ষভাবে মানুষের সব প্রয়োজন মেটানোর মূল উৎস প্রকৃতি হলেও শিল্প বিপ্লব পরবর্তী সময়ে কারখানা থেকে অপসারিত বর্জ্য মাটি ও সাগরে ফেলার পাশাপাশি বর্জ্য পুড়িয়ে ক্ষতিকর ধোঁয়া বাতাসে ছেড়ে দেওয়া হচ্ছে। খাদ্য উৎপাদন বাড়াতে ব্যবহৃত রাসায়নিক সার মাটি নষ্ট করছে। এভাবে প্রকৃতির প্রতিটি উপাদান দূষিত হওয়ায় বিশ্বজুড়ে উদ্বেগ দেখা দিয়েছে। বিশেষ করে সুইডেনের তরুণ প্রজন্ম এ বিষয়ে যথেষ্ট সচেতন, যার জলন্ত প্রমাণ গ্রেটা তুনবার্গ। সুইডেনে পরিবেশ সুরক্ষায় সম্প্রতি সব দোকানে প্লাস্টিক ব্যাগের দাম দুই ক্রোনার থেকে বাড়িয়ে সাত ক্রোনার করা হয়েছে, যেখানে কাগজের ব্যাগের দাম অপেক্ষাকৃত কম।

সম্প্রতি ঘটে যাওয়া এক ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতার কথা তুলে ধরে ফাইজার সুইডেনের সাবেক পরিচালক রহমান মৃধা জানান, বাসা থেকে ব্যাগ না নিয়ে দোকানে কেনাকাটা করতে গেলে সাত ক্রোনার দিয়ে ব্যাগ কিনতে হয়। একদিন ব্যাগ নিতে ভুলে গেলে সেখানকার এক কমবয়সী ক্যাশিয়ার তাকে উদ্দেশ্য করে পরিবেশ ধ্বংসের অভিযোগ তোলেন এবং একপর্যায়ে বলেন, অন্য দেশ থেকে আসা মানুষদের পরিবেশের প্রতি কোনো সম্মান নেই। ক্যাশিয়ারের এমন মন্তব্যে তিনি নিজের ছোটবেলার কথা উল্লেখ করে বুঝিয়ে দেন যে, বাংলাদেশে কাঠের কয়লা ও ছাই দিয়ে থালাবাসন ধোয়া, নিম বা গাছের ডাল দিয়ে দাঁত মাজা, হেঁটে স্কুলে যাওয়া, গরু দিয়ে জমি চাষ করা এবং গাড়ি, টিভি বা রাসায়নিক দ্রব্যের ন্যূনতম ব্যবহার ছিল তাদের স্বাভাবিক জীবন। অন্যদিকে আধুনিক বিলাসী জীবনযাপন ও ডায়াপার ব্যবহারে বিপুল পরিমাণ রাসায়নিক যুক্ত থাকে। ক্যাশিয়ারকে নিজের প্রথম ২০ বছরের জীবনধারার সঙ্গে তার জীবনের তুলনা করে কে পরিবেশ বেশি নষ্ট করেছে প্রশ্ন তুললে উপস্থিত গ্রাহকেরা ঘটনাটি সুইডিশ সংবাদপত্রে তুলে ধরার অনুরোধ জানান। এর ধারাবাহিকতায় তিনি এটি প্রথমে সুইডিশ ভাষায় এবং পরে বাংলায় উপস্থাপন করেন।

পরিবেশের বিভিন্ন উপাদানের সু-সমন্বিত রূপ নষ্ট হলেই পরিবেশ দূষণ ঘটে। এই দূষণের পেছনে প্রকৃতি ও মানুষ উভয়েরই ভূমিকা থাকলেও মারাত্মক পরিবেশ দূষণের জন্য বিশেষভাবে দায়ী ১২টি বিষাক্ত রাসায়নিক দ্রব্য, যা 'ডার্টি ডজন' নামে পরিচিত। এর মধ্যে আটটি কীটনাশক হলো—অলড্রিন, ডায়েলড্রিন, ক্লোরডেন, এনড্রিন, হেপ্টাক্লোর, ডিডিটি, মিরেক্স ও টক্সাফেন। বাকিগুলোর মধ্যে দুটি শিল্পজাত রাসায়নিক দ্রব্য—পিসিবি ও হেক্সাক্লোরোবেনজিন এবং দুটি অনাকাঙ্ক্ষিত উপজাত—ডাইওক্সিন ও ফিউরান। এই বিষাক্ত পদার্থগুলো খাদ্যচক্রে প্রবেশ করে বিশ্বব্যাপী প্রাণীকূলে তীব্র প্রতিক্রিয়া তৈরি করে, যার ফলে ত্রুটিপূর্ণ শিশুর জন্ম, ক্যানসার ও ভ্রূণ বিকাশে নানা জটিলতা দেখা দেয়।

মানুষের অসচেতন কাজের ফলে প্রকৃতি আজ তীব্র ঝুঁকির মুখে। নির্বিচারে প্রকৃতির বিনাশ ঘটানোর ফলে মানুষ ও বিভিন্ন প্রাণী প্রকৃতির রোষানলে পড়ছে। পরিবেশের পানি, বায়ু, মাটি ও শব্দ দূষণের পাশাপাশি মানুষের নৈতিকতার অবক্ষয় ঘটছে। জনসংখ্যা বাড়লেও ভালো মানুষের সংখ্যা কমছে; ফলে হত্যা, গুম, ধর্ষণ, দুর্নীতি, ঘুষ ও মারামারি প্রতিনিয়ত বাড়ছে। সাগরের পানি দূষিত হওয়ায় জলজ জীবন বিপন্ন হচ্ছে এবং সাম্প্রতিক গবেষণা অনুযায়ী পরাগায়নের মাধ্যমে খাদ্য উৎপাদনে অপরিহার্য ভূমিকা রাখা মৌমাছির সংখ্যা আশঙ্কাজনক হারে কমছে, যা মানুষের অস্তিত্বের জন্যই হুমকিস্বরূপ।

পরিবেশ বাঁচাতে হলে মানুষের জীবনধারায় পরিবর্তন আনা জরুরি। প্লাস্টিকের উৎপাদন ও ব্যবহার পুরোপুরি বন্ধ করার পাশাপাশি পরিবেশবান্ধব প্রযুক্তির প্রসার ঘটাতে হবে। তরুণ প্রজন্ম পরিবেশ নিয়ে ভাবলেও অজান্তেই তারা অনেক ক্ষেত্রে দূষণের কারণ হচ্ছে। সুন্দর ও পরিপাটি পৃথিবী বজায় রাখতে সুইডেন কিংবা বাংলাদেশ—সব দেশের সাধারণ নাগরিক ও সরকারের নিজ নিজ জায়গা থেকে কাজ করা উচিত। সামাজিক ও প্রাকৃতিক উভয় পরিবেশকে সুস্থ রাখতে সচেতন ও ভালো মানুষের বিকল্প নেই বলে মনে করেন রহমান মৃধা।

এই ১২টি রাসায়নিক দ্রব্যের মধ্যে ৮টি কীটনাশক যেমন অলড্রিন, ডায়েলড্রিন , ক্লোরডেন, এনড্রিন, হেপ্টাক্লোর, ডিডিটি, মিরেক্স, এবং টক্সাফেন ।