মানুষের জীবনের এমন কিছু চিন্তা রয়েছে, যা কোনো শব্দ ছাড়াই আমাদের সঙ্গে বসবাস করে। দিনের ব্যস্ততায় আড়ালে থাকলেও নিরিবিলি মুহূর্তে এগুলো সামনে চলে আসে। এই চিন্তাগুলোর একটি ছুটে যায় অতীতের দিকে, অন্যটি ভবিষ্যতের পানে। আমরা জানি, অতীত বদলানো সম্ভব নয়, আবার ভবিষ্যৎ এখনও আসেনি। তবুও মন থামতে চায় না। অতীতের কোনো ঘটনা নিয়ে আমরা ভাবি, কেন অন্যভাবে সিদ্ধান্ত নিলাম না বা কেন ওই কথাটি বললাম না। একইভাবে ভবিষ্যৎ নিয়েও শুরু হয় নানা প্রশ্ন—কী হবে, পরিস্থিতি বদলে গেলে কী করব, আমি কি প্রস্তুত? এই দুই চিন্তার ভিড়ে আমাদের সবচেয়ে মূল্যবান সময় ‘বর্তমান’ হারিয়ে যায়।
মনোবিজ্ঞানের ভাষায় অতীত নিয়ে নেতিবাচক চিন্তার পুনরাবৃত্তিকে ‘রুমিনেশন’ (rumination) এবং ভবিষ্যৎ নিয়ে দুশ্চিন্তাকে ‘ওরি’ (worry) বলা হয়। সাম্প্রতিক গবেষণায় এগুলোকে ‘রিপিটেটিভ নেগেটিভ থিংকিং’ বা পুনরাবৃত্ত নেতিবাচক চিন্তার অংশ হিসেবে দেখা হচ্ছে। এই চিন্তার বৈশিষ্ট্য হলো এগুলো বারবার ফিরে আসে, নিয়ন্ত্রণ করা কঠিন এবং অনেক ক্ষেত্রে কোনো সমাধান ছাড়াই চলতে থাকে। অতীত থেকে শিক্ষা নেওয়া বা ভবিষ্যতের পরিকল্পনা করা মানুষের বেঁচে থাকার শক্তি, কিন্তু সমস্যা শুরু হয় যখন চিন্তা আমাদের সামনে এগিয়ে না নিয়ে একই জায়গায় ঘুরপাক খেতে থাকে।
গবেষণায় দেখা গেছে, রুমিনেশন সমস্যা সমাধানে বাধা সৃষ্টি করে এবং ওরি বা দুশ্চিন্তা নিজের সমাধানের ওপর আস্থা কমিয়ে দেয়। মস্তিষ্কের কাজ হলো অতীত থেকে শিক্ষা নেওয়া এবং ভবিষ্যৎ সম্পর্কে অনুমান তৈরি করা, কিন্তু এই ক্ষমতা যখন নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যায়, তখন প্রস্তুতি আর আশঙ্কার পার্থক্য মুছে যায়। অনেক সময় আমরা মনে করি আরও ভাবলে হয়তো উত্তর মিলবে, কিন্তু সব সমস্যার উত্তর চিন্তায় থাকে না। কিছু সমস্যার উত্তর থাকে সিদ্ধান্তে, কিছু কাজে, আবার কিছু উত্তরের জন্য কেবল অপেক্ষার প্রয়োজন।
আমাদের মস্তিষ্ক সারাদিন অসংখ্য তথ্য প্রক্রিয়াকরণ করে। ঘুমের সময় মস্তিষ্ক স্মৃতি ও আবেগ-সংক্রান্ত তথ্য সংহত করে। মস্তিষ্কের ‘গ্লিমফেটিক সিস্টেম’ বিপাকীয় বর্জ্য অপসারণে ভূমিকা রাখে, যা রূপক অর্থে আমাদের মস্তিষ্কের জঞ্জাল পরিষ্কার করার মতো। তবে মানসিক দুশ্চিন্তা সরাসরি এভাবে পরিষ্কার হয় না। তাই মস্তিষ্ককে শুধু তথ্য গ্রহণের ক্ষমতা নয়, বরং তথ্য বাছাই করার সক্ষমতাও ব্যবহার করতে হবে।
একটি সুস্থ মানসিক জীবনের জন্য চারটি প্রশ্ন একটি শক্তিশালী বাছাই পদ্ধতি হতে পারে: আমি কী রাখব, কী থেকে শিখব, কী নিয়ে কাজ করব এবং কী ছেড়ে দেব? ছেড়ে দেওয়া মানে ভুলে যাওয়া নয়, বরং ঘটনার ওপর আমাদের নিয়ন্ত্রণের সীমা মেনে নেওয়া। অতীতের কাছে প্রশ্ন হবে, আমি কী শিখলাম? ভবিষ্যতের কাছে প্রশ্ন হবে, আমি কী প্রস্তুতি নিতে পারি? আর বর্তমানের কাছে প্রশ্ন হবে, এই মুহূর্তে আমার হাতে কী আছে? যদি কোনো চিন্তার উত্তর হয় ‘এখন কিছুই করার নেই’, তবে বুঝতে হবে সেটি এখন আর কোনো উপকারে আসছে না।
রাতের বেলা দুশ্চিন্তা আরও স্পষ্ট হয়ে উঠতে পারে। ঘুম ভেঙে কোনো চিন্তা মাথায় এলে তা সমাধান করার চেষ্টা না করে লিখে রাখা ভালো। এতে সমস্যা অস্বীকার না করে একটি নির্দিষ্ট সময়ের জন্য স্থান দেওয়া হয়। দিনের কাজের সময় কাজের জন্য, পরিকল্পনার সময় পরিকল্পনার জন্য এবং বিশ্রামের সময় বিশ্রামের জন্য সীমারেখা বজায় রাখা জরুরি। আমাদের লক্ষ্য দুশ্চিন্তাহীন জীবন নয়, বরং চিন্তাকে পরিচালনা করতে শেখা। প্রতিটি চিন্তা সিদ্ধান্ত নয়, প্রতিটি স্মৃতি বর্তমান নয় এবং প্রতিটি আশঙ্কা ভবিষ্যৎ নির্ধারণ করে না। অতীত থেকে শিক্ষা নেওয়া, ভবিষ্যতের জন্য প্রস্তুত হওয়া এবং বর্তমানে কাজ করাই হলো সচেতন জীবনের চাবি। রহমান মৃধা, সাবেক পরিচালক, ফাইজার, সুইডেন, তার নিজের জীবনের অভিজ্ঞতা থেকে এই ‘ইনার ইঞ্জিনিয়ারিং প্রসেস’-এর কথা তুলে ধরেছেন। শেষ পর্যন্ত এই লেখায় যে Inner Engineering Process-এর কথা বলেছি, তা কোনো বই থেকে নেওয়া তত্ত্ব নয়, কিংবা অন্যকে শেখানোর জন্য তৈরি কোনো কৃত্রিম পদ্ধতিও নয়। তাই এই Inner Engineering Process কোনো চূড়ান্ত সমাধান নয়, বরং আমার নিজের জীবনের অভিজ্ঞতা থেকে তৈরি একটি পথের কথা, যা অন্যদের নিজেদের সচেতন পথ তৈরি করতে সাহায্য করতে পারে।