গণহত্যাকারী দল হিসেবে আওয়ামী লীগের দ্রুত বিচার সম্পন্ন করার দাবি দেশজুড়ে তীব্রতর হলেও সার্বিক তদন্ত ও বিচার প্রক্রিয়ার গতি নিয়ে নানা সংশয় প্রকাশ পাচ্ছেন। দল ও ব্যক্তির বিরুদ্ধে মানবতাবিরোধী অপরাধের তদন্ত চলমান থাকার কথা বলা হলেও প্রক্রিয়ার মন্থর গতি, আলামত নষ্ট হওয়ার আশঙ্কা এবং জামিনে মুক্ত হওয়া নেতাকর্মীদের হুমকির ঘটনা বিচার কার্যক্রমকে গভীর উদ্বেগের মুখে ফেলেছে।
যুক্তরাষ্ট্রের নিউইয়র্কের জন এফ কেনেডি আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে সাবেক অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টা ও শান্তিতে নোবেলজয়ী ড. মুহাম্মদ ইউনূসকে হেনস্তা চেষ্টার পর আওয়ামী লীগকে রাজনৈতিক দল হিসেবে বিচারে আনার দাবি নতুন করে জোরালো হয়েছে। কাতার এয়ারওয়েজের ফ্লাইটে দোহা থেকে যুক্তরাষ্ট্রে পৌঁছে বিমানবন্দরে ৮ নম্বর টার্মিনাল দিয়ে হুইলচেয়ারে বের হওয়ার সময় কার্যক্রম নিষিদ্ধ দলটির প্রবাসী কয়েকজন নেতা অনাকাঙ্ক্ষিত পরিস্থিতির সৃষ্টি করেন। পরে নিরাপত্তাকর্মী ও সহযোগীদের তাৎক্ষণিক হস্তক্ষেপে ড. ইউনূসকে দ্রুত ও নিরাপদে ভেতরে সরিয়ে নেওয়া হয়।
উক্ত ঘটনার পর রাজনৈতিক অঙ্গনে তীব্র ক্ষোভ ছড়িয়ে পড়ে। বিরোধীদলীয় চিফ হুইপ ও সংসদ সদস্য নাহিদ ইসলাম তাঁর ভেরিফায়েড ফেসবুকে লেখেন, এই হেনস্তার চেষ্টা দলটির সন্ত্রাসনির্ভর, সহিংস ও অমানবিক চরিত্রকে উন্মোচিত করেছে। দেশে-বিদেশে সক্রিয় সন্ত্রাসী নেটওয়ার্ক প্রতিহত করে অবিলম্বে গণহত্যাকারী দল হিসেবে আওয়ামী লীগের বিচার শুরু করার আহ্বান জানান তিনি। একইসঙ্গে জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) ভেরিফায়েড পেজ থেকে সন্ত্রাসী সংগঠন আওয়ামী লীগের সঙ্গে কোনো সমঝোতা বা রিকনসিলিয়েশন না করার অবস্থান জানানো হয়। প্রধানমন্ত্রীর তথ্য ও সম্প্রচার উপদেষ্টা ডা. জাহেদ-উর রহমানও ব্যক্তিগতভাবে দলটির সঙ্গে কোনো সমঝোতার সম্ভাবনা দেখেন না বলে অভিমত দেন।
বিচারের বিভিন্ন দিক তুলে ধরে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক সেলিম রেজা নিউটন জানান, আওয়ামী লীগকে ফ্যাসিস্ট পার্টি হিসেবে বিচার করতে হবে এবং বিচারের পর এই নামে বাংলাদেশে আর কোনো পার্টি থাকা চলবে না। অপরাধী ছাড়া অন্যরা চাইলে নতুন নামে দল গঠন করতে পারেন। অপরদিকে বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের সাবেক সদস্য সচিব ও গণবিপ্লবী উদ্যোগের আহ্বায়ক আরিফ সোহেল বলেন, বিচার দুটি দিক থেকে দেখতে হবে—প্রথমত ব্যক্তি হিসেবে অপরাধী নেতাকর্মীদের বিচার এবং দ্বিতীয়ত দল হিসেবে সুপরিকল্পিত গণহত্যার বিচার। তিনি