জুলাই জাতীয় সনদ স্বাক্ষরের এক বছর পূর্তি হয়েছে আজ শনিবার। রাষ্ট্রের কাঠামোগত সংস্কারের লক্ষ্যে রাজনৈতিক সমঝোতার দলিল হিসেবে এই সনদ তৈরি করা হলেও, এক বছরের মাথায় স্বাক্ষরকারী দলগুলোর মধ্যে বড় ধরনের রাজনৈতিক বিভাজন ও মতপার্থক্য স্পষ্ট হয়ে উঠেছে। সনদের মৌলিক সংস্কার প্রস্তাব এবং তা বাস্তবায়নের পদ্ধতি নিয়ে আগে থেকেই টানাপোড়েন ছিল, যা এখন আরও ঘনীভূত হয়েছে।

সংবিধান সংশোধনের প্রক্রিয়া নিয়ে বর্তমান ক্ষমতাসীন দল বিএনপির সঙ্গে অন্যান্য দলের দৃষ্টিভঙ্গির পার্থক্য দেখা দিয়েছে। বিএনপি সংবিধান সংশোধনের জন্য একটি বিশেষ সংসদীয় কমিটি গঠন করেছে, যা বিরোধী দলগুলো প্রত্যাখ্যান করেছে। বিরোধী দলগুলো মূলত গণভোটের রায় বাস্তবায়নের দাবি জানিয়ে আসছে। তবে বিশেষ কমিটি আশা করছে যে, শেষ পর্যন্ত বিরোধী দলগুলো সংসদে সংবিধান সংশোধন বিলের আলোচনায় অংশ নেবে। কমিটি জানিয়েছে, আগামী জানুয়ারিতে সংবিধান সংশোধন বিল সংসদে তোলা হতে পারে এবং অংশীজনদের সঙ্গে মতবিনিময় অব্যাহত রয়েছে। গত ২০ সেপ্টেম্বর বিশেষ কমিটি ২৬টি দল ও জোটকে মতবিনিময়ের আমন্ত্রণ জানালে জামায়াতে ইসলামী ও এনসিপিসহ ১১টি দল তাতে সাড়া দেয়নি।

২০২৪ সালের ৫ আগস্ট গণ-অভ্যুত্থানের পর রাষ্ট্রকাঠামো সংস্কারের বিষয়টি সামনে আসে। এরপর অন্তর্বর্তী সরকার ছয়টি সংস্কার কমিশন গঠন করে। সেগুলো হলো: সংবিধান, নির্বাচনব্যবস্থা, বিচার বিভাগ, জনপ্রশাসন, পুলিশ ও দুর্নীতি দমন কমিশন সংস্কার কমিশন। পরে ২০২৫ সালের ১২ ফেব্রুয়ারি এসব কমিশনের প্রস্তাবের ভিত্তিতে রাজনৈতিক ঐকমত্য তৈরির জন্য গঠন করা হয় জাতীয় ঐকমত্য কমিশন। আট মাসের আলোচনার পর ৮৪টি সংস্কার প্রস্তাব নিয়ে ‘জুলাই জাতীয় সনদ’ তৈরি হয়, যার মধ্যে ৪৮টি সংবিধান-সম্পর্কিত। গত বছরের ১৭ অক্টোবর ২৪টি দল এই সনদে স্বাক্ষর করে। তবে অনেক প্রস্তাবের ক্ষেত্রেই দলগুলোর ভিন্নমত বা ‘নোট অব ডিসেন্ট’ রয়েছে। বিশেষ করে দ্বিকক্ষবিশিষ্ট আইনসভা গঠন এবং উচ্চকক্ষে আসন বণ্টনের পদ্ধতি নিয়ে বিএনপির ভিন্নমত রয়েছে।

দলটি নির্বাচনী ইশতেহারের সাংবিধানিক সংস্কারের প্রথম দফায় বলেছে, ‘সংবিধান সংস্কারের বিষয়ে বিগত ১৭ অক্টোবর ২০২৫ তারিখে জুলাই জাতীয় সনদ যে আঙ্গিকে ঐকমত্য ও স্বাক্ষরিত হয়েছে, সেগুলো সে মতে বাস্তবায়নে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দেওয়া হবে।’ বিএনপির মতে, এর অর্থ হলো জুলাই সনদ সই হয়েছে রাজনৈতিক দলগুলোর ভিন্নমতসহ।

২০২৫ সালের সেপ্টেম্বরে বাস্তবায়ন পদ্ধতি নিয়ে দলগুলোর সঙ্গে ৫ দফা সংলাপ করেছিল ঐকমত্য কমিশন। সনদ বাস্তবায়নের পদ্ধতি নিয়ে জটিলতা আরও বেড়েছে। গত বছরের ১৩ নভেম্বর জারি করা ‘জুলাই জাতীয় সনদ (সংবিধান সংস্কার) বাস্তবায়ন আদেশ’ অনুযায়ী সংসদ সদস্যদের নিয়ে একটি ‘সংবিধান সংস্কার পরিষদ’ গঠনের কথা ছিল। কিন্তু বিএনপি এই আদেশকে অবৈধ দাবি করে এর সঙ্গে যুক্ত হয়নি, ফলে পরিষদটি গঠিত হতে পারেনি। অন্যদিকে জামায়াতে ইসলামী গণভোটের রায় বাস্তবায়নের দাবিতে রাজপথে আন্দোলন জোরদার করার ঘোষণা দিয়েছে। সাবেক জাতীয় ঐকমত্য কমিশনের সহসভাপতি অধ্যাপক আলী রীয়াজ মনে করেন, দলগুলো সনদের অঙ্গীকারনামায় স্বাক্ষর করার পর এখন সেখান থেকে সরে আসা অঙ্গীকারের ব্যত্যয়।