অভিযোগ করেন, আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে ব্যক্তি হিসেবে কিছু বিচার হলেও অনেকে জামিন পেয়ে জুলাই গণঅভ্যুত্থানের ছাত্রজনতাকে হুমকি দিচ্ছেন। তিনি আরও বলেন, কেবল নির্বাহী আদেশে দলকে নিষিদ্ধ করার কোনো স্পষ্ট আইনি ভিত্তি নেই, যা অন্য যেকোনো নির্বাহী আদেশে বদলে যেতে পারে। তাই আদালতের রায়ের মাধ্যমে দলটির বিচার শুরু করা অত্যন্ত জরুরি।
তদন্তের বিষয়ে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের প্রসিকিউটর গাজী এমএইচ তামিম জানান, আগস্টের গণহত্যার দায়ে কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগের বিভিন্ন মানবতাবিরোধী অপরাধের তদন্ত দেশব্যাপী জেলা ও উপজেলা পর্যায়ে সংঘটিত হওয়ায় কিছুটা সময় লাগছে। তবে ট্রাইব্যুনালের নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একাধিক সূত্র জানায়, মানবতাবিরোধী অপরাধের তদন্ত আশানুরূপ এগোচ্ছে না এবং অনেক অপরাধ ধামাচাপা পড়ার পাশাপাশি আলামত নষ্ট হয়ে যাচ্ছে।
আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল (আইসিটি) ও সন্ত্রাসবিরোধী আইনের অধীনে রাজনৈতিক দল হিসেবে আওয়ামী লীগের বিরুদ্ধে ২০২৪ সালের জুলাই-আগস্টের গণহত্যা ও মানবতাবিরোধী অপরাধের তদন্ত সাবেক অন্তর্বর্তী সরকারের সময় শুরু হয়। প্রসিকিউশন থেকে জানানো হয়েছে, রাজনৈতিক দল হিসেবে আওয়ামী লীগকে বিচারে দাঁড় করাতে প্রমাণ ও তদন্ত প্রতিবেদনের ভিত্তিতে অভিযোগপত্র প্রস্তুতের কাজ চলছে। অপরাধ প্রমাণিত হলে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের পাশাপাশি সন্ত্রাসবিরোধী আইন, ২০০৯-এর আওতায় সংগঠনটিকে শাস্তির সুযোগ উন্মুক্ত রাখা হয়েছে।
এর আগে ২০২৫ সালের ১০ মে অন্তর্বর্তী সরকারের উপদেষ্টা পরিষদের বিশেষ সভায় আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল আইন সংশোধন ও আওয়ামী লীগের রাজনৈতিক কার্যক্রম নিষিদ্ধের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। তৎকালীন আইন উপদেষ্টা আসিফ নজরুল জানান, ১৯৭৩ সালের আইনে সংশোধনী এনে ট্রাইব্যুনালকে যেকোনো রাজনৈতিক দল ও তার অঙ্গসংগঠনকে অভিযুক্ত করা, কার্যক্রম স্থগিত করা, নিবন্ধন বাতিল ও সম্পত্তি বাজেয়াপ্ত করার ক্ষমতা দেওয়া হয়েছে। দেশের সার্বভৌমত্ব রক্ষা ও সাক্ষীদের সুরক্ষার স্বার্থে সন্ত্রাসবিরোধী আইনের অধীন সাইবার স্পেসসহ দলটির যাবতীয় রাজনৈতিক কার্যক্রম প্রজ্ঞাপনের মাধ্যমে নিষিদ্ধ করা হয়েছিল। এছাড়া ২০২৪ সালের অক্টোবরে বাংলাদেশ ছাত্রলীগকে সন্ত্রাসী সংগঠন হিসেবে নিষিদ্ধ করা হয় এবং নির্বাচন কমিশন আওয়ামী লীগের রাজনৈতিক নিবন্ধন স্থগিত করে